Thursday, September 07, 2006

গাড়ি সঙ্কট


১.

শুঁটকির ব্যবসা করে ফুপার হাতে যে এককাঁড়ি টাকা এসেছে, সেটা তোমরা ঐ সিনেমার গল্প পড়ে জেনেছো। আর হাতে টাকা এলে মানুষের ভীমরতি ধরে। ফুপাকেও ধরলো। তিনি বায়না করলেন, একটা লিমুজিন কিনবেন। হ্যাঁ, এখন থেকে লিমুজিনে চেপেই তিনি মাছের ব্যবসা করবেন।

বায়নার কথা শুনে তোমরা আবার ভেবে বসো না, উনি অন্য কারো কাছে আহ্লাদের বায়না ধরেছেন। তিনি তো কচি খোকা নন, বরং একেবারেই ঝুনা এক মানবসন্তান, তাঁর কি আর আহ্লাদ করার বয়স আছে? কাছাড়া, কার কাছে বায়না ধরবেন তিনি? আর অন্যের কাছে বায়না ধরার কি-ই বা প্রয়োজন উনার? তাঁর নিজেরই এখন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। তিনি এক গাড়ির ডীলারের কাছে গিয়ে বায়না করে এসেছেন, মানে আগাম টাকা দিয়ে এসেছেন আগমার্কা একটা লিমুজিন কেনার জন্যে।

ফুপার একটা ছোট্ট ফোক্সভাগেন আছে। সেটা দিয়েই তিনি এতকাল কাজ চালিয়ে এসেছেন। জার্মান জিনিস বলতে ফুপা অজ্ঞান, তাই তিনি এবারও মতলব এঁটেছিলেন কোন একখানা জার্মান কোম্পানীর তৈরী লিমুজিন কিনবেন। তো, জার্মান গাড়ির দামদস্তুর শুনে অবশ্য তিনি সত্যি সত্যিই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন মিনিট খানেকের জন্যে, তারপর সেই গাড়ির ডীলার তাকে একটা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে আবার চাঙ্গা করে তুলেছিলো। শেষমেষ বিস্তর মূলোমূলির পর যখন কোন কাজ হলো না, গাড়িওয়ালা সাফ সাফ জানিয়ে দিলো যে ফুপা যে দাম বলছেন তাতে জার্মানরা রিকশাও বিক্রি করবে না, লিমুজিন তো কোন ছার --- তখন ফুপা রেগে আগুন হয়ে বিস্তর ঝগড়াঝাঁটি করে বেরিয়ে এসেছেন। তারপর তিনি কোন এক অখ্যাত জাপানি কোম্পানীর লিমুজিন কেনার জন্যে আগাম পয়সা --- মানে, বায়না করে এসেছেন। গাড়িওয়ালা অবশ্য ফুপার জার্মানপ্রীতির কাহিনী খানিকটা শুনে তাঁকে একগাল হেসে আশ্বস্ত করেছে, 'আরে স্যার --- জার্মান জাপানের মধ্যে তফাৎ দেখলেন কিসে? নামে যেমন মিল --- এদের কামেও তেমন মিল। দেখেন না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকাকে কি টাইট দিলো দু'জন মিলে? য়্যাঁ? কী নাকানিচুবানিটাই না খেয়েছে শালারা! এরা হচ্ছে ভায়রা ভাইয়ের মতো। হুঁ হুঁ --- বুশ যদি তখন থাকতো, কাছা খুলে দৌড়ে পালাতো। দুবলা পেয়ে ইরাকের ওপর তম্বি করছে ব্যাটা --- যাই হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে স্যার, জার্মান জাপানে কোন ফারাক নেই স্যার, খালি নাকটা আর দামটা ছাড়া স্যার ---।' এই স্যারভর্তি কথা শুনে খালু আশ্বস্ত তো হয়েছেনই, তার ওপর তিনি জাপানেও শুঁটকি মাছ রপ্তানীর একটা পরিকল্পনা ফেঁদে বসেছেন বাড়ি ফেরার পথে।

ফুপার আগের ফোক্সভাগেনটার কপালে কী আছে, কিংবা কার কপালে সেটা লেখা আছে, এই নিয়ে আমরা অনেক হিসাবনিকাশ করলাম। ফোক্সভাগেনটার ওপর আমার একটা হালকার ওপর পাতলা লোভমতো ছিলো, জিনিসটা বাগাতে পারলে মন্দ হয় না। আমাকে হয় বাসে চেপে, নয়তো রিকশায় চড়ে সবখানে যেতে হয়, এর বদলে একটা গাড়িতে করে যাতায়াত করলে কিঞ্চিৎ জাতে ওঠার চেষ্টা করা যেতো। তেমনিভাবে আমার চাচাতো ভাই বিল্লুরও খুব আকর্ষণ ওটার প্রতি। অবশ্য বিল্লুর বয়স মোটে দশ, আর গাড়িতে করে খেলার মাঠের চেয়ে বেশি দূরে যাবার দরকার তার তেমন একটা নেই, কাজেই আমার দাবীটা ওর চেয়ে অনেক বেশি জোরালো। অবশ্য দাবীটাকে জোরালো করতে গিয়ে খানিকটা জোর আমাকে খাটাতে হলো, গোটা পাঁচেক খামচির শোধ হিসেবে বিল্লুকে কষে দু'টা কিল চুকিয়ে দিলাম।

তবে আমাদের মতো আরো পাঁচ-সাতজনের সম্মিলিত সশস্ত্র দাবির ফলাফল বেরুলো যেটা, সেটা হচ্ছে, পুরনো গাড়িটা ফুপার কাছেই থাকবে। হরতালের দিনে বেরোতে হলে তিনি ওটায় চেপে বেরোবেন। গুলি, বোমা, আধলা ইট এবং কাকের হাগু ইত্যাদি হ্যাপা সামলানোর দায়িত্ব বেচারা পুরনো ফোক্সভাগেনটার (ফুপা কাকের হাগুর ওপর বিশেষ জোর দিলেন, যেন হরতাল ছাড়া অন্য কোন দিন কাক হাগু করে না --- কিংবা করলেও তাঁর লিমুজিনের রূপ দেখে সেটার হাগু আটকে যাবে)। আর লিমুজিনে করে তিনি অন্যান্য নিরাপদ দিনে অফিসে যাবেন, হাওয়া খেতে বেরোবেন, পাড়াপড়শীদের চোখ টাটিয়ে দেবার জন্যে মাঝে মাঝে ওটায় চেপে কাঁচা বাজার করতে যাবেন --- ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত গোঁ বজায় রেখে মিনমিন করে দাবি তুলেছিলাম মাসখানেকের জন্যে আমাকে সেটা বরাদ্দ করে দেবার জন্যে, কিন্তু ফুপা এমন হাঁ হাঁ করে উঠলেন যে আমি বিষম ঘাবড়ে গিয়ে নিজের হাঁ বুঁজিয়ে অকালেই থেমে গেলাম।

ফুপাতো গাড়ি আমার ভাগ্যে নেই জেনে আমি খানিকটা মুষড়ে পড়েছিলাম, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে একদিন সকালবেলা ফুপার বাসায় গেলাম সেই জাপানি লিমুজিন দেখার জন্যে।

ফুপা থাকেন আমাদের বাসার কাছেই, হাঁটা পথ পার হলেই সেখানে যাওয়া যায়। বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছে দেখি, উরেব্বাস, একগাদা লোক সেখানে গিজগিজ করছে। ভালো করে তাকিয়ে আমাদের বেশ কয়েকজন আত্মীয়স্বজনকে শনাক্ত করা গেলো। আরো এসেছেন ফুপার বন্ধুবান্ধব, অফিসের লোকজন। সবাই গাড়ি দেখতে এসেছে। ফুপাকেও দেখলাম লিমুজিনের পাশে দাঁড়িয়ে, দিব্যি সেজেগুজে পায়জামা পাঞ্জাবী পরে লাজুক মুখে। নতুন বরের মতো একটা রুমালও দেখলাম যেন তাঁর হাতে।

লোকজনের ভিড় দেখেও আমি চমকে গেলাম। সবাই খুব কেতাদুরস্তভাবে হাজির, যেন নতুন কনের সাথে মোলাকাত করতে এসেছে। কারো পরনে পাঞ্জাবী-চোস্ত-সুগন্ধি, কেউ কেউ দামী শাড়ি পরা এবং এই সুযোগে কয়েকজন লেটেস্ট মডেলের জামাকাপড়, যেগুলো শাড়ি-সালোয়ারকামিজ-লেহেঙ্গা-চোলিঘাগরা কোন শ্রেণীতেই ফেলা যায় না এমন সব জিনিস গায়ে চাপিয়ে ঘুরছেন। একজনকে দেখলাম এই গরমে স্যুট-টাই পরে দরদর করে ঘামছেন আর আড়চোখে লিমুজিনটাকে দেখছেন।

সবাইকে দেখেশুনে যখন গাড়িটার দিকে চোখ পড়লো, ভারি ভাবিত হয়ে পড়লাম। এ কি? এই কি লিমুজিন? বিচ্ছিরি ক্যাটকেটে সবুজ রঙ, ক্যামন যেনো চ্যাপ্টা, সিড়িঙ্গে মার্কা নাক-বোঁচা একটা বিরাট লম্বা গাড়ি। অনেকটা টেম্পোর মত দেখতে, আমার প্রথমেই মনে হলো।

লিমুজিনটাকে কোরবানির গরুর মতো টিপেটুপে দেখছে সবাই। খালুর এক দুলাভাই গাড়ির বনেটে গদাম করে একটা কিল কষিয়ে দিয়ে বললেন, 'এই না হলে গাড়ি, য়্যাঁ? খুবই টেকসই বডি! এই গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে বের হলে চৌদ্দটনী ট্রাকও রাস্তা ছেড়ে পাশের খালে নেমে জায়গা করে দেবে --- আরে ট্রাকের চেয়ে এটা কম কিসে? অ্যাত্তো অ্যাত্তো জায়গা --- এই মোটা মোটা টায়ার --- খালি গায়ে লিখে দিলেই হবে সমস্ত বাংলাদেশ পাঁচ টন --- য়্যাঁ? কি বলো তোমরা? হা হা হা ---।'

কোত্থেকে ফুপার পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালা হাজির হলেন। 'আহহা --- একেবারে কচি ঘাসের মতো রঙ --- বাংলাদেশের ফ্ল্যাগের রঙ। একটা লাল গোল্লা একে নিন না দাদা, বেশ মানাবে।'

ফুপার ছোট ছেলে পল্টু বাদ সাধলো, 'না আব্বু, এটাকে হলুদ রঙ করে দাও। লিমুজিন থেকে হিমুজিন করে দাও এটাকে!'

পল্টুর ছোট চাচা বললেন, 'আরে ধ্যেৎ বেক্কল, তাহলে সবাই এটাকে ট্যাক্সি ক্যাব ভাববে না?'

ফুপু এই গন্ডগোলে খুবই বিরক্ত, এবং গন্ডগোলের মূল স্বয়ং ফুপা এবং তাঁর লিমুজিনের ওপর তাঁর বেশ বিতৃষ্ণা, তিনি খানিকটা বিষ ঝেড়ে বললেন, 'না ছোটন, ট্যাক্সি ক্যাব দেখতে কখনো এতো বিশ্রী হয় না।'

ফুপার দুলাভাই, যিনি খুব ট্রাকভক্ত (এবং আমার কেন যেন দৃঢ় ধারণা জন্মে গেলো যে মোড়ে যেই ট্রাকটাকে থেমে থাকতে দেখা যাচ্ছে, ওটা তাঁরই, এবং তিনি ওটাতে চড়েই চলাফেরা করেন), তিনি হই হই করে উঠলেন, 'হর্ণটা শোনাও, হর্ণের আওয়াজটা শোনাও! হাইড্রলিক হর্ণের সাথে পাল্টি দেয়া চাই কিন্তু! একেবারে কর্ণবিদারী হর্ণ চাই!'

এই দাবীর সাথে সংহতি প্রকাশ করে আরো কয়েকজন বোল তুললেন। ফুপার নূতন লিমুজিনের পুরনো ড্রাইভার লিমুজিনের ভেতরে ঢুকে মোলায়েম শব্দে এনজিন স্টার্ট দিয়ে হর্ণের শব্দের একটি স্যাম্পল শোনালেন আমাদের। এবং আমাদের পিলে এমনভাবে চমকালো, যেমনটা অনেক বছর চমকায়নি।

হর্ণের আওয়াজটা অতি বিচ্ছিরি, খানিকটা হাঁপ ধরা রোগীর কাশির মতো। জাপানি গাড়ির কাছ থেকে আমরা এই হাঁপানি আশা করিনি, সবাই কমবেশি মনক্ষুণœ হলাম, শুধু ফুপার দুলাভাই নেচে উঠলেন, 'বেড়ে হর্ণ দিয়েছে, য়্যাঁ? --- এক্কেবারে সাক্ষাৎ ট্রাকের বাচ্চা! দিনে দিনে এর গলা আরো খুলবে, দেখে নিও! তখন এর কাছে আটচাকার ট্যাঙ্কারগুলোও পাত্তা পাবে না!'

ফুপা অবশ্য তাঁর সাধের লিমুজিনের সাথে এরকম ট্রাক-ট্যাঙ্কারের তুলনা খুব একটা ভালো চোখে দেখছেন বলে আমার মনে হলো না, কিন্তু তাঁকে খুব একটা বিমর্ষও মনে হলো না। কারণ খুব সম্ভবত এই যে তিনি জাপানে শুঁটকির একটা চালানের ব্যাপারে কনফার্মেশন পেয়েছেন।

আস্তে আস্তে ভিড় কমতে লাগলো, শুধু আমার আরেক ফুপাতো ভাই পিচ্চি আবদার ধরলো, তাকে একদিন এই গাড়িতে চড়িয়ে ঢাকা শহর ঘোরাতে হবে এবং ফেরার পথে তার কোন এক বন্ধুর গাড়ির পেছনে একটা রামধাক্কা দিতে হবে। পিচ্চি গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটির ব্যাপারে খুব তালেবর জেনে ফুপা সহাস্যে এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। নাহয় একটা ধাক্কাই দেবেন, এমন কোন ব্যাপার না।


২.

এক মাস পর।

এই এক মাসে পাড়া পড়শিরা সবাই জেনে গেছে, হ্যাঁ, সবুজ রঙের না-বাস-না-ট্রাক-না-টেম্পোর মতো গাড়িটা ফুপার গাড়ি। প্রথম দিকে আশেপাশের অনেক ভীতুগোছের নার্ভাস লোকজন জানালার পর্দা সরিয়ে, কেউ হয়তো বারান্দায় ফুলগাছে পানি দেয়ার অজুহাত নিয়ে, আবার অনেক নির্ভীকহৃদয় মানুষ দরজা খুলে বাইরে এসে জাঁক করে দেখতো ফুপার লিমুজিনের চলনভঙ্গিমা। অবশ্য হপ্তাখানেকের মধ্যে ব্যাপারটা পানসে হয়ে গেলো। তবে যেসব বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে, তাঁরা খুব হার্দিক স্বাগতম জানালেন গাড়িটাকে। তাঁদের বাচ্চাদের নাকি 'গাড়ি ভূত' 'গাড়ি জুজু' ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে।

তবে হর্ণের ব্যাপারটা কেউ ভালো চোখে দেখেনি, মানে, ভালো কানে শোনে নি। কিংবা ভালো কানেই শুনেছিলো, তবে কয়েকবার শোনার পরই কানটা খারাপ হয়ে গেছে। ফুপার হর্ণে শব্দ শুনলে নাকি দুধ ছানা হয়ে যায়। এটা অবশ্য নেহায়েত শোনা কথা, তবে ছানাপোনাদের যে ঘুম ভেঙে যায় সেটা নিজের চোখে দেখা। সেদিন নাকি ফুপা লিমুজিনটার স্পিড যাচাই করার জন্যে একটা অ্যাম্বুলেন্সের সাথে পাল্লা দিচ্ছিলেন, হঠাৎ সামনে রিকশা পড়ায় হর্ণ দিতে হলো। এরপর দেখা গেলো অ্যাম্বুলেন্সটা কিছুক্ষণ খুব আস্তে আস্তে চলে হঠাৎ মোড় ঘুরে উল্টো দিকে, মানে যে দিক থেকে আসছিলো, সে দিকেই ছুটতে শুরু করলো। ফুপা ভারি চটে গেলেন অ্যাম্বুলেন্সওয়ালার ওপর, এই রণে ভঙ্গ দেয়ায়। স্পোর্টসম্যানশিপের এই চূড়ান্ত ঘাটতির জন্যে লোকটাকে কষে গালমন্দ করবেন ভেবে তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটাকে তাড়া করলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, হার্টের অসুখের রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তিনি মাঝপথেই ইন্তেকাল করেছেন, খুব সম্ভবত বিদঘুটে কোন আওয়াজ শুনে। বû হ্যাপা সয়ে বেচারার হৃৎপিন্ডটা টিকে ছিলো অ্যাতো বছর, কিন্তু এসব শব্দপ্র“ফ করে তো খোদা হৃৎপিন্ডটিকে গড়েননি। ফুপা অবশ্য এই ঘটনার সাথে তাঁর গাড়ির হর্ণের আওয়াজকে কোনভাবেই সংশ্লিষ্ট হতে দিতে রাজি নন। তাঁর মতে এটা একটা কাকতালমাত্র। তবে তাঁর এই বক্তব্য অনেকে মানতে নারাজ। ছোটন, মানে ফুপার ছোট ভাই তো বলেই বসলো, কাকের ডাক খুবই কড়া জিনিস, কাকের ডাক শুনেও তাল খসে পড়তে পারে। ফুপা এ কথাটাও পছন্দ করেননি, কারণ কাকের ডাকের সাথে তাঁর গাড়ির হর্ণের একটা তুলনা দেয়ার প্রচেষ্টার আঁশটে গন্ধ পেয়েছেন তিনি। তাই এরপর আরেকটু সাবধানে ব্যাপারটাকে একটা 'দুঃখজনক কোইনসিডেন্স' বলা শুরু করলেন।

তো যাই হোক, আসল ঘটনার এখন শুরু। আপনারা সবাই কান খুলে গল্প শোনেন, মানে, চোখ খুলে গল্প পড়েন।


৩.

ফুপার লিমুজিন থেমেছে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশে চৌরাস্তায়। তাঁর পাশে তখন কোত্থেকে সাঁ সাঁ করে এসে থেমেছে ছোট্ট ঝাঁ চকচকে একটা টু সীটার। লাল রঙের মিষ্টি একটা গাড়ি, দেখতে শুনতে ফুপার লিমুজিনের চেয়ে অনেক ভালো। তো ফুপা জানালার কাঁচ নামিয়ে সেই গাড়িটা একটু ভালোমতো ঠাহর করে দেখতে যাবেন, এমন সময় ড্রাইভিঙ সিট থেকে নেমে এলো বাচ্চা একটা ছেলে। বাচ্চা মানে, আঠারো ঊনিশ বছর বয়স হবে হয়তো। রোগা কালো টিঙটিঙে, এই বড় চশমা পরা চোখে। সে এসে সিধে ফুপাকে জিজ্ঞেস করলো, 'আঙ্কেল, সাউথ আফ্রিকা কতো রান করলো?'

ফুপা প্রথমটায় ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন কোন ছিনতাইকারী হয়তো তাঁর লিমুজিন দেখে তাকে এতক্ষণ ধাওয়া করছিলো, এখন রাস্তার মোড়ে বাগে পেয়ে তাকে লুট করার জন্যেই ছুটে এসেছে, এই বাচ্চা ছেলেটাকে দেখে এবং তার প্রশ্ন শুনে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। যাক, কোন মারমুখো হাইজ্যাকার নয়, সাধারণ একজন ক্রিকেটানুরাগী। তিনি খুশি খুশি গলায় বললেন, 'তা তো ঠিক বলতে পারি না চাচ্চু, অনেকক্ষণ হলো বেরিয়েছি বাসা থেকে --- স্কোর বলতে পারবো না।'

ছেলেটা তাঁকে এবং তাঁর লিমুজিনকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে কেমন একটা ফিচেল হাসি দিয়ে বললো, 'সে কি আঙ্কেল, আপনি খেলা দেখছেন না এখন?'

ফুপা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'এখন? এখন খেলা দেখবো কিভাবে?'

ছেলেটা তখন ভারি চওড়া একটা হাসি দিয়ে বললো, 'বলেন কি? অ্যাতোবড়ো একটা লিমুজিন আপনার, আর একটা টিভি নেই ভেতরে? --- আমার এই পিচকিনি গাড়িটার ভেতরেই তো একটা চৌদ্দ ইঞ্চি আছে। তবে গাড়ির ডিশ অ্যান্টেনাটা কাজ করছে না বলে ইএসপিএন দেখতে পারছি না।' ইঙ্গিতে সে গাড়ির ছাদে ফিট করে ছোট্ট একটা ডিশ অ্যান্টেনা দেখিয়ে বলে। 'ভেবেছিলাম আপনার কাছে হয়তো স্কোরটা জানতে পারবো। এখন দেখছি নাহ্ ---,' হতাশার একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে, 'সবার কাছে সব কিছু থাকে না।'
এই বাজে কথাটা শুনে ফুপার মাথায় বাজ পড়ে, তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। ঠিক তখনই সিগনালের বাতি জ্বলে ওঠে, ছেলেটা তাকে হাত নেড়ে টাটা জানিয়ে চোখের পলকে ড্রাইভিঙ সিটে বসে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়।

ফুপা রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে বলেন। তারপর এক টানে সেই গাড়ির ডীলারের কাছে হাজির হতে বলেন। শালারা তাঁর গাড়িতে টিভি অ্যান্টেনা কিচ্ছু দেয়নি, যতোসব জোচ্চোরের দল। আজকে ওদের জন্যেই পিচ্চি একটা ছেলের কাছে তিনি অপদস্থ হলেন। তাঁর লিমুজিনকে ছোট করে ঐ ছোট্ট গাড়িটা পালিয়ে গেলো!

গাড়ির ডীলারের কাছে গিয়ে হাত পা ছুঁড়ে তিনি চেঁচাতে থাকেন, 'হেই মিয়া, মশকরা পেয়েছেন? টিভি দেন নাই, অ্যান্টেনা দেন নাই --- আমি খেলা দেখতে পারি না --- আজকে সাউথ আফ্রিকার সাথে ইয়ের খেলা আছে --- ভাবলাম গাড়িতে বসে দেখবো --- ও মা, গাড়িতে উঠে দেখি টিভিই ফিট করা হয় নাই --- এইভাবে জোচ্চুরি করে ব্যবসা চালাতে পারবেন আপনি? --- এর জন্যেই জাপানি জিনিস কেনা উচিত হয় নাই! জার্মান গাড়িতে সব থাকে!'

ডীলার ভদ্রলোক মিষ্টি হেসে ভারি বিনীত ভাবে বলেন, 'আপনি মোটেও দুশ্চিন্তা করবেন না স্যার --- আসলে এটা তো আলাদা করে অর্ডার দিতে হয়, আপনি তো টিভির ব্যাপারে কিছু বলেননি --- তাই আমরাও টিভি দিইনি। --- তা বলুন আপনার কি ধরনের টিভি আর অ্যান্টেনা দরকার? আমরা এক্ষুণি এক সেট জাপানি জিনিস ফিট করে দেবো।'

ফুপা তখন মনে মনে হিসাব করে বলেন, 'দেড় গুণ বড় টিভি দেন, আর দশগুণ বড় অ্যান্টেনা দেন।' ঐ ছোকরার চেয়ে অনেকগুণে বড় গাড়ি তাঁর, কাজেই গ্যাজেটও চাই বড় বড়। বাজেট কোন ব্যাপার না।

ডীলার ফুপার গুণভাগ কিছু বোঝেন না, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন।

ফুপা তখন খানিকটা লজ্জিত হয়ে মাথা চুলকে বলেন, 'ইয়ে, চৌদ্দ দেড়া একুশ ইঞ্চি টিভি দ্যান, আর এই অ্যাত্তো বড়ো ডিশ অ্যান্টেনা দ্যান।' দু'হাত ছড়িয়ে দেখান তিনি। 'পয়সাপাতি যা লাগে, এখুনি দিচ্ছি। --- কিন্তু আমার সাউথ আফ্রিকার সাথে ইয়ের খেলা দেখা চাই-ই চাই।'

নগদ টাকাপয়সার কথা শুনে ডীলার সাহেবের মুখে ডিশ অ্যান্টেনার মতোই ছড়ানো হাসি ফুটে ওঠে। তিনি তুড়ি দিয়ে মেকানিক গোছের একজনকে ডাকেন। ফুপা মনে মনে ফঁুসতে থাকেন। এইটুকুন পিচকি একটা গাড়িতে আরো পিচকি একটা ছোকরা তাঁকে এভাবে দিনে দুপুরে অপমান করে চলে গেলো!


৪.

সেদিনের মধ্যেই ফুপার গাড়িতে একটা টিভি আর একটা অ্যান্টেনা জুড়ে দেয়া হয়। লিমুজিনের ছাদ জুড়ে ডিশ অ্যান্টেনা ফিট করার পর সেটার চেহারা আরো কিম্ভূতকিমাকার হয়ে যায়। পাড়ার লোকজন এখন ভিড় করে সেটা দেখে। জুজু ভূতের এমন অভূতপূর্ব বিবর্তন দেখে বাচ্চাকাচ্চার বাবা-মায়েরা আহ্লাদে উথলে ওঠেন। এবং সত্যি কথা কি, এমন একটা জিনিস দেখলে কাকেরাও হাগু ভুলে যাবে। অবশ্য তাতে ফুপার কোন ভ্র“ক্ষেপ নেই, তিনি এখন গাড়ির ভেতর শুয়ে শুয়ে নানারকম প্রোগ্রাম দেখেন। এমনকি এখন আর তাঁর নিজের ঘরে বসে টিভি দেখতেও ভালো লাগে না, তিনি মাঝে মাঝেই গ্যারেজে গিয়ে গাড়িতে চড়ে একুশ ইঞ্চি টিভিতে একুশে টিভির খবর শোনেন। গাড়িতে চড়ে যদি টিভিই দেখতে না পারলেন তাহলে লিমুজিন কিনলেন কেন তিনি?

তো যাই হোক, কয়েকদিন পরই ফুপার লিমুজিন আবার থেমেছে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশে চৌরাস্তায়, যেখানে কয়েকদিন আগে সেই ডেঁপো ছোকরাটা তাকে টিভি আর অ্যান্টেনা তুলে খোঁটা দিয়েছিলো। এবং কি আজব ব্যাপার, আজও সেদিনকার তাঁর পাশে কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে থামে সেই ছোট্ট লাল রঙের টু সীটারটা। ড্রাইভিঙ সীটে বসে আছে সেই হতচ্ছাড়াটা। তবে আজকে ফুপা দিব্যি খোশ মেজাজে আছেন, এখন তাঁর টিভি অ্যান্টেনা সবই আছে, আজ তিনি লড়াইয়ের জন্যে তৈরি। তিনি আগের মতোই জানালার কাঁচ নামিয়ে ছেলেটাকে ডাকেন, 'কি হে খোকা, আজকে কোনো খেলাটেলা নেই?'

তাঁর ডাক শুনে গাড়ি থেকে নেমে এলো সেই ছেলেটা। আজকে তার মুখটা ভারি মলিন, দেখে ফুপা খুশিই হলেন। নিশ্চয় তাঁর অ্যাত্তোবড়ো অ্যান্টেনাটা দেখে হতভাগা হিংসেয় জ্বলেপুড়ে মরছে।

কিন্তু না, ছেলেটা তাঁর অ্যান্টেনার দিকে দৃষ্টিপাত করে না। বরঙ ঘাড় হেঁট করে ভারি দুঃখী গলায় বলে, 'আমাকে কিছু বলছেন আঙ্কেল?'

ফুপা ছাদের দিকে আঙুল তুলে, একটা সন্তুষ্টির হাসি ফুটিয়ে বলেন, 'টিভি আর অ্যান্টেনা ফিট করে ফেললাম হে। দু'টোই তোমারগুলোর চেয়ে অনেক বড়।'

ছেলেটা অ্যাতোক্ষণে ছাদের দিকে তাকিয়ে বিশাল অ্যান্টেনাটা বেকুবের মতো চেয়ে দেখে, তারপর আগের মতোই ভাঙা গলায় বলে, 'ওহ্, ওটা অ্যান্টেনা? আমি ভেবেছিলাম আপনি বুঝি ছাদের ওপর বাবুর্চিখানার কড়াই নিয়ে যাচ্ছেন।'

বেয়াদবটার কথা শুনে ফুপা যারপরনাই চটে যান, কিন্তু মুখের হাসি ধরে রেখে বলেন, 'তা সাইজে একটু বড়ই হলো। আফটার অল, একুশ ইঞ্চি টিভির জন্যে ছোট একটা অ্যান্টেনা লাগালে কেমন দেখায়? আর একটা লিমুজিন বলে কথা। যার জন্যে যেমন জিনিস।'

ছেলেটা মলিন মুখে মাথা নাড়ে, 'হক কথা বলেছেন আঙ্কেল।'

ফুপা জানতে চান, 'তা আজকে খেলা দেখছো না?'

উত্তরে ফুঁপিয়ে ওঠে ছেলেটা, 'নাহ্, ম্যাচ শেষ। সাউথ আফ্রিকা ফাইন্যালে গোহারা হেরে গেছে। নয় উইকেটে জিতে গেছে ইংল্যান্ড --- ওহহোহো।' আলাপের মাঝে বিলাপ করতে থাকে সে।

ফুপা কিভাবে সান্ত¡না দেবেন বুঝতে না পেরে বোকার মতো তাকিয়ে থাকেন। ছেলেটা তখন গাড়িতে ফিরে গিয়ে একটা বোতল আর একটা গ্লাস নিয়ে আসে। গ্লাসের মধ্যে সে বোতল থেকে হলদে রঙের কিসব যেন ঢালে, তারপর চোঁ চোঁ করে গিলে ফেলে। ফুপা ভীষণ ঘাবড়ে যান। আজকালকার ছেলেগুলো কি বাজে, ক্রিকেট খেলায় কে না কে হেরে গেছে দেখে দিনে দুপুরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মদ খাওয়া হচ্ছে।

ছেলেটা বোতলের জিনিসটা ওভাবে খেয়ে বোধহয় স্বস্তি পায় না, চোখমুখ কুঁচকে কি মনে করে পায়ে পায়ে ফুপার কাছে এগিয়ে আসে। 'আঙ্কেল, দুই পিস বরফ হবে?' ঢুলুঢুল চোখ করে বলে সে।

ফুপা যার পর নাই বেকুব হয়ে যান। এই ঠা ঠা রোদের মধ্যে বরফ পাবেন কি করে তিনি?

ছেলেটা কৈফিয়ত দেয়, 'জনি ওয়াকারের ব্লু লেবেলটা আবার ঠান্ডা না হলে ঠিক জমে না --- জানেনই তো? আমার ফ্রিজটা আবার আজকে খুব গন্ডগোল করছে --- আপনার কাছে বরফ হবে?'

ফুপার গলায় হঠাৎ কী একটা যেন জাম হয়ে যায়, তিনি দু'পাশে মাথা নেড়ে না বলেন।

ছেলেটা তখন হঠাৎ কি মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলে, 'ওহহো, আপনার অ্যাতোবড় লিমুজিনে তো মনে হয় ফ্রিজ নেই --- ইশ, সরি, একদম মনে ছিলো না।' হতাশার একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে, 'আসলে সবার কাছে সব কিছু থাকে না।'

ফুপার মাথায় আবারো বাজ পড়ে। ছেলেটা আরো এক ঢোঁক খেয়ে গাড়িতে চড়ে বসে। সিগনালের বাতি জ্বলে ওঠে, সোঁ করে লাল গাড়িটা তাঁকে পেছনে ফেলে রেখে চলে যায়।

ফুপা গাড়ির মধ্যে বসেই লাফাতে থাকেন। হারামখোরের দল, তাকে সামান্য একটা ফ্রিজ পর্যন্ত দেয় নি, আবার লিমুজিনের ব্যবসা করে! তিনি ডীলার ভদ্রলোকের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করতে করতে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরানোর হুকুম দেন।

গাড়ির দোকানে গিয়ে এবার তিনি লিমুজিন থেকে নামেন শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে। 'হেই মিয়া, কি পেয়েছেন আপনারা? বলি পেয়েছেনটা কি? --- অ্যাঁ? সামান্য একটা ফ্রিজ রাখেন নি গাড়ির মধ্যে? --- এই গরমের মধ্যে ভাবলাম একটু জনি ব্লু এর ওয়াটার লেবেল খাবো বরফ দিয়ে --- গাড়িতে উঠে দেখি ফ্রিজ বসানো হয় নাই --- বরফ পাই নাই দেখে আর খাওয়া হলো না --- আমাকে আর কতো ঠকাবেন আপনি? বলি জাপানিরা কি ফ্রিজ জিনিসটা চেনে না? জাপানে কেউ বরফ খায় না? জার্মান গাড়ি কিনলে আমাকে এতো ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হতো না ---!'

ডীলার ভদ্রলোক ফুপার শার্টের হাতা গোটানো দেখেই কেমন একটা দৌড়ের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন, ফ্রিজের কথা শুনে তিনি মুখে হাসি এনে কপালের ঘাম মোছেন। 'ওহহো --- ফ্রিজ? খুবই দুঃখিত স্যার, আসলে অর্ডার দেয়া হয়নি তো ---। এটা তো কোনো ব্যাপারই না স্যার --- এক্ষুনি আপনার লিমুজিনে একটা ছোট্ট ফ্রিজ জুড়ে দিচ্ছি। কত সিএফটির হলে আপনার চলবে স্যার?'

ফুপা তেড়ে ওঠেন, 'যত বড় পারেন ফিট করে দ্যান। --- আর শুনেন, খালি ফ্রিজ দিলেই চলবে না --- আমাকে মাইক্রোওয়েভ ওভেন, মিক্সার, জু্যুসার, ব্লেন্ডার, ইস্ত্রি, হ্যাজাক বাতি --- সব ফিট করে দিবেন এখন! কোন কিছু যাতে বাদ না পড়ে।' এবার তিনি আগেভাগে প্রিপারেশন নিয়ে রাখেন। কবে আবার কোন রাস্তার মোড়ে ঐ ছোকরা কি না কি সামান্য জিনিসে খোঁটা দিয়ে তাঁর সম্মানহানি করে চলে যাবে, সেটা তিনি হতে দেবেন না।

ডীলারের মুখে খুশির আলো ফোটে, সে একগাদা মেকানিককে ডেকে ডেকে ধমকাতে থাকে। ফুপা সেদিনের মতো লিমুজিনটাকে গ্যারেজে সঁপে দিয়ে একটা রিকশা ডেকে বাসায় ফেরেন।


৫.

পরদিন সকালে গ্যারেজ থেকে ফুপার বাড়িতে লিমুজিন চলে আসে। ভেতরে সব রকমের গ্যাজেট ফিট করা। ফুপা এক হালি আপেল নিয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকেন। প্রথমে সেটাকে ব্লেন্ডারে নিয়ে জু্যুস করেন, তারপরে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে ঠান্ডা করে খান। আরামে তাঁর দুই চোখ বুঁজে আসে। নাহ্, এবার হয়েছে লিমুজিনের মতো লিমুজিন। এইবার সেই ছোকরাকে তিনি একহাত দেখে নেবেন। কতোবড়ো সাহস, এইটুকু একটা জুতার বাক্সের সাইজের গাড়ি নিয়ে তাঁর সাথে মস্তানি করতে আসে!

এরপর কয়েকদিন ফুপা লিমুজিন নিয়ে এদিক ওদিক উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরে বেড়ান সেই ছোট্ট লাল টু-সীটারওয়ালা ছেলেটার খোঁজে। কিন্তু না, আর তার দেখা নেই। এক মাস খোঁজাখুঁজির পর তিনি ভাবলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবেন, ওহে বেয়াদব ছোকরা, তোমার বরফ নিয়ে যাও, কিন্তু কি মনে করে সেই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেন। ফুপা মনে মনে জ্বলতে থাকেন, বদমাইশটাকে ঢিঢ করা গেলো না ভেবে।


৬.

আরও কয়েক হপ্তা খোঁজাখুঁজির পরও যখন ছোকরাকে পাওয়া গেলো না, তখন ফুপা ধরে নিলেন বেয়াদবটা নিশ্চয়ই কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট করে অক্কা পেয়েছে, নয়তো ঐ ফালতু দুই সীটওয়ালা গাড়িটাকে ধোলাইখালের কোনো জাঙ্কইয়ার্ডে বেচেবুচে দিয়ে তাঁর গাড়ির মতো একখানা লিমুজিন কেনার জন্যে মাটির ব্যাংকে পয়সা জমাচ্ছে। আরও কয়েক হপ্তা জাপানে তাঁর শুঁটকির চালান নিয়ে ছুটোছুটি চললো খুব। তারপর একদিন ফ্যান্টাসি কিংডমে গিয়ে রোলার কোস্টারে চড়ে প্রায় ভিড়মি খেয়ে তিনি ছোকরাকে বিলকুল ভুলেই গেলেন।

কিন্তু না। ফুপার লিমুজিন একদিন কোন এক কুক্ষণে আবার থামলো রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পাশে চৌরাস্তায়। এবং আবার, তাঁর পাশে কোত্থেকে জিনের পালকির মতো সাঁ সাঁ করে এসে থামলো সেই ছোট্ট ঝাঁ চকচকে লালরঙা টু সীটারটা।

ফুপার বুক ধ্বক করে উঠলো, এক নিমিষে তাঁর সব কিছু মনে পড়ে গেলো। তিনি গাড়ির কাঁচ নামিয়ে মাথা বার করে হেঁকে বললেন, 'এই যে বাবু, অ্যাই!'

কেউ সাড়া দিলো না।

ফুপা একটু ঘাবড়ে গেলেন। অন্য কোন গাড়ি নাকি তবে? ডেঁপোটার গাড়ি নয়? ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন, উঁহু, সেই শালগম সাইজের ডিশ অ্যান্টেনা --- সেই পিচ্চি গড়ন --- এটাই সেটা। তিনি আবার খুব করে হেঁকে বললেন, 'এই যে বাবু, লাল গাড়িওয়ালা, এদিকে শুনে যাও তো!'

তবুও কোন সাড়া নেই।

এবার ফুপার মনে ভারি একটা বাজে সন্দেহ উঁকি দিলো। ছোকরা কি তবে গাড়িটা রিমোট কন্ট্রোলে চালাচ্ছে? য়্যাঁ? হায় সর্বনাশ! দেখা যাবে ছেলেটা রাস্তার ওপাশে কোন একটা স্কুটারে বসে রিমোট কন্ট্রোল টিপে চালিয়ে নিচ্ছে গাড়িটা? য়্যাঁ?

ফুপা নিজের মনে বিড়বিড় করে বলেন, 'কিন্তু --- কিন্তু এমন একটা কাজ সে কেন করবে?' বলতে বলতেই তিনি উত্তরটা পেয়ে যান। তিনি সশব্দে ভাবতে থাকেন, 'আমি জানি সে কেন করবে --- সে আমাকে জ্বালানোর জন্যে, আমাকে খোঁচানোর জন্যে, এই জাপানি জিনিসটাকে অপমান করার জন্যেই অমন করবে! --- হ্যাঁ, রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে এমন একটা বদমায়েশি করা তার পক্ষে খুবই সম্ভব --- যে গাড়িতে বসে ক্রিকেট দেখে, আর জামে দাঁড়িয়ে বরফ মাখিয়ে মদ খায়, তার পক্ষে এমন একটা কাজ করা কি খুবই স্বাভাবিক না? --- অবশ্যই! কিন্তু না --- আজকে আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো! আমি ওর গাড়ি আটক করে সোজা লকআপে পাঠাবো! ওর এই ফালতু গাড়িটাকে আমি আজকে জেলের রুটি খাইয়ে ছাড়বো! --- আর তারপর, ডীলার ব্যাটাকে গিয়ে কষে দু'টা থাàড় কষাবো! আজকাল টিভি রেডিও সিডি প্লেয়ার সব পিচ্চি পিচ্চি জিনিসের সাথে রিমোট কন্ট্রোল বিনা পয়সায় দেয়, আর ব্যাটা চশমখোর আমার অ্যাত্তোবড়ো গাড়িটার সাথে কোন রিমোট কন্ট্রোল দেয় নি! --- আর আজকে আমি রিমোটের জন্যে কোন পয়সাও দেবো না! এটা আমার ন্যায্যভাবে প্রাপ্য জিনিস --- আমার হক্কের মাল!'

বলতে বলতে, মানে ভাবতে ভাবতে ফুপা নামলেন। ফুপা খুব করিৎকর্মা লোক, তোমার আমার মতো আলসে নন, যেই ভাবা সেই কাজ, তিনি গাড়ি থেকে নেমে গটগট করে গাড়িটার পাশে দাঁড়ালেন। গাড়িটার সব কাঁচ তোলা, আর সব কাঁচই ঝাপসা কালো রঙের --- বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখার উপায় নেই।

ফুপা হাত বাড়িয়ে ঠকঠক করে জানালায় নক করেন, 'অ্যাই --- বেরোও বলছি।' আগে নিশ্চিত হয়ে নেয়া ভালো, ছোকরা ভেতরে আছে কি নেই।

তবুও কোন সাড়া নেই।

এবার ফুপা তীক্ষ্ম চোখে আশপাশ পর্যবেক্ষণ করেন। এমনও তো হতে পারে ছোকরা দূরে বসে তাঁর কান্ডকারখানা দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ছে? উঁহু বাওয়া, আজকে তুমি কঠিন পাল্লায় পড়েছো! আজ তোমার মজা আমি একেবারে মজিয়ে ছাড়বো। তিনি খুব কষে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেন। উঁহু, কেউ দেখছে না এদিকে। কোন স্কুটার বা রিকশা থেকে কেউ উঁকি দিয়ে নেই। ছোকরা বোধহয় ভেতরেই। কিন্তু ভেতরে হলে সব কাঁচ তুলে ব্যাটা করছে কি?

এটার যে উত্তর ফুপার মাথায় এলো, সেটা আমাদের এ গল্পের পাঠকশ্রেণীর সিলেবাসের বাইরে। কাজেই আমরা ওটা নিয়ে মাথা ঘামাবো না। কিন্তু ফুপার সিলেবাসের মধ্যে সেটা পড়ে --- তিনি খুবই লজ্জিত এবং ক্রুদ্ধ হলেন। দিনে দুপুরে খোলা রাস্তায় গাড়ির কাঁচ তুলে --- ছি ছি ছি, সমাজ যাচ্ছে কোথায়? এতো অধঃপতন? সিনেমা তৈরী করার সময় যখন তিনি ঘুরেফিরে বিভিন্ন হলে বাংলা সিনেমার কোয়ালিটি যাচাই করছিলেন, তখনও তো এতোবড় অশ্লীল ঘটনা দেখেন নি। রোসো, আজ বাছাধনকে তিনি মজা দেখিয়ে ছাড়বেন।

ফুপা এবার দমাদম কিল বসিয়ে দিলেন গাড়ির কাঁচে। 'অ্যাই ছেলে, অ্যাই! বেরোও বলছি! এক্ষুণি --- এই মুহুর্তে বেরিয়ে এসো, ফাজিল কাহিকা!'

এবার গাড়ির ভেতর থেকে সাড়া এলো। গাড়ির কাঁচ অল্প একটু নামলো, দেখা গেলো এক জোড়া চোখ। আর ভেসে এলো ছেলেটার সন্দিগ্ধ কণ্ঠ, 'কী ব্যাপার --- আরে আঙ্কেল, আপনি যে? এতো হৈচৈ কেনো?'

রাগে ফুপা দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর বড়দের সিলেবাসের ধারণাটি ভুলও হতে পারে, এই ব্যাপারটিকে মাথায় রেখে কোনমতে বললেন, 'নামো তুমি। এখুনি নামো। নেমে দ্যাখো। --- যদি বরফ লাগে, নিতে পারো। চাইলে তোমাকে এক বালতি বলফ দিতে পারি ---। সাথে যদি চাও, টাটকা আনারসের জ্যুস আর টোস্টের সাথে গরমাগরম মুরগির রানভাজাও দিতে পারি ---।'

ফুপার কথা শেষ হওয়ার আগেই ছেলেটা গাড়ির দরজা খুলে নামলো। আজ তার চোখে চশমা নেই, এবং কতবড় বেলেল্লা, গায়ে একটা টাওয়েল পেঁচিয়ে পড়া। মাথার চুলগুলো ভেজা, খানিকটা শ্যাম্পুও লেগে আছে মাথার একপাশে। ফুপা মনে মনে খিকখিক করে হাসলেন বেচারার হালত দেখে। নিশ্চয় আজ তাড়াহুড়ো করে বাথরুম থেকেই ছুটতে হয়েছে বাছাধনকে, মাঞ্জা মারার সময় পায়নি।

ছেলেটা খানিকটা বিস্মিত গলায় বললো, 'বরফ? আনারস? জু্যুস? টোস্ট? মুরগি?'

ফুপা মনে মনে অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন। হ্যাঁ বাবা, হ্যাঁ! বরফ, আনারস, জ্যুস, টোস্ট, মুরগি! লেগেছে না টাশকি? লাগতে হবেই! দুইফুটি একটা গাড়ি নিয়ে আমার লিমুজিনের পেছনে লাগতে এসেছো! ফুপা তার সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বললেন, 'দ্যাখো --- দ্যাখো তাকিয়ে। এখন আমার লিমুজিনে সঅঅঅবকিছু আছে।' এক ঝটকা দিয়ে নিজের গাড়ির পেছনের দরজা খোলেন তিনি। '--- ফ্রিজ টিভি অ্যান্টেনা ওভেন ব্লেন্ডার ইস্ত্রি টোস্টার কফি মেশিন --- কী লাগবে তোমার, য়্যাঁ? বলো?'

ছেলেটা সন্তর্পণে ভেতরে তাকিয়ে দেখে। এতসব জিনিস ফিট করার পর গাড়ির ভেতরে জায়গা খুব অল্পই আছে, সেখানে কোনোমতে দু'জন মানুষ মুখোমুখি বসতে পারে। ভেতরটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো সে। ফুপা তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে গাড়ির ভেতরে কি একটা সুইচ টিপে দিলেন, ফট ফট করে দু'টো ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠলো ভেতরে। 'দ্যাখো!' ফুপা বীরবিক্রমে বললেন তাকে।

ছেলেটা সবকিছু দেখে শুনে ভারি বিরক্ত মুখে ফুপার দিকে তাকায়। 'তো?' ভারি চটেমটে বলে সে।

ফুপা প্রথমটায় ঘাবড়ে যান, তারপর রাগে তোতলাতে থাকেন। 'তো-তো? তো? তো মানে? কী তো? কিসের তো? তো আবার কী? তো বোঝো না তুমি? চোখ মেলে ভালো করে তো দেখে নাও, পাজি ছোকরা!'

ছেলেটা এবার টাওয়েলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, 'আপনার এই ঢাউস গাড়িতে এসব হাবিজাবি ফিট করেছেন, এই তো ব্যাপার?'

ফুপা আরেক দফা তোতলান, 'ঢা-ঢা-ঢাউস? হা-হা-হা-হাবিজাবি?' হাঁ হাঁ করে ওঠেন তিনি। 'এগুলো হাবিজাবি?' রাগে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে। তাঁর এতো এতো পয়সা খরচ করে ফিট করা জিনিস ছোকরা এক কথায় তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিতে চায়? বললেই হলো?

ছেলেটা এবার মাটিতে খালি পা ঠোকে। 'আলবাত হাবিজাবি।' ক্ষেপে ওঠে সে। 'এসব হাবিজাবি দেখানোর জন্যে আপনি আমাকে গোসল থেকে টেনে বের করলেন?'

গোসল?

কিসের গোসল?

এবং, সবচেয়ে বড় কথা, কোথায় গোসল?

? ? ?

ফুপার মাথায় হঠাৎ কী যেন একটা সম্ভাবনা চক্কর দিতে থাকে, সাথে সাথে তাঁর মাথাটাও চক্কর দিয়ে ওঠে। তিনি তাঁর গাড়ির একপাশ খামচে ধরে টাল সামলানোর চেষ্টা করেন। বলে কী, য়্যাঁ? বলে কী ছোকরা? গোসল আবার কিসের?

ছেলেটা থামে না, বকেই যায়, 'কোথায় এই ভ্যাপসা গরমের দিনে একটু শান্তিমতো শাওয়ার নেবো ভেবেছিলাম, তা না, আপনি কথা নেই বার্তা নেই গাড়িতে কিলঘুঁষি মারা শুরু করলেন, অর্ধেক গোসল থেকে নামিয়ে আনলেন আমাকে, তা-ও আবার এইসব হাবিজাবি দেখানোর জন্যে? এটা কি লিমুজিন, নাকি মোবাইল রেস্টুরেন্ট?'

গোসল?

'কী পেয়েছেনটা কী আপনি?' ছেলেটা আরো ক্ষেপে যায়।

ফুপা নিশ্চুপ। গোসল? গাড়িতে গোসল?

এবার ছেলেটা থামে, তারপর ঝট করে ঘুরে দাঁড়ায়। সে গাড়িতে ঢোকার আগ মূহুর্তে ফুপা দেখতে পান ড্রাইভিঙ সিটের জায়গায় একটা ছোট্ট বাথটাব, আর গাড়ির ছাদে লাগানো একটা ছোট্ট শাওয়ার।

সিগন্যাল পাল্টায়। ছেলেটার ছোট্ট টু সীটার সাঁ সাঁ করে তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ফুপা গোমড়া মুখে নিজের লিমুজিনে ওঠেন। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে, 'স্যার --- ডীলার কোম্পানির কাছে যাবো?'

ফুপা খ্যাক করে ওঠেন, 'না! --- বাড়ি চলো, আমি গোসল করবো!'




৭.

ফুপার লিমুজিনটা আপাতত গ্যারেজে পড়ে আছে, তিনি আবার ফোক্সভাগেনটাতে চড়া শুরু করেছেন। সেটাতে ফ্রিজ টিভি অ্যান্টেনা ওভেন ব্লেন্ডার ইস্ত্রি টোস্টার কফি মেশিন --- কিছুই নেই। তবে যতদূর মনে হয়, ওটাতে চড়ে স্বস্তি আছে।

পাড়ায় আবার আগের পরিবেশ ফিরে এসেছে। বাচ্চা কাচ্চারা অনেকদিন গাড়ি জুজুকে চোখে দেখে না, কানেও শোনে না, কাজেই আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড, এই প্রাকৃতিক নিয়মে তারা আবার দস্যিপনা অবলম্বন করেছে। লিমুজিনের জুজু সার্ভিস বন্ধ বলে বাচ্চাওয়ালা পড়শিরা ভারি মনক্ষুণœ হয়েছেন। তাঁদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেছে, 'বাঙালি হেগেও কারো উপকার করতে চায় না --- কী ক্ষতি হতো গাড়িটায় চড়ে মাঝে মাঝে একটু রাউন্ডে বেরোলে?'

তবে লিমুজিনটা ফুপা বিক্রি করে দেবেন বলে স্থির করেছেন। এটার ক্রেতা জোটানোটা একটু মুশকিল হবে বলে জানিয়েছেন ডীলার সাহেব --- কারণ এতো গ্যাজেট ফিট করা ভেতরে যে বাজেটে কুলোবে না । তাই ফুপা নিজের উদ্যোগে একটু খোঁজখবর করেছেন। শেষ শুনেছিলাম 'কম দামে বেশি খাবো' মোবাইল রেস্টুরেন্ট-এর মালিক ভদ্রলোক এ ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলেন।

ফুপা এখন আর রেসিডেন্সিয়াল মডেলের চৌরাস্তায় গাড়ি চালান না। তিনি ইকবাল রোড হয়ে শর্টকাট করেন। ঐ জায়গাটা নাকি ভারি অপয়া। কে জানে, হতেও পারে।


(১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০০২)

3 comments:

  1. বরাবরের মতো অসাধারন হয়েছে।

    - এস এম মাহবুব মুর্শেদ

    ReplyDelete
  2. ধন্যবাদ ধন্যবাদ। আমি ঠিক করেছি ভালো কিছু লেখা এখন থেকে শুধু এখানেই তুলবো।

    ReplyDelete
  3. মজাক পাইলাম।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।