Saturday, September 23, 2006

যখন ঈশ্বরের সাথে দেখা হলো


[বাংলা ভাষায় লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এর মতো আর কোন ভাষা জানা নেই। হয়তো ইংরেজির সাথে আমাদের অনেক দিনের সংস্রব, অনেক নতুন কিছু জানি ইংরেজিতে, বিশ্বসাহিত্যের একটা বড় অংশ এখনও ইংরেজিতে চড়ে আমাদের কাছে আসে, তারপরও ইংরেজিতে লিখতে তেমন একটা ইচ্ছে করে না। হয়তো অক্ষমতা, হয়তো আত্মবিশ্বাসের অভাব, হয়তো অনীহা, কিন্তু লেখা হয় না।

কিন্তু মাঝে মাঝে হয়তো একটা কিছু লিখে ফেলি। লিখে পড়ি কয়েকবার, গুটি কয়েক মানুষকে পড়তে পাঠাই মেইল করে, তারপর ফেলে রাখি। এগোনো হয় না। বাংলা ভাষায় লেখার সময় মনে হয় ঘরে ফিরছি, ইংরেজি আমার খানিক, ক্ষণিক আনন্দের সরাইখানা।

কিন্তু বাংলা আর ইংরেজি ছাড়া তৃতীয় একটা ভাষা, যেটাতে চলনসই দখল আছে, কিন্তু তার মহত্তম কীর্তিগুলোর সাথে তেমন পরিচয় নেই, সেরকম কোন ভাষায় ফট করে একটা গল্প লিখলাম। নিঃসন্দেহে একটা খিচুড়ি সেটা, অন্ধকারে আঁকা ছবির মতো। দিনের আলো সে ছবিকে স্পর্শ করলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে জানি না। কিন্তু লেখার আনন্দটা কিন্তু পাওয়া যায়।

গল্পটা বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছি এখানে। মূল জার্মান গল্পটি পাঠিয়েছি বন্ধুবর সুমন চৌধুরীকে।]



স্বাভাবিকভাবেই আমি একটু নার্ভাস ছিলাম। ঈশ্বরের সাথে মোলাকাৎ! বাপরে! তবে বেশ তৈরিও ছিলাম আমি। তিনদিন ধরে আমি দিনভর ভেবেছি আমার জীবন আর তা যাপন নিয়ে। কী না কী প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসবে, সেগুলো নিয়ে মাথা গরম করার ইচ্ছা আমার ছিলো না, কিন্তু বুঝতেই পারছেন, এ তো আর কোন হেঁজিপেঁজি চাকরিদাতা নয়। কিংবা, অন্যভাবে ভাবতে গেলে, অ্যাক বিরাআআট হোমড়াচোমড়া কড়া কেউ।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন দেখা হয়ে গেলো, আমি মোটের ওপর হতাশই হলাম। একদম মানুষ মানুষ দেখতে। একটা মাথা, দুটো হাত, দুটো পা ... ধুর, দুটো চোখ দুটো কান, হাসিমাখা একটা মুখ ... ব্যাপারটা কী? আর, কী তামশা, ওনার কোন মোচ নাই!

কিন্তু আমার ধর্মে বলে, মানুষের মোচ থাকতে হবেই। আমাদের মহাপুরুষ তা বলে গেছেন, আমাদের মহাগ্রন্থে তা লেখা আছে, আমাদের বাপমা আমাদের তা শিখিয়েছে। কেন, আমাদের মহাপুরুষেরই নাকি চমৎকার এক জোড়া মোচ ছিলো [পৃথিবীর সবচে সুন্দর মোচ, যদিও আমি নিজের চোখে দেখিনি] , এ নিয়ে তৈরি হয়েছে কতো সুন্দর পবিত্র মহাসঙ্গীত ... পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ লোক এই নিয়ম মেনে চলছে ... এমনকি কিছু মহিলাও হরমোন ফুঁড়ে কাজ চালানোর মতো [তবে সত্যি কথা বলতে কি, মোটেও সুন্দর নয়] জোড়া জোড়া মোচ গজিয়ে আর বাড়িয়ে নিয়েছেন, আর এখানে আমি, দাঁড়িয়ে সেই ঈশ্বরের সামনে, যার কোন মোচ নেই।

আমি বেশ উচ্চকণ্ঠ ছিলাম। "এরকম কেন?" আমি তর্জনী উঁচিয়ে সেই মহাঅবমাননাটিকে ঠিকঠাক শনাক্ত করলাম। "কোথায় গেলো ওটা?"

ঈশ্বর একটা দুর্বল হাসি ফোটালেন। "চমৎকার! তুমি দেখছি ভারি হুঁশিয়ার, নও?"

আমার একটু রাগ হলো। "এটা কী ধরনের মশকরা? আপনি কামালেন কেন? নাকি আপনি নিজেই এই খাপছাড়া ব্যাপারটা চালু করেছেন?"

আবারও হাসলেন তিনি। "হয়েছে কি ...," তিনি শুরু করলেন।

অজুহাত। শুধু খোঁড়া অজুহাত, আমি আগেই টের পেয়ে যাই। একদম পছন্দ না আমার ব্যাপারটা। আর সত্যি কথা বলি, একটু রাগ হচ্ছিলো আমার। না, আমি ফুটছিলাম পানির মতো। না, তা-ও না, বোধহয় ফেটেই পড়েছিলাম। অনেক দিন ধরে আমার আত্মার ভেতরে কী যেন জমছিলো ... হ্যাঁ, এমনই ছিলো ব্যাপারটা।

"এমনও হতে পারে নাকি?" আমি আহত সিংহের মতো গর্জে উঠি। "এমন হওয়া কি উচিৎ? ঈশ্বর, তাঁর মোচ ছাড়া! এই ... এই ব্যাপারটার চেয়ে অপবিত্র কি আর কিছু হতে পারে? আপনার কি ন্যূনতম আক্কেল বলে কিছু নেই? আপনি ঈশ্বর হয়ে থাকতে চান, তা-ও আবার মোচ ছাড়া?"

বেশ বোঝা যায়, ঈশ্বর হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। ভালো, ব্যাটার আরো শক্ত ঝাড়ি দরকার।

আমি থামিনি। "একেবারে সীমাহীন বেলাল্লাপনা! শুনছেন আমার কথা? মাত্রাছাড়া! একবার ভেবে দেখেছেন নাকি, যে আপনি, হ্যাঁ, মোচছাড়া ঈশ্বর, আমাকে এই বাজে আচরণের মধ্য দিয়ে সেরকম অপমান করেছেন! লোকে আপনাকে এরকম ঢিলেঢালাভাবে ঘুরতে দেখলে বলবে কী? বিশ্বাসীরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া করবে? আমাদের মহাপুরুষই বা কী মনে করবেন? আপনি ভেবে দেখেছেন এসব?"

ঈশ্বরত্বের মধ্যে কি কান্নাকাটিও আছে নাকি? থাকা উচিৎ ছিলো।

না, আমি বেজায় হতাশ হয়েছিলাম। আর হ্যাঁ, সত্যি কথা বলতে গেলে, ঈশ্বর হিসেবে তিনি একেবারেই যাকে বলে নিরেট ব্যর্থতা।

"আমি এখন যাচ্ছি।" দয়ামায়া করি না আমি, গর্জে উঠি। "কিন্তু এরপর এসে আমি চাই, আপনাকে যেন ফিটফাট ঈশ্বরের মতো দেখায়। বিদায়।"

আমি যখন চলে আসি তখন ঈশ্বর কিছু বললেন না। আহ, বোঝাই গেলো, বলার কিছু নেই তাঁর। বিশেষ করে, মোচ ছাড়া অবস্থায়।

1 comment:

  1. khub e chomotkar, apnar onubader standard is very high. kivabe koren? Joldi koilam ekta onubad chai.


    ............Shahenshah!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।