Friday, August 11, 2006

কাবার্ডের ভেতরে কঙ্কাল : কঙ্কাল ০১


বয়স তো কম হলো না। ৭০-৮০ তো হবেই। কত পাপ করেছি এ জীবনে। প্রায়শ্চিত্তও করতে হবে। প্রায়শ্চিত্ত করতে বেরিয়ে পাপ করে এসেছি এমন ঘটনাও কম নয়। তাই ঠিক করেছি কাবার্ডের কিছু বাছাই করা কঙ্কালকে আলোবাতাস দেখাবো। এলোমেলো, হাতে যেটা ঠ্যাকে সেটা।


কঙ্কাল ০১

ছয়জন যাচ্ছি কক্সবাজার। ট্রেনে চিটাগং, সেখানে পতেঙ্গায় কিছুক্ষণ, তারপরে বিকালে কক্সবাজার পৌঁছাবো। সেদিন চিটাগঙে হাফবেলা হরতাল, বেশ নিরিবিলি হবে, আমরা রাতের ট্রেনে চেপে বসেছি। শীতের রাত, আমরা চারজন বামপাশে, আর দু'জন ডানে।

হঠাৎ আমার চোখ গেলো সেই ডানপন্থী এক ভদ্রলোকের দিকে। তিনি ট্রেনের মনোরম ঝাঁকুনির তালে তালে ঢুলছেন, দুলছেন আর হঠাৎ চমকে চমকে জেগে এদিক ওদিক তাকিয়ে চেয়ারের পেছনে একটা খাপ আছে, সেখান থেকে পরম মমতায় একটা কমলা বার বার বার করে শুঁকছেন, নেড়েচেড়ে দেখছেন, তারপর আবার রেখে দিচ্ছেন। তারপর আবারও দোল দোল ঢুলুনি।

কমলা হচ্ছে খোসা ছাড়িয়ে খেয়ে ফেলার জিনিস, আতরের মতো শোঁকার কিছু না, আমার উদ্ধত তরুণ চিত্ত আমাকে তেমনই জানালো। আমি আমার বন্ধু রাশেদকে বললাম, কমলাটা বার করে খেয়ে ফেল। রাশেদ আবার সম্পূরক কুবুদ্ধি দিলো, কমলার বর্তমান বাজার দর যাচাই করে একটা সিগারেট সেটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে রেখে দেওয়ার।

উত্তম প্রস্তাব। রাশেদ সিগারেট রেখে কমলা এনে সীটে বসেই খাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু কমলার আগ্রাসী ঘ্রাণ সম্পর্কে সাবধান করে দিলাম। দুটি কোয়া কনসালটেন্সি ফি দিয়ে সে চলে গেলো দূরে। পিছু পিছু আমার বন্ধু মুস্তাকিম আর সাদিক।

যথারীতি সেই ভদ্রলোক চমকে জেগে উঠলেন, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে হাত ঢোকালেন চেয়ারের ঝোলায়। তারপর রীতিমতো আঁতকে উঠে বার করলেন সিগারেটটা। তারপর সেটা হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন, 'আমার অরেঞ্জ? অরেঞ্জ কোথায় গেলো যে?'

আমার মুখে তখন সদ্যভুক্ত কমলার সুঘ্রাণ। ভদ্রলোক নাকমুখ কুঁচকে এদিক ওদিক তাকিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা আমাকেই পাকড়াও করলেন। আমার তখন বয়স কম, কাঁধ পর্যন্ত গজগজে চুল, মুখে অযত্নসম্ভূত দাড়িদুড়ি রেখে চে গেভারার একটা অপভ্রংশ হবার অপচেষ্টায় রত, কিন্তু তিনিও মুশকো রীতিমতো, আমার বিপ্লবী মুখচ্ছবিকে দুটাকা দামও দিলেন না। বললেন, 'ব্রাদার, এইখানে যে অরেঞ্জ ছিলো, কোথায় গেলো?'

রিপ ভ্যান ভিঙ্কেলের মতো আমি যেন জেগে উঠলাম বিশ বছর পর। বললাম, 'জ্বি, আমাকে কিছু বলছেন?'

এবার ভদ্রলোক চটে উঠলেন, কারণ বাতাসে তখনও ভেসে বেড়াচ্ছে কমলার গন্ধ। উৎস আমার মুখ। তিনি ফাক ইউ ভঙ্গিমায় সিগারেট উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন, 'এইখানে একটা অরেঞ্জ ছিলো। কে যেন নিয়ে গেছে, আর তার বদলে একটা সিগারেট রেখে গেছে! কে সে?'

আমি খুবই দৃঢ়তার সাথে বললাম, 'আচ্ছা!'

এরই মধ্যে রাশেদ-মুস্তাকিম-সাদিক ফিরে এসেছে। গা দিয়ে ভকভক করে কমলার গন্ধ বেরোচ্ছে। অসভ্যের মতো কমলা খেয়েছে শালারা। ভদ্রলোক তড়পে উঠে ওদের ধরলেন। সেই একই জিজ্ঞাসা।

রাশেদ একটা সিগারেট ধরিয়ে সিগারেটটা উল্টেপাল্টে দেখলো, তারপর বললো, 'রহস্যজনক।'

এবার ভদ্রলোক পুরো ফেটে পড়লেন। তিনি ফিরে গেলেন চিটাগঙের প্রসিদ্ধ ভাষায়, যা আমি বুঝি না। তবে অরেঞ্জ আর ুদানি শব্দ দুটি বুঝলাম, চেনা চেনা লাগলো বলে। মিনিট পাঁচেক অনর্গল ভারতীপূজার পর তিনি আবার আমাদের দিকে ফিরলেন। চোখে আগুন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কমলাটার রং কী ছিলো?'

ভদ্রলোক থতমত খেয়ে বললেন, 'জ্বি?'

আমি আবারও জানতে চাইলাম, কমলাটার রং কী ছিলো। নিখোঁজ কমলা সম্পর্কে কিছু তথ্য পেলে যে তার একটা হদিশ বার করা যায়, সেটাও জানালাম। ভদ্রলোক আবারও শুরু করলেন চিটাগঙের ভাষায় আপনমনে কথা বলা। বিড়বিড়বিড়।

এক পর্যায়ে সামনের সীটে বসা এক ভদ্রলোক বললেন, 'ভাই, আপনার কমলা গ্যাছে গ্যাছে আর পাইবেন না। আর সিগারেট যেইটা পাওয়া গ্যাছে ঐটা আপনি না খাইলে আমারে দিয়া দ্যান।'

আবার গালি। বিড়বিড়বিড়।

কাঁহাতক আর গালাগাল করা যায়? ক্লান্ত হয়ে আবার ঢুলতে লাগলেন বেচারা। হাতে ধরা না ধরানো সিগারেট। একটু পর পর চমকে চমকে ওঠেন, আর রোষকষায়িতলোচনে আমাদের আগাপাশতলা মাপেন।

আমরা নিজেদের মধ্যে কমলার গন্ধ দূর করার জন্য যার যা আছে জ্বালিয়ে নিয়ে বসলাম। আমি ধূমপান করি না, তামাকের গন্ধ অসহ্য লাগে, কিন্তু কমলার গন্ধ ঢাকা পড়বে এই আশায় বসে রইলাম ধোঁয়াখোরদের পাশে।

ঘন্টাখানেক পর রাশেদ প্রস্তাব করলো, একটা কমলা কোন স্টেশন থেকে কিনে আবার ঐ ঝোলায় রেখে দেয়া হোক। কিন্তু আমরা ভেটো দিলাম।

ভাই, আপনি যিনিই হোন না কেন, দশবারোটা কোয়াই তো। রাজনীতির পান্ডারা দশবারোহাজার কোটি টাকা মেরে দিচ্ছে পাবলিকের, কিছু করতে পারি না আমরা, আর দশবারোটা কোয়ার জন্য আপনি সারারাত ফুঁসে গেলেন। তবুও শেষমেশ আপনার বদৌলতে কমলা খাওয়া হয়েছিলো, আপনার ঐ আতিথেয়তা মনে রাখবো অনেকদিন। আর আপনি ধূমপান করেননি, ঐটাও ভালো কাজ। বিড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ। আবারও যদি কোনদিন দেখা হয়, আপনাকে আমি দুইটা কমলা কিনে খাওয়াবো। সালাম।


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।