Wednesday, September 06, 2006

বদনাম


মেঘলা আকাশ। সারাটাদিন বসে আছি কলিমুদ্দির দোকানে, কোন কাজ নেই হাতে, আর কিছুতেই মন বসছে না। তবে আজ রাজাউজির মারার জন্যে আদর্শ একটা দিন। রাজাউজিরঘাতকের ভূমিকায় আজ পিন্টুর মেজমামা স্বয়ং।

'রবি ঠাকুর ছিলেন এক বখা বালক।' বকতে থাকেন মামা।

আমরা পুরি খেয়ে চলি।

'দাড়িগোঁফ গজানোর আগ পর্যন্ত তাঁর উৎপাতে পাড়ার লোকে তিষ্টোতে পারেনি!' মামা বিড়ির ধোঁয়া ছাড়েন। 'কী না করেছেন তিনি? মস্তানি, বখামি --- আর, কী করেছেন তিনি? মেট্রিকটাও ঠিকমতো পাশ করতে পারেননি। আর করবেন কিভাবে? ইস্কুলে তো নামকাওয়াস্তে যাওয়াআসা করতেন, হাবিজাবি পদ্য লিখে লিখে ইস্কুলের দেয়াল ভর্তি করে ফেলেছিলেন, সেগুলো পরে দস্তুরমতো পয়সা খরচ করে চুনকাম করে ঢাকতে হয়েছে। আর সে কী ভীষণ ইয়ে কিসিমের পদ্য! রবি করে জ্বালাতন, আছিলো সবাই ---। কত্তবড় সাহস! ডেঁপো ছোকরা!'

আমরা শুনে যাই।

'তারপর, বাড়িতে তো নানারকম হাঙ্গামা করতেনই, সেগুলো নাহয় সব না-ই বললাম। তাঁর পেছনে ডজনখানেক কাজের লোককে অহর্নিশি ব্যস্ত থাকতে হতো। এই জিনিসপত্র ভাঙচুর করছেন, এই ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে পাশের বাড়ির বালিকার সঙ্গে কি কি সব ইশারাইঙ্গিত চালাচ্ছেন, বড়দের ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র হাঁটকাচ্ছেন, মায়ের বালিশের নিচ থেকে পয়সা চুরি করছেন, মোট কথা, ভয়ঙ্কর এক উপদ্রব ছিলেন ব্যাটা। বেশি আহ্লাদ দিলে যা হয় আর কি, সবার মাথায় চেপে বসেছিলেন একেবারে।'

'তারপর?' শিবলি চোখ গোল গোল করে বলে।

'তারপর তাঁর দাঁড়িগোঁপ গজালো।' মামা বিড়ি টেনে যান। 'সেই যে একবার তারা গজালো --- সেই থেকে তারা রবির সাথে সাথে, তাদের আর কামাননি গুরুদেব। আর কামাবেন যে, সময় কোথায় তাঁর? ডেঁপোমি করেই তো কূল পান না। কী সব মেলায় কবিতা আবৃত্তি করে বেড়ান, তাও আবার নিজের লেখা ছাইপাঁশ প্রেমের পদ্য, লোকে শোনে আর নাক সিঁটকায় আর ভাবে, দেশটা দিনকেদিন কী অধপতনের দিকে যাচ্ছে।'

আমরা পুরি খাই।

'তারপর কী এক খেয়াল হলো তার, বই ছাপাবেন। বাপের পয়সা বেশি দেখেছিলেন তো, নিজেদের প্রেসের মাগনা কালি আর কাগজ বাড়তি ছিলো বোধহয়, দিলেন ফট করে বই ছাপিয়ে। সেই বই আবার পৌঁছুলো ত্রিপুরার এক লম্পট রাজার হাতে। পুরনো দিনের রাজাগজাগুলোর স্বভাব ছিলো অতিশয় খারাপ, সেই অশ্লীল পদ্য পড়ে ত্রিপুরার রাজা তো উলু দিয়ে উঠলেন। তাঁর এমন আরো রসালো বই চাই, লোক মারফত জানালেন তিনি।'

'হুম।' রেজা বলে।

'আর জোয়ান হওয়ার পর, কী বলবো বল, তোরা ছোট মানুষ --- এই রবি সাহেবের চোখ গিয়ে পড়লো নিজের ভাবীর ওপর। আর ভাবী বেচারি সরল সোজা মানুষ, তাঁর কি আর এই দুঁদে লম্পটের চালচাতুরি বোঝার জো ছিলো?'
'মোটেও না।' আমি মাথা নাড়ি।

'তো, কি সব ঘটনা ঘটতে লাগলো, এদিকে বজরায় বসে কবিতা ওড়ায়, আর ওদিকে ভাবীর সাথে রোমান্স চালিয়ে যায় --- চারদিকে ঢিঢি পড়ে গেলো। তারপর পরিস্থিতির চাপ সহ্য করতে না পেরে ভাবী বেচারি একদিন আত্মহত্যা করে বসলেন। বুঝতেই পারছিস, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।'

আমরা গম্ভীর হয়ে যাই। এসব কথা শুনলে ছোটদের গম্ভীর হয়ে যাওয়াটাই দস্তুর।

'তারপর, নিজের ওপর থেকে দুর্নাম ভাবীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে রবি ঠাকুর ঘুরে বেড়াতে লাগলেন নূতন প্রেমিকার সন্ধানে। চেহারাসুরত ভালোই ছিলো তাঁর, আবার হালফ্যাশনের কোর্তাফোর্তা চাপিয়ে একেবারে ক্যাসানোভাটি সেজে তিনি নানারকম পার্টিতে আড্ডা দিয়ে আর মেয়ে পটিয়ে দিন কাটাতে লাগলেন। বাড়ির লোকজন দেখলো, উঁহু, এমন করে বেড়ালে তো ঠাকুরবাড়ির দস্তুরমতো বদনাম হয়ে যাবে, তাই সবাই চেপে ধরলেন তাঁকে, বিয়ে করতে হবে। প্রথমটায় ব্যাটা কিছুতেই রাজি হন না, ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ানোটাই তাঁর আসল মতলব, কিছুতেই সংসার জীবনে প্রবেশ করে এই আনন্দ মাটি করতে চান না তিনি। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির লোকজন স্বভাবে খুব কড়া, আচ্ছা টাইট দিলেন তাঁকে, বললেন বেশি ত্যাঁদড়ামো করলে কানে ধরে বের করে দেয়া হবে, বাপের পয়সায় কাপ্তেনি করা চলবে না। হয় বিয়ে করো, নয়তো জাহাজে খালাসির চাকরি নিয়ে বাসন মাজো গিয়ে। তো, উপায়ান্তর না দেখে বিয়ে করলেন রবিভাই, পুঁচকে একটা গেঁয়ো মেয়েকে। ধিঙ্গি কাউকে বিয়ে করলে তো তাকে ঠকিয়ে, তার চোখে ধূলো দিয়ে বদমায়েশি করে বেড়ানো যাবে না, তাই এই ফন্দি।'

আমরা ভারি চটে উঠি। 'তারপর?'

'তারপর যেই লাউ সেই কদু। বৌটাকে ফের বেয়ারিং মেলের মতো বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে রবি ঠাকুর দেশদেশান্তরে দৌড়োদৌড়ি করে আবার সেই আগের নষ্টামিই করতে লাগলেন। কবিতা লেখেন, গান লেখেন, নাটক লেখেন --- কী কী সব ছাইপাঁশ, সেগুলো বাপের পয়সায় ছাপান, কিন্তু লোকে কিনবে কি, ছুঁয়েও দেখে না, গোডাউনে পড়ে থাকে সব কপি।'

'যেমন কর্ম তেমন ফল।' রেজা বলে।

'তো, দিন যায়। বউটা একদিন বড় হয়ে গেলো, তার বিষয়বুদ্ধি হলো বেশ, সে তো সোজা একদিন বাপের বাড়ি থেকে হঠাৎ হামলে পড়ে এসে পরনের শাড়িটা গাছকোমর করে পেঁচিয়ে রবিঠাকুরকে পাকড়াও করে আচ্ছাসে ঝাড়লো। তাকে উল্টাপাল্টা বুঝ দিয়ে ঠাকুরসাহেব যেমন খুশি তেমন চলবেন, সে আর হচ্ছে না। এখন থেকে তাঁকে শুধরে যেতে হবে, সমাজসংসার সামলে সমঝে চলতে হবে, নইলে খ্যাংড়া ঝাঁটা দিয়ে পেঁদিয়ে একেবারে কবিগিরি চিরদিনের তরে ছুটিয়ে দেয়া হবে ---। তো, রবিঠাকুর খুব মাফটাফ চাইলেন, বললেন, ছুটি --- আবার আহ্লাদ করে বউটার নাম দিয়েছিলেন ছুটি, মহিলাকে একেবারে ছুট দিয়ে দেবার ধান্দায় ছিলেন বোধহয় --- এইবারের মতো মাফ করে দাও, আর এসব করবো না।' মামা ধোঁয়া ছাড়েন একগাদা।

আমরা খুশি হই। যাক বাবা, বউটা একেবারে গাড়ল নয়, বয়স বাড়তেই দারোগা টাইপ হয়ে গেছে। এইবার রবি বাছাধন, দেখো, ইসকুরু টাইট কাকে বলে! পড়েছো মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। খবরই আছে তোমার কপালে।

মামা বকতে থাকেন, 'কয়েক বছর কষে সংসার করলেন রবি ঠাকুর। তার ফল? একগাদা বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে ঘর ভর্তি করে ফেললেন কেবল। আর ওদিকে যার নাম চালভাজা তার নাম মুড়ি। কয়লা ধুলেই কি ময়লা যায়, বল তোরা? নাকি ঢেঁকি স্বর্গে গিয়ে ধান ভানা ছাড়া অন্য কিছু করে? এই কয়েক বছর সমানে গান লিখলেন, কবিতা লিখলেন, নাটক লিখলেন --- আর ফাঁকে ফাঁকে, বুঝলি, সেই আমলের কলকাতার থিয়েটারের হার্টথ্রব সব নায়িকাদের সাথে বেশ একটা ইয়ে জমিয়ে ফেললেন রবি ঠাকুর। লালটু চেহারা আর জমিদারীর ঠাটবাট থাকলে যা হয় আর কি, একেবারে সেই আমলের পাজিজ মোহাম্মদ ভাই ছিলেন ব্যাটা!'

আমরা ফের ক্ষেপে উঠি। 'বউটা কিছু বললো না?'

'বলিস কি? বউ তো পাঁচ পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে ব্যস্ত। রাবণের গুষ্ঠি একেবারে! রবিঠাকুরকে ঠ্যাঙাবে নাকি ওদেরকে সামলাবে বেচারী মৃণালিনী ওরফে ভবতারিণী ওরফে ছুটি?'

আমরা বিমর্ষ হয়ে পড়ি। রবি ভাই আসলেই জটিল লম্পট, চারদিক সামলে তবে নষ্টামি করতে নেমেছে।

'--- তো, বছর গড়াতে থাকে।' মামা চেয়ারে হেলান দেন। 'এইসব ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ব্যাপারস্যাপারের পেছনে ছুটোছুটি করে জমিদারী তো লাটে তুলে এসেছেন। আবার জমিদারী ভিজিট করতে গিয়ে সেখানেও কী কী সব কেলো করে এসেছেন, প্রজায় প্রজায় মারপিট লাগিয়ে দিয়ে উনি বজরায় বসে হাওয়া খান আর কাব্য ওড়ান। তাই বাপ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিন ডেকে পাঠিয়ে বললেন, বৎস রবি, বিটলামি করার জায়গা পাও না? চ্যাংড়া বয়সে একগাদা টাকা খরচ করে তোমাকে বিলাতে পাঠালাম ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে, তুমি মাসখানেক এদিকওদিক ফূর্তি করে ফিরে এলে, কিন্তু তখন তোমায় কিছু বলিনি। আর এখন তুমি আমার বুকে বসে দাড়ি ওপড়াচ্ছো, বদ ছোকরা! ভালোয় ভালোয় ভালো হয়ে যাও, নইলে ত্যাজ্যপুত্র করে খেদিয়ে দেবো। কী করবেন বুঝতে না পেরে রবি ঠিক করলেন, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ব্যবসা করবেন।'

আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। চারপাশে এই ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি গজিয়ে ওঠার পেছনে তবে ইনিই রয়েছেন! নাটের গুরু তবে এই গুরুদেব, য়্যাঁ!

'আমাদের এখানকার আপডাউন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের মতো একতালার খালি গ্যারেজে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে ফেলার জো তখন ছিলো না। ব্রিটিশ আমল, বাঘা বাঘা সব লোক এসব ব্যাপারে দেখভাল করতেন, যেমনতেমন বুঝ দিয়ে ছাত্র জোটানো সম্ভব ছিলো না। সত্যিকারের ক্যাম্পাস খুলতে হবে। তাই ধাদ্ধাড়া গোবিন্দপুর, মানে, বোলপুরে এক আখড়া খুলে বসলেন তিনি।'

'হুম।' আমরা মাথা নাড়ি।

'ইউনিভার্সিটি খুললেই তো আর হবে না, তার অনেক কায়দা কানুন রয়েছে। তাই অচিরেই দেখা গেলো, খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। ব্যাটা তো ইস্কুলটাও ঠিকমতো পাশ করতে পারেননি, আর হিসেবটিসেব করাতেন সব খাজাঞ্চিদের দিয়ে, তাই গোটা ব্যবসা পন্ড হবার যোগাড়। তাই ঠিক করলেন, এবার পলিটিক্সে লাইন ধরবেন। শুরু করলেন দেনদরবার। সেই ত্রিপুরার লম্পট রাজার ছেলেকে কিভাবে যেন পটিয়ে পাটিয়ে সাইজ করলেন, তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করলেন কিছু। তারপর পত্রপত্রিকায় নানারকম উস্কানিমূলক চিঠি লেখা শুরু করলেন, বেশিরভাগই হিন্দুমুসলিম ইসু্য নিয়ে। লোকজন তো চটে আগুন, ব্যাটা সামপ্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে চায় নাকি! তবে ভাগ্য ভালো, এর মধ্যে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নিয়ে আগেই তিনি একদফা মিছিলমিটিং করেছেন, গানবাজনা করেছেন, লোকে তাকে মোটামুটি চিনে ফেলেছে, আর সমাজের নামীদামী লোকজনের সাথে খাতির ছিলো, নইলে অন্য কেউ হলে পাবলিক পেঁদিয়ে টাইট করে দিতো। সে আমলের লোকজন, অনেক কড়া ছিলো, বুঝলি --- আজকালকার আমপাবলিকের মতো ভেতো নয়।'

আমরা টেবিলে কিল মারি।

'তো, দিন বেশ কাটছিলো, হঠাৎ একদিন শোনা গেলো, তিনি নোবেল প্রাইজ মেরে দিয়েছেন। এই প্রাইজ কাকে দেয়া হবে, সেটা নিয়ে নোবেল কমিটির সাহেবরা নিজেদের মধ্যে কোন্দল বাঁধিয়ে বসেছিলো। তাঁদের একজন শেষে চটেমটে ঠিক করেছিলেন, সাদা চামড়ার কাউকেই এই নোবেল প্রাইজ দেয়া হবে না, নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করাই ওদের স্বভাব, বুঝলি তো --- তাই রবিঠাকুরকেই প্রাইজের জন্যে মনোনীত করা হলো। চামে --- বুঝলি?'

আমরা সমঝদারের মতো মাথা নাড়ি।

'তারপর এই ফাঁকে দেশবিদেশ ঘুরে এলেন তিনি। ওদিকে ইউরোপের লোকজন তো এই বুড়ো কবির কান্ডবান্ড দেখে থ! এ তো দেখি ঘাগু রাজাগজাদেরও হার মানায়! এর কাছে তো ক্যাসানোভাও নস্যি! --- তো, খানিকটা সময় বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখিয়ে, নানা দেশের রমণীদের সাথে রঙ্গরোমান্স করে ফিরলেন তিনি। সেগুলো নিয়ে আবার পরে গদ্যপদ্যও লিখেছেন --- যত্তোসব! তো, মাঝখানে ইংরেজ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দিয়েছিলো, জালিয়ানওয়ালাবাগে শয়ে শয়ে মানুষ মেরে ফেলার পর তিনি দেখলেন, নাইট উপাধি বয়ে বেড়ালে এই দায় তাঁর ঘাড়েও চাপে, পাবলিক তখন ইংরেজকে প্যাঁদাতে না পারলে তাঁকে এসে হালুয়াটাইট করে ছাড়বে, তিনিই হাতের কাছে সহজলভ্য নাইট। তড়িঘড়ি করে নাইট উপাধি ঘাড় থেকে নামিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি।'

'কী ভীষণ মতলববাজ!' আমি চোখ ছোট ছোট করে বলি।

'ভীষণ! --- তারপর আরো দিন কাটে। এদিকে তিনি জাতে কবি হলেও তালে ঠিক, আলতো পলিটিঙ্ও করেন সময় আর সুযোগ পেলে, সেই নেংটি পরা মহাত্মা গান্ধীর সাথেও খাতির জমিয়ে ফেলেছেন গুরুদেব। তাঁকে হাত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে চাঁদা তুলছেন।'

আমরা হাঁ হয়ে যাই। ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় নামকাওয়াস্তে শিক্ষক আর তাদের মধ্যে সবচে বড় চামচা, যারা ভিসি হবার জন্যে লালায়িত, তারাই বুঝি ওরকম ফোকটে রাজনীতি করে বেড়ায়। এখন দেখা যাচ্ছে, না, এগুলোর গোড়াপত্তন করে গেছেন স্বয়ং গুরুদেব! মাছের মাথাটাই তাহলে আগে পঁচে, হ্যাঁ?

মামা ধোঁয়া ছাড়েন। 'এমনি করে দিন বেশ চলছিলো, বুঝলি, কিন্তু বয়স কাবু করে ফেলেছিলো বেচারাকে। ছুটি বেচারি মারা গিয়েছিলেন অনেক আগেই, মেয়ে দুটিও অকালে অল্প বয়সে মৃতু্যবরণ করেছিলেন, আর ওদিকে ছেলেপুলেগুলো নাতিনাতনি দিয়ে ঘর ভর্তি করছে, এর মাঝে একদিন, তিনি চলে গেলেন সবাইকে ফেলে রেখে।'

আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।

'লোকটা আরো কয়েকবছর বাঁচলে দেশটাকে শেষ করে রেখে যেতো!' রেজা গজগজ করতে থাকে।

শিবলি ফুঁসতে থাকে, 'আলবাত! নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ডেকে আনতো লোকটা। বুড়ো থুত্থুড়ে হয়েও তার রস কমেনি, নিতান্ত ইস্কুলের বালিকাদের সাথে চিঠি চালাচালি করতো! এ নিয়ে আবার বইপুস্তক পর্যন্ত লেখা হয়েছে, রানু আর ভানু! ভানু সিংহের কানুগিরি!'

আমিই বা চুপ করে বসে থাকি কেন? রবি ঠাকুরের অন্যান্য অপকর্মের ফিরিস্তি দিতে থাকি, 'আর এই নোবেল প্রাইজ নিয়ে অত মাতামাতিরই বা কি আছে? ওটা হচ্ছে ফিরিঙ্গিদের একটা চাল, অত্যাচারিত, শোষিত ভারতবাসীকে গরু মেরে জুতো দান। আর নোবেল প্রাইজ বাগানোর মতো কী-ই বা লিখেছে সেই বুড়ো? গোটাকতক ভাঁড়ামোভর্তি নাটক, কিছু বাজে পুরনো আমলের গান, বিরস সব কবিতা আর কয়েকটা বস্তাপঁচা উপন্যাস! আর ছেঁদো প্রবন্ধগুলোর কথা নাহয় না-ই বললাম।'
এর মাঝে ঝেঁপে বৃষ্টি নামে, আমাদের গায়েও ছাঁট এসে লাগে।

আমরা হঠাৎ ইনকিলাবীয় ঢঙ্গে গীবত গাওয়া থামিয়ে দিই।

মামা অনেকক্ষণ হলো বিড়ি শেষ করে চুপ করে বসেছিলেন, তিনি হঠাৎ গুনগুনিয়ে ওঠেন, 'আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে, জানিনে, জানিনে, কিছুতে কেন যে মন লাগে না ---।'

খুব বেশি সময় লাগে না, আমরা একে একে গলা মেলাই। সত্যিই তো, আজ কেন কিছুতে মন বসছে না, কেউ জানি না। রবি ঠাকুর নামের ঐ বুড়ো বাজে বদমাশ লোকটা সত্যিই যদি না থাকতো, আজ আমরা কেমন থাকতাম কে জানে?


(সেপ্টেম্বর ২৭, ২০০৩)

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।