Tuesday, September 19, 2006

শেষ সমাধান


গিয়াসুদ্দিন আহমেদের বয়স একচল্লিশ, এরকম বয়স হলেই সম্ভবত কোন মানুষকে মধ্যবয়স্ক বলা হয়৷ বেশ নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করছিলো বেচারা, শরীরের সব কলকব্জাও ঠিকমতো কাজ করছিলো, শুধু করোনারি আর্টারির এক কোণায় একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি তাকে মাঝে মাঝে বিরক্ত করতো৷

আর এটাই তাকে খেলো৷

ব্যথাটা এলো আচমকা, আর আসার পরপরই এমন এক মাত্রায় চলে গেলো, যেটা সহ্য করার মতো নয়৷ অবশ্য বেশিক্ষণ থাকলো না জিনিসটা, আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে এলো৷ গিয়াস অনুভব করলো, বেশ শান্তির একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে তার মাঝে৷ প্রচন্ড রোদের মধ্যে হেঁটে আসার পর ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে যেমনটা লাগে৷

ব্যথার পর ব্যথা উপশমের মতো আরাম আর নেই৷ গিয়াস টের পেলো, নিজেকে তার বেশ হালকা হালকা লাগছে৷ বাতাসে ভেসে বেড়াতে ইচ্ছে করছে৷

চোখ খুলে গিয়াস একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলো৷ ব্যাপারটা কি? এখনো ল্যাবের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি করছে, কয়েকজন অকারণে চেঁচাচ্ছে৷ তার রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট কুদ্দুস গাধাটা সমানে ফোনের ডায়াল টিপছে৷ গিয়াস যখন আচমকা ব্যথার ঘোরে পড়ে যাচ্ছিলো, তখনও এরা এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠেছিলো৷ এরপর তো সব অন্ধকার৷ এখন কোথায় একটু বাতাসটাতাস করবে, তা না, গরুর মতো চিত্‍কার করে যাচ্ছে সবাই৷

গিয়াস দেখলো, সবাই দিশেহারার মতো তার শরীরের চারপাশে গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে৷

এখানেই গিয়াসের একটু খটকা লাগলো৷ কারণ তার শরীরটাকে সে নিজেও দেখতে পাচ্ছে৷ ল্যাবকোট পড়া গিয়াসুদ্দিন আহমেদ হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, তার ডান হাতটা বুকের কাছে জামা খামচে ধরে রেখেছে, চোখমুখ বিকৃত৷

ব্যাপারটা ধরে ফেলতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো৷ সে মারা গেছে৷ তার শরীরটা পড়ে আছে ল্যাবের মেঝেতে, যেটার চারপাশে তার এককালের সহকমর্ীরা---যাদের সে সব সময় গর্দভ ভেবে এসেছে, এবং এখন সেই ধারণা আরো পোক্ত হয়েছে---জড়ো হয়েছে৷ আর তার আত্মা অথবা এমনি কিছু এখন শরীর ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছে, এবং সবকিছু দেখতে পাচ্ছে৷ তিক্ত একটা চিন্তা তার মাথায় খেলে গেলো, মৃতু্যর পর আসলেই তাহলে জীবন আছে! ধারণাটাকে সবসময়েই সে অবহেলা করে এসেছিলো, একজন নাস্তিক পদার্থবিদের জন্যে এষনকার উপলব্ধিটা খুব একটা সুবিধের নয়৷

গিয়াস আপন মনে ভাবলো, এখন তাহলে ফেরেশতা গোছের কেউ একজন আসবে৷ সদ্যমৃতদের কাছে এরকম কারো আগমনই স্বাভাবিক৷

গিয়াসের চারপাশে ল্যাবের দৃশ্যগুলো আস্তে আস্তে মুছে যেতে লাগলো৷ তার চারপাশে অদ্ভুত ও অচিন্ত্যনীয় গাঢ় অন্ধকার জমতে শুরু করে৷ এই অন্ধকারের মাঝে একটা হালকা আলো তার চোখে পড়লো৷ আলোটা স্থির, কোন কম্পন তার মধ্যে নেই৷ গিয়াস দেখলো, সেটা অনেকটা মানব শরীরের মতো আকৃতির, এবং হালকা একটা উষ্ণতা তার আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ছে৷
গিয়াস মনে মনে ভাবলো, কি বিচিত্র ব্যাপার৷ এতো কিছু করার পর বেহেশতেই আসতে হলো৷

সাথে সাথে আলোটা নিভে গেলো, কিন্তু উষ্ণতাটুকু রইলো৷ গিয়াস টের পেলো, তার চারপাশে সেই উষ্ণতাটুকু ছাড়া আর কিছু নেই৷

একটা প্রশান্ত, গম্ভীর স্বর শুনতে পেলো সে, 'আমি এই কাজটা কত কোটিবার করেছি, কিন্তু এখনো জিনিসটা আমার কাছে পুরনো হয় নি৷'

গিয়াস কিছু একটা বলতে চেষ্টা করলো৷ পরিস্থিতিটা তার জন্যে বেশ নাজুক, কারণ এখন তার মুখ, জিভ কিংবা বাগযন্ত্রের অন্য কোন অংশের অস্তিত্ব নেই৷ এসব ছাড়া কথা বলার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম৷ সে প্রাণপণে চেষ্টা করলো কোন এক ধরনের শব্দ করার, এবং হালকা একটা বিস্ময় নিয়ে নিজের স্বর শুনতে পেলো৷ আগের মতোই পরিচিত গলার স্বর, কোন পরিবর্তন তার কাছে ধরা পড়লো না, 'এই জায়গাটা কি স্বর্গ?'

সেই গম্ভীর স্বর উত্তর দিলো, 'স্থান বলতে তুমি যা বোঝো, এটা তা নয়৷ এটা কোন স্থানই নয়৷'

গিয়াস একটু বিব্রত বোধ করলো, কিন্তু প্রশ্নটা জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত সে স্বস্তি পাচ্ছে না৷ 'ইয়ে .. .. মানে, আপনি কি ঈশ্বর?'

অপার্থিব স্বরটি একই রকম প্রশান্ত ভঙ্গিতে, কিন্তু কিছুটা কৌতুক নিয়ে বললো, 'এই প্রশ্নটা আমাকে প্রতিবার করা হয়৷ অবশ্য একেকজন একেকভাবে করে৷ তুমি বুঝতে পারবে এমন কোন ব্যাখ্যা আমি দিতে পারবো না৷ আমি আছি, এতটুকুই তোমাকে বলতে পারি৷ বাকিটা তুমি তোমার মতো করে বুঝে নাও৷'

গিয়াস থামলো না৷ 'আমি কি? একটা আত্মা শুধু?' তার বলার ভঙ্গিতে একটা হালকা ব্যঙ্গের আভাস ফুটে উঠলো, যেটা সে প্রকাশ করতে চায়নি৷ গিয়াস মনে মনে ভাবলো, এর পরে 'প্রভু', 'দয়াময়' জাতীয় সম্বোধন করে এই বেয়াদবিটাকে পুষিয়ে নেয়া যায় কি না৷ মৃতু্যর পর যে অস্তিত্ব রয়েছে, সেটা সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে---যদিও হাড় বলে কোন কিছু এখন আর তার নেই---স্বর্গ-নরক ইত্যাদি ব্যাপারস্যাপার থাকাও বিচিত্র কিছু নয়৷ ঠাট্টা মশকরা শুনে এই ব্যাটা যদি হঠাত্‍ চটে গিয়ে তাকে নরক গোছের কোন এক জায়গায় পাঠিয়ে দেয়, সেটা খুব একটা ভালো দেখায় না৷

স্বরটি অবশ্য কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না, আগের মতোই খোশ মেজাজে বলে উঠলো, 'তুমি যদি নিজেকে আত্মা বলে ভাবো, আর সেটা ভেবে খুশি থাকো, তাতে আমার কোন সমস্যা নেই৷ তোমাকে অবশ্য আসল ব্যাপারটা বোঝানো সোজা হবে৷ তুমি হচ্ছো কিছু তড়িচ্চুম্বকীয় বলের একটা সমন্ব্বয়৷ তোমাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তোমার পার্থিব মস্তিষ্কের একটি নিখুঁত কপি তৈরী হয়৷ এজন্যেই তুমি এখনো চিন্তা করতে পারছো৷ তোমার অস্তিত্ব, ব্যক্তিত্ব আর স্মৃতি এ কারণেই টিকে আছে৷ তুমি যে নিজেকে তুমি বলে ভাবতে পারছো, এই সমন্ব্বয়ের জন্যেই পারছো৷'

গিয়াসের মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেলো৷ 'তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, আমার মস্তিষ্ক এক অর্থে অমর?'

উত্তরটা খুব দ্রুত এলো৷ বেশ আহ্লাদিত গলায় কন্ঠস্বরটি বললো, 'কখনোই নয়৷ তোমার কোন কিছুই অমর নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি সেগুলোকে সংরক্ষণ করি৷ আমিই তোমার সমন্বয়টিকে তৈরী করেছি৷ যখন তুমি বেঁচে ছিলে, তখন এই সমন্বয়টিকে তৈরী করা হয়েছে৷ তোমার পার্থিব অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবার সাথে সাথে এটির কাজ শুরু হয়েছে৷'

গিয়াস চুপ করে রইলো৷ এক মূহুর্ত থেমে স্বরটি আবার বললো, 'এই সমন্বয় সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা নেই৷ বলতে পারো খুব নিখুঁত এবং সূক্ষ্ম কাজ৷ আমি অবশ্য পৃথিবীর সব মানুষের জন্যেই এমন একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারতাম৷ করিনি৷ বেছে বেছে কিছু লোকের জন্যে এটা করেছি৷ আমার বাছতে ভালো লাগে৷'

'আপনি তাহলে খুব অল্প লোকের জন্যে এই ব্যবস্থা করেছেন?'

'খুব অল্প৷' নির্লিপ্ত উত্তর এলো৷

'ইয়ে, মানে .. .. বাকিদের তাহলে কী হয়?' গিয়াস প্রশ্নটা না করে পারলো না৷

'বিস্মরণ, আর অস্তিত্বের অবলুপ্তি৷' নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো স্বরটি, অন্তত গিয়াসের তাই মনে হলো৷ 'কেন, তুমি কী নরকের কথা ভাবছো?'

গিয়াস লজ্জা পেলো৷ 'মোটেও না৷ .. .. পৃথিবীতে এরকম একটা থিওরিই চালু আছে৷ অবশ্য আমার যে এতো গুণ সেটা জানতাম না৷ এতো লোক ফেলে আমাকেই আপনি বেছে নিলেন কেন?'

'গুণ? ও আচ্ছা৷ তোমার চিন্তাধারা অনুসরণ করতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে, বুঝতেই পারছো৷ না, আমি তোমাকে কোন গুণের জন্যে বাছাই করিনি৷ তোমার চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, এ জন্যেই তোমাকে এখানে এনেছি৷ এই একই কারণে গোটা বিশ্বব্রহ্মান্ড থেকে কোটি কোটি বুদ্ধিমান প্রাণীকে এখানে আনা হয়েছে৷'

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, ঢেঁকির তড়িচ্চুম্বকীয় বলের সমন্বয় নিখুঁত বলেই বোধহয়৷ গিয়াসের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলো না, সারাজীবনের বদভ্যাস আবার তাকে আক্রমণ করলো৷ কৌতূহলী কন্ঠে সে জিজ্ঞেস করলো, 'এই বাছাইটা কি আপনিই করেন, নাকি আপনার সাথে আরো কেউ আছে?'

উত্তরটা যখন এলো, তখন গিয়াসের মনে হলো, এই ভদ্রলোককে সে চটিয়ে দিয়েছে৷ অবশ্য স্বরটায় কোন পরিবর্তন হলো না, আগের মতোই শান্ত গলায় সেটি বললো, 'আমি একা, নাকি আমার সাথে কেউ আছে, সেটা জেনে তোমার কিছু যায় আসে না৷ এই সমস্ত বিশ্ব আমার, আমার একার৷ আমি এটাকে সৃষ্টি করেছি, আমি দেখাশোনা করছি, আমার প্রয়োজনেই বিশ্বের সবকিছু হচ্ছে৷'

'এতো কোটি কোটি চিন্তাওয়ালা প্রাণী ফেলে আপনি আমার পেছনে সময় নষ্ট করছেন? আমি কি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ কেউ?' ভবিষ্যতে এনার দূত হিসেবে আবার পৃথিবীতে ফিরতে হতে পারে কি না কে জানে, মনে মনে ভাবলো গিয়াস৷

'না৷ তুমি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নও৷ আমি সবার সাথে আছি৷ একই সময়ে, একই সঙ্গে আমি কোটি কোটি চিন্তাশীল অস্তিত্বের সমন্বয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি৷'

'তবুও আপনি বলছেন আপনি একা?'

কন্ঠস্বরটিতে আবার কৌতুক ভেসে উঠলো৷ 'তুমি কি আমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছো? ঠিক আছে, মনে করো তুমি একটা অ্যামিবা৷ তুমি একটি এককোষী প্রাণী যে কেবল আরেকটি কোষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে৷ এখন একটা নীলতিমির সাথে তোমার দেখা হলো, যার শরীরে কয়েক হাজার ট্রিলিয়ন কোষ৷ এখন যদি অ্যামিবা নীলতিমিকে জিজ্ঞেস করে, সে একা নাকি একাধিক, নীলতিমি কি বলবে? আর বললে অ্যামিবা কি কিছু বুঝতে পারবে?'

গিয়াস শুকনো গলায় বললো, 'ঠিক আছে, আমি ভেবে দেখবো৷ মনে হয় ব্যাপারটা আমি ধরতে পারছি৷'

'হ্যাঁ৷ তুমি ভাববে৷ এখানে এটাই তোমার কাজ, চিন্তা করা৷'

'কী ভাববো?' গিয়াস আবার প্রশ্ন করে৷ 'আপনি তো সবই জানেন৷'

'আমি যদি সব জেনেও থাকি, আমার জানার কথা না যে আমি সব জানি৷'

গিয়াস কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারে না৷
কন্ঠস্বরটা আবার বলে ওঠে, 'বুঝতে পারো নি? শোনো৷ আমি অসীম সময় ধরে আছি৷ এই কথাটার মানে কি? মানে হচ্ছে, আমি জানি না, আমি কখন জন্মেছি৷ যদি জানতাম, তাহলে তো আর অসীম সময় ধরে থাকতাম না, তাই না? কাজেই অন্তত একটা জিনিস আমি জানি না, আমি কখন এলাম৷ এর সাথে সম্পর্কিত আরো কিছু জিনিস আমি জানি না, যেমন কিভাবে এলাম, কোত্থেকে এলাম৷ তাছাড়া 'সবকিছু জানা' কথাটার মধ্যেই তো একটা ধাঁধাঁ আছে৷ মনে করো, আমি অসীম সংখ্যক তথ্য জানি৷ কিন্তু জানার মতো তথ্যও অসীম৷ এই দুই অসীম সমান কি না, সেটা আমি নিশ্চিত হবো কিভাবে? একটা উদাহরণ দিচ্ছি তোমাকে৷ ধরো, আমি সব জোড় সংখ্যাগুলো জানি৷ সেক্ষেত্রে আমি অসীম সংখ্যক জোড় সংখ্যার একটা তালিকা তৈরী করতে পারবো, কিন্তু আমি হয়তো একটাও বিজোড় সংখ্যা জানি না৷'

গিয়াস চুপ করে থাকতে পারলো না৷ 'কেন, জোড় সংখ্যর অসীম সিরিজটাকে দুই দিয়ে ভাগ করলেই তো আপনি বিজোড় সংখ্যার অসীম সিরিজটা পেয়ে যাচ্ছেন?'

এবার স্বরটা সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে বললো, 'হ্যাঁ৷ এটা আমার জন্যে কোন কঠিন সমস্যা নয়, তোমার জন্যেও না৷ আমি তোমাকে আরো অনেক কঠিন সব সমস্যা দেবো, তুমি সেগুলোর সমাধান করবে৷ তোমার সামগ্রিক স্মৃতি অবিকৃত থাকবে, পৃথিবীতে বেঁচে থেকে তুমি যত তথ্য জেনেছো, সব তোমার কাছে সংরক্ষিত থাকবে৷ প্রয়োজন হলে তোমাকে আরো তথ্য জানানো হবে, নূতন নূতন জিনিস শিখতে দেয়া হবে৷ সেগুলো কাজে লাগিয়ে তুমি সমস্যাগুলোর সমাধান বের করবে৷'

'এসব কাজ তো আপনিই করতে পারেন৷' গিয়াস কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে৷

'পারি৷' আরো সন্তুষ্ট গলা ভেসে আসে৷ 'কিন্তু এভাবে তোমাকে দিয়ে সমাধান করিয়ে নেয়াটা আরো বেশি মজার৷ আমি সমস্ত বিশ্বকেই এমনভাবে সৃষ্টি করেছি, যাতে প্রতি মূহুর্তে নূতন নূতন ঘটনা, আর তার সাথে নূতন নূতন সমস্যা সৃষ্টি হয়৷ ব্যাপারটাকে একটু জটিল করার জন্যে আমি এর মধ্যে অনেকগুলো অনিশ্চয়তা তৈরী করেছি৷ এর মধ্যে একটা তোমাদের হাইজেনবার্গ ধরে ফেলেছে, যেটাকে তোমরা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বলো৷ আরো অনেক এলোমেলো ব্যাপার এই বিশ্বে ছড়ানো আছে৷ এই জিনিসগুলো আমাকে আনন্দ দেয়৷' একটু থেমে কন্ঠস্বরটি আবার শুরু করে, 'যেমন ধরো আমি তোমাদের পৃথিবীতে এক ধরনের প্রাণ সৃষ্টি করলাম৷ শুরুর দিকে জিনিসটা মজার ছিলো, অহরহ নূতন নূতন ব্যাপার ঘটতো৷ কিছুদিন পর সেগুলো কিছুটা পানসে হয়ে গেলো, তখন আমি হালকা এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করলাম৷ তারপর সেই বুদ্ধিমত্তাকে বাড়তে দিলাম, বুদ্ধিমত্তার প্রকৃতি পরিবর্তিত হতে দিলাম৷ নূতন নূতন সব সমস্যা তৈরী হতে লাগলো৷ তোমার মতোই কিছু চিন্তাশীল সত্ত্বা সেগুলোর সমাধান করছে এখন৷ এখন তো গোটা বিশ্বে অনেক রকম সমস্যা, প্রতি একশো বছরে কোথাও না কোথাও কমপক্ষে একটা মজার সমস্যা ঘটে৷'

'মানে আপনি বলতে চাইছেন, আপনি নিজে সমস্যা তৈরী করতে পারেন, কিন্তু তার সমাধান আপনি নিজে করেন না? তার বদলে অন্য কোন চিন্তাশীল প্রাণীকে দিয়ে করিয়ে নেন?'

'ঠিক ধরেছো৷'

'আপনার কি মনে হয়, আমি আগামী একশো বছরে এ রকম কোন সমাধান করতে পারবো?'

'মনে হয় না৷ তবে ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই পারবে৷ তোমাকে যেহেতু অসীম সময়ের জন্যে নিয়োগ করা হয়েছে, এক সময় নিশ্চয়ই তুমি সফল হবে৷'
গিয়াস ঠিক বুঝতে পারে না কথাটা৷ 'আমি অনন্তকাল ধরে সমস্যা নিয়ে ভাববো?'

'হ্যাঁ৷'

'কেন?'

'নূতন জ্ঞান আহরণের জন্যে৷'

'সেটা ছাড়া? আর কি উদ্দেশ্যে আমি ভেবে যাবো?'

'পৃথিবীতে তুমি যখন ছিলে, তোমার উদ্দেশ্য কি ছিলো?' প্রশান্ত ভঙ্গিতে বলে স্বরটি৷

'কেবল সেই জ্ঞান আহরণ, যেটা কেবল আমার পক্ষেই করা সম্ভব৷' গিয়াস শান্ত গলায় বলে৷ 'আমার সহকমর্ী এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের প্রশংসা লাভের জন্য৷ আমি জানতাম পৃথিবীতে সে কাজগুলো করার জন্যে আমাকে অল্প সময় দেয়া হয়েছে, সেই অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্য অর্জনের জন্যে আমি চিন্তা করেছি, কাজ করেছি৷ আর এখন আপনি আমাকে দিয়ে যা করাতে চাইছেন, সেটা আপনি নিজেই করতে পারতেন, যদি একটু খাটাখাটনি করার সদিচ্ছা আপনার থাকতো৷ এখানে আমার ভাবনার জন্যে আপনি আমাকে প্রশংসা করবেন না, আপনি কেবল সেই সমাধানগুলো নিয়ে আনন্দফূর্তি করবেন৷ আর অনন্তকাল ধরে এই কাজ করে পরিতৃপ্তি পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷'

'তোমার কাছে কি নূতন কোন জিনিস জানা, কিংবা নূতন কিছু আবিষ্কার করার কোন মূল্য নেই? তোমার কি মনে হয় না এদের কোন না কোন ভবিষ্যত প্রয়োগ থাকতে পারে?'

'নির্দিষ্ট এবং স্বল্প সময়ের জন্যে থাকতে পারে৷ কিন্তু অনন্তকাল ধরে নেই৷'

'আমি তোমার কথা ধরতে পারছি৷ তবে যা-ই হোক, তোমার আর কোন উপায় নেই৷'

'আপনি আমাকে চিন্তা করতে বলছেন৷ এ কাজ আপনি আমাকে দিয়ে জোর করে করাতে পারবেন না৷' গিয়াস জোর গলায় বলে৷

'তোমার ওপর সরাসরি জোর খাটানোর কোন ইচ্ছে আমার নেই৷ তার প্রয়োজনও হবে না৷' শান্ত গলায় বলে কন্ঠস্বরটি৷ 'যেহেতু তুমি চিন্তা করা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারবে না, সেহেতু তুমি চিন্তা করবে৷ কিভাবে চিন্তা না করে থাকা যায়, সেটা তুমি জানো না৷'

গিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতে থাকে সে কেমন জঘন্য পরিস্থিতিতে পড়েছে৷ তারপর বলে, 'ঠিক আছে৷ আমি এই চিন্তা করার পেছনে একটা উদ্দেশ্য খুঁজে বের করবো৷'

স্বরটি উত্তর দেয়, 'নিশ্চয়ই৷ সেটা তুমি করতে পারো৷'

'আমি একটা উদ্দেশ্য এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছি৷'

'আমাকে জানাতে চাও?'

গিয়াস একটু হাসার চেষ্টা করে৷ 'আপনি জানেন৷ আমি জানি আমরা সাধারণভাবে কথা বলছি না৷ আপনি আপনার কথাগুলো সরাসরি আমার তড়িচ্চুম্বক সমন্বয়ে প্রবাহিত করছেন, আবার আমার কথাগুলো এই সমন্বয় থেকে বের করে নিচ্ছেন৷ কাজেই আমার চিন্তা এবং কথা, সবই আপনি টের পাচ্ছেন৷'

'হ্যাঁ৷ তুমি ঠিক বলেছো৷ তোমার চিন্তাশীলতা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট৷ তবুও তুমি আমাকে নিজের মতো করে বলো, তোমার উদ্দেশ্যটি কী?'

'ঠিক আছে৷ এখন আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার এই তড়িচ্চুম্বক বলের সমন্বয়টি নষ্ট করা৷ আপনাকে আনন্দ দেয়ার জন্যে অনন্তকাল ধরে চিন্তা ভাবনা করার কোন ইচ্ছে আমার নেই৷ আপনাকে আনন্দ দেয়ার জন্যে অনন্তকাল ধরে টিকে থাকার ইচ্ছেও আমার নেই৷ কাজেই, আমি এখন ভাববো, কিভাবে এই সমন্বয়টি নষ্ট করা যায়৷ এতে বরং আমি আনন্দ পাবো৷'

'হ্যাঁ, সে চেষ্টা তুমি করতে পারো৷ হয়তো এতে নূতন কোন আনন্দদায়ক তথ্য খুঁজে পাওয়া যেতে পারে৷ কিন্তু তুমি যদি এরকম আত্মঘাতী কাজ করেও ফেলো, কোন সমস্যা নেই, আমি সাথে সাথে তোমার সমন্বয়টিকে আবার তৈরী করবো৷ এমনভাবে তৈরী করবো, যাতে তুমি আর সেটাকে নষ্ট করতে না পারো৷ এরপর যদি তুমি নূতন কোন উপায় খুঁজে বের করো, আমি আবার তোমার সমন্বয়টিকে তৈরী করবো, এবং আবার তোমার আত্মহত্যার পরিকল্পনা নষ্ট করে দেবো৷ এভাবে যদি চলতে থাকে, একটা মজার খেলা হয়তো খেলা যেতে পারে, কিন্তু তুমি নিজেকে কখনোই নষ্ট করতে পারবে না৷ তোমার সমন্বয়টি অনন্তকাল ধরে টিকে থাকবে৷ সেটাই আমার ইচ্ছা৷' নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললো কন্ঠস্বরটি৷

'এটা কি তাহলে নরক?' গিয়াস নিষ্ফল ক্রোধ অনুভব করলো নিজের ভেতরে, কিন্তু তার স্বর নিরুত্তাপ রইলো৷ 'আপনি বলেছিলেন এটা কোন স্থান নয়৷ আমার তো মনে হচ্ছে, আমি নরকে আছি, আর আপনি আমার সাথে নারকীয় একটা খেলা খেলছেন৷'

'তুমি সেটা ভাবতে পারো৷ ধরে নাও যে তুমি নরকেই আছো, কে নিষেধ করছে? যদিও এখানে স্বর্গ কিংবা নরক বলে কিছু নেই৷ এখানে শুধু আমি আছি, আর তোমার সমন্বয়টি আছে৷'

'মনে করুন আমি কোন সমস্যার সমাধান বের করতে পারলাম না৷ তখন কি আর খামোকা আমার সমন্বয়টিকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে? তখন তো আপনি সেটাকে নষ্ট করে দিতে পারেন৷' গিয়াস একটু টোকা দিয়ে দেখার চেষ্টা করে৷

'পুরস্কার হিসেবে? তোমার ব্যর্থতার পুরস্কার হিসেবে তুমি তোমার অস্তিত্বকে নষ্ট করতে চাও? না৷ তুমি ব্যর্থ হবে না৷ অনন্তকাল ধরে চিন্তা ভাবনা করতে করতে এক সময় তুমি একটা সমাধান খুঁজে পাবে৷ এটাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা তুমি করতে পারো, লাভ হবে না৷'

'ঠিক আছে৷' গিয়াস শীতল সুরে বললো৷ 'আমি তাহলে নিজের জন্যে আরেকটা উদ্দেশ্য খুঁজে বের করছি৷ আমি আর নিজেকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবো না৷ আমার উদ্দেশ্য হবে আপনাকে শায়েস্তা করার৷ আমি এমন একটা কিছু নিয়ে ভাববো, যেটা আপনি জানেন না, আর যেটা নিয়ে আপনি কখনও ভাববেন না৷ আমি শেষ একটা সমাধান বের করবো, যার পর আর কোন সমস্যাই থাকবে না৷ জ্ঞানের সমাপ্তি নিয়ে আমি ভেবে যাবো৷'

'জ্ঞান অসীম৷ তুমি সম্ভবত এই অসীমের প্রকৃতিটা বুঝতে পারছো না৷ অনেক কিছু আছে, যা আমি জানার চেষ্টাও করিনি৷ কিন্তু এমন কিছু নেই, যা আমি কখনো জানতে পারবো না৷' কন্ঠস্বরটি বললো৷

গিয়াস সতর্কভাবে বললো, 'আপনি জানেন না, আপনার শুরু কেমন করে হয়েছিলো৷ আপনি নিজেই তো সেটা বলেছেন৷ কাজেই, আপনি জানেন না, আপনার শেষ কেমন করে হবে৷ সেটা নিয়েই আমি ভাববো৷ নিজেকে আমি নষ্ট করার কোন চেষ্টা করবো না৷ আমার উদ্দেশ্য হবে আপনাকে নষ্ট করা, যদি না আপনি আমাকে ধ্বংস করেন৷ আপনাকে বিনাশ করার পদ্ধতিটি নিয়ে আমি চিন্তা করবো, আর সেটাই হবে আপনার জন্যে শেষ সমাধান৷'

কন্ঠস্বরটি অবিচলিত রইলো৷ 'হুম৷ অন্যদের চেয়ে অনেক কম সময়ে তুমি এই সিদ্ধান্তে চলে এসেছো৷ আমি ভেবেছিলাম এই চিন্তা মাথায় ঢুকতে তোমার আরো কিছুক্ষণ সময় লাগবে৷ তোমার মতো অন্য আর যারা এখানে আছে, তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে আমাকে ধ্বংস করতে চায় না৷ কিন্তু সেটা করা যাবে না৷'

গিয়াস তিক্ত ভঙ্গিতে হাসলো৷ 'আমার হাতে এটা নিয়ে চিন্তা করার জন্যে অসীম সময় আছে৷'

কন্ঠস্বরটিতে আবার কৌতুক ফুটে উঠলো৷ 'তাহলে এ নিয়েই তুমি ভাবো৷'

আচমকা সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলো৷ গিয়াস চুপ করে রইলো৷ কন্ঠস্বরটি চলে গেছে৷ সে এখন একা৷

কিন্তু এখন তার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে৷

একটি সত্ত্বা যদি জানে, তার আয়ু অনন্তকাল, তাহলে নিজের বিনাশ ছাড়া সে আর কি চাইতে পারে?
এই কন্ঠস্বরের অধিকারী এত অগণিত বছর ধরে কি খুঁজছে? আর কেনই বা বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি করে, কিছু বাছাই করা চিন্তাশীল সত্ত্বাকে অনন্তকাল ধরে ভাবনা চিন্তা করার জন্যে নিয়োগ করা হয়েছে? কিসের খোঁজে?

গিয়াস, একা, সেটা ভেবে বের করবে৷ একমাত্র সে-ই এর উত্তর খুঁজে বের করবে৷

গিয়াস সাবধানে তার চিন্তার সূতোগুলো একের পর এক সাজাতে থাকে৷ হালকা একটা উত্তেজনা তার মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে৷ গিয়াস চিন্তা করতে শুরু করে৷

আর তার হাতে এখন অনেক সময়৷



[এ গল্পটি আজিমভের 'দ্য লাস্ট অ্যানসার' গল্পের ছায়াবলম্বনে লেখা৷ অ্যানালগ সায়েন্স ফিকশন সায়েন্স ফ্যাক্ট ম্যাগাজিনের জানুয়ারি ৮, ১৯৮০ সংখ্যায় সেটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো৷]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।