Monday, September 04, 2006

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা



শিরোনাম দেখে পাঠকসমাজের (পাঠিকারাও আছেন এই দলে) মনে হতে পারে, হিমালয় বা আনদেজ চষে বেড়িয়ে এসে কলম হাতে নিয়েছি। আদপে ব্যাপারটা সেরকম নয়, ঘর থেকে শুধু দুই পা ফেলে, বান্দরবানের রুমা থেকে রাঙামাটির পুকুরপাড়া পর্যন্ত বিসতৃত গরীবের এই অভিযান।

ভেবেছিলাম উত্তম পুরুষে লিখবো না, তেমনটা লেখা এই নরাধমকে মানায়ও না। কিন্তু এবারের যাত্রায় অনেকেই পৃথক ফল হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কাজেই সেসব ফলের একটা সালাদ পাঠকের সামনে হাজির না করে বরং পেছন ফিরে আমার চোখেই গোটা অভিযানটাকে আগাপাশতলা একবার চেখে দেখি। স্মৃতির সাগর মন্থন করতে থাকলে এক সময় অমৃত কিছু মিলবেই, আর গরল যা উঠে আসবে, তা নিজের গলায় রেখে নীলকন্ঠ সাজতে আমার কিচ্ছু আপত্তি নেই।



এক: নির্গলদ বিসমিল্লাহ

কেওকারাডঙ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ (মাত্র ৩,১৭২ ফিট উঁচু), আর সেখানেই নানা রূদ্ধশ্বাস কাহিনীর বুনটে সূর্যোৎসবের অভিযান দিয়েই EXPLORERS' CLUB OF BANGLADESH-এর যাত্রা শুরু। বলা যেতে পারে, বান্দরবানের গহীন পাহাড়ি এলাকাই এই ক্লাবের আঁতুড়ঘর। ক্লাবের অভিযাত্রীদের অনেকেই পরে আবারো ফিরে গেছেন কেওকারাডঙে, বিভিন্ন দলে, বিভিন্ন ঋতুতে, বিভিন্ন পথে। জীবনানন্দ দাশের ক্যাম্পে কবিতার বিখ্যাত-বিতর্কিত একটি পঙক্তি পড়েছিলাম:
মানুষ যেমন করে ঘ্রাণ পেয়ে আসে তার নোনা মেয়েমানুষের কাছে
--- যদি বলি এঙ্প্লোরার ক্লাবের সদস্যদের কাছে নোনা মেয়েমানুষটি হচ্ছে বান্দরবানের পাহাড়গুচ্ছ, খুব একটা অতিশয়োক্তি হবে না। এই পাহাড়ের সারিগুলোর সৌন্দর্যের সাথে লুকিয়ে আছে এক আকর্ষক শক্তি, যা একজন ট্রেকারকে একাধিক অভিযানের জন্যে হাতছানি দেয়। এই ফেব্রুয়ারিতে সেই হাতছানিকে উপেক্ষা করার শক্তি ECB সদস্যদের একদমই ফুরিয়ে এসেছিলো।

পাহাড় কতখানিই বা আছে এই বাংলাদেশে? উত্তরে গারো পাহাড়ের কয়েকটি শিরা, উত্তর পূবে খাসিয়া আর জয়ন্তিয়া পাহাড়ের খাটো দেয়াল, আর নিচে দক্ষিণ পূবে মগের মুল্লুকে আরাকানের কিছু দলছুট পাহাড়। বাংলাদেশের ভেতরে এক হাজার মিটারের ওপরে কেউ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু এই স্বল্প উচ্চতার --- স্বল্প বলছি এ কারণে, একবার উত্তর পশ্চিমে চোখ মেলে তাকালেই নগরাজ হিমালয়কে চোখে পড়ে --- মাঝেই পাহাড়গুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রস্তরনন্দিনী সব ঝর্ণা, পাথুরে ছড়ার খাত, ঘন নিবিড় জঙ্গল, হঠাৎ গভীর খাদ, বাঁশের ঝোপে ছাওয়া উপত্যকা আর জুম্ম চাষের ঢালু ক্ষেত। এর ফাঁকে ফাঁকেই হয়তো চোখে পড়ে আচমকা জেগে ওঠা দ্বীপের মতো একেকটা পাড়া, অর্থাৎ পাহাড়ীদের গ্রাম। তেমনই একটা গ্রাম, পুকুরপাড়া অভিযাত্রীদের এবারের যাত্রার গন্তব্য। পুকুরপাড়া রাঙামাটি জেলায় পড়লেও, সেখানে যেতে হলে বান্দরবানের রুমা থেকে যাওয়াটাই সঙ্গত। ম্যাপে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেই বুঝবেন, কেন এ কথা বলছি। রাঙামাটির দক্ষিণ তৃতীয়াংশে অবস্থিত এই পাড়া একটা বিশাল পাহাড়ী দীঘিকে ঘিরে, বহুল আলোচিত বগালেকের চেয়ে আয়তনে কয়েকগুণ বড় এই দীঘির কাছেই রয়েছে রাইনক্ষ্যং নদীর একটি প্রপাত, এঁকেবেঁকে যে নদীটি যাত্রায় ক্ষান্তি দিয়েছে কাপ্তাই হ্রদের বুকে মুখ গুঁজে। আর এই রাইনক্ষ্যং-জলপ্রপাতই হয়ে উঠেছে ECB সদস্যদের পিপাসু চোখের লক্ষ্যবস্তু।

ECB সম্পর্কে যারা একটু আধটু জানেন, তাঁরা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন, এই ক্লাবের সদস্যেরা, যাদের বয়স আট থেকে আটাশির মধ্যে, যাবতীয় সরকারি ছুটির চরম সদব্যবহার --- অথবা বদব্যবহার --- করে থাকেন, বিশেষ করে দুই ঈদের প্রশস্ত ছুটিগুলো তাঁরা কাটিয়ে দেন কোন এক পথে কাঁধে হ্যাভারস্যাক ঝুলিয়ে কোন সুদূর গন্তব্যের দিকে জোর পায়ে হাঁটায়। তাই ফেব্রুয়ারির দুই তারিখে, কোরবানি ঈদের লঘু ছুটিতেই যাত্রা শুরু করার গুরু সিদ্ধান্ত নেয়া হলো (কোরবানি ঈদের ছুটি যেমন খানিকটা প্রশস্ত, তেমনই আরেকটা সুবিধে হচ্ছে, এ সময়ে আকাশে শুক্লপক্ষের কড়া চাঁদ থাকে, রাতে পথ চলতে সুবিধে হয়)। বিকেলের মধ্যে কোরবানির দায়দায়িত্ব সেরে, নিহত পশুর ঝোল দিয়ে মেখে ভরপেট সেদ্ধ ধানের-দানা দিয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে, ধীরেসুস্থে একেকজন হাজির হবেন কমলাপুরে বাস স্টেশনে, তেমনই অলিখিত চুক্তি হলো সবার মধ্যে।

এবারের দল তুলনামূলকভাবে ছোট, কারণ কোরবানি ঈদে যাঁরা ঢাকার বাইরে বেরিয়ে পড়বেন, অথবা ঢাকায় ঈদোত্তর মেহমানদারিতে লিপ্ত হয়ে পড়বেন, তাঁরা গা মুচড়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। ব্যতিক্রম শামীম খান মিলন, ক্লাবের দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতিশীল সদস্য, যিনি আগে কখনো বান্দরবান যাননি। সুদূর সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তিনি প্রথমে পৌঁছুবেন সাতক্ষীরা, সেখান থেকে ঢাকার বাসে চড়ে পৌঁছুবেন ঢাকায়, তারপর আবার বাসে চড়ে বসবেন, বান্দরবানের পাহাড়গুলোকে এক হাত দেখে নেয়ার জন্যে, কম হ্যাপা নয়। আর আছে চঞ্চল, যে তার নামের যথার্থ সম্মান করতে শিখেছে, এই প্রথম পাহাড়ে চড়তে বেরিয়ে উৎসাহের চোটে একদিন আগেই কঙ্বাজার গিয়ে বসে আছে ব্যাটা, তিন তারিখ সকালে মূল দলের সাথে যোগ দেবে সে। এবার দলনেতা উচ্ছল, ইনিও নামের সাথে ঘাড়ত্যাড়ামো করেননি। ক্লাবের পথপ্রদর্শক বরুণ বকশী আর শাহেদ কামাল তো সাথে আছেনই, আর পাহাড়ের পথ প্রদর্শক মংক্ষিয়া মারমা আমাদের সাথে যোগ দেবেন বান্দরবান থেকে। ঘাগু দুই হাঁটাবাজ সালেহীন আর সৈকত মোটেও পিছপা নয়, যেমনটা নন পুতুল আপা, যেমনটা নই --- ইয়ে, আমি।

দশ চক্রে ভগবান ভূত হয়, আর পুকুরপাড়া তো কোন ছার। দশে মিলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ, এমনই চিন্তা পুষে রাখা বুকটাকে ঠুকে নিয়ে ঈদের আগের দিন ব্যাগ গুছিয়ে ফেলি। আমার হাবাগোবা গোছের হ্যাভারস্যাক আগেও অনেক ধকল সয়েছে --- সাঙ্গু নদীতে গতবছর তার আরেকটু হলেই সলিল সমাধি ঘটতো, ওয়াহিদ ভাই সময় মতো কান ধরে টেনে না তুললে --- তাই এবার বেচারাকে একটু নিষকৃতি দেয়ার বাসনায় কেবল একটি প্যান্ট, একটি গেঞ্জি আর কী একটি যেন ঢোকাই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাতে ঢোকে একখানা ট্রাইপড, একটা ক্যামেরা, একটা বাইনোকুলার, গামছা, টয়লেট পেপার, শুকনো খাবার, ইত্যাদি ইত্যাদি। কোরবানির মাংস ওজন করার যন্ত্রটায় চাপিয়ে দেখা গেলো, বারো কেজির চেয়ে একটু বেশি ওজন হয়েছে ব্যাগটার। এর আগে কেওকারাডং যাত্রায় আমার বোঁচকার ওজন হয়েছিলো সতেরো কেজি, এবার তারচেয়ে ঝাড়া পাঁচ কেজি কম।

ঈদসংক্রান্ত সামাজিকতা সেরে রাত সাড়ে দশটার মধ্যে কমলাপুরে পৌঁছে সেখানে প্রায় সবাইকে পেয়ে গেলাম। আরো কয়েকটা ছোট ছোট গ্রুপ চলেছে বান্দরবানে, তাঁরাও রুকস্যাক কাঁধে নিয়ে বাস স্টেশনে উপস্থিত। আমাদের তোড়জোড় দেখে এক সহযাত্রী জানতে চাইলেন, আমরা কেওকারাডঙে যাচ্ছি কি না। পুকুরপাড়ার নাম শুনে ভদ্রলোক নাক সিঁটকালেন, অর্থাৎ, তিনি পুকুরপাড়ার নাম ইহজীবনে শোনেননি, এটা আবার কোথায় ---? তাঁরা সবাই চলছেন কেওকারাডঙে, গম্ভীরমুখে জানালেন।
বাস জার্নির বর্ণণা কী আর দেবো? প্রায় ফাঁকা রাস্তায় উল্কা বেগে ছুটছে বাস, হেডলাইটের আলোয় অন্ধকারের একটা সামান্য অংশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে ক্ষণিকের জন্য, তারপর আবার ডুবে যাচ্ছে আঁধারে। ঈদক্লান্ত ঢাকা শহরকে পেছনে ফেলে বান্দরবান পৌঁছতে আমাদের চারপাশে ভোর ঘনিয়ে আসে।

কিন্তু বান্দরবানে পৌঁছে সংকটের চেহারাটা চোখে পড়ে সবার। চঞ্চল বান্দরবানেই রাত কাটিয়ে ভোরে মূল দলের সাথে যোগাযোগ করবে, এমনই কথা ছিলো। কিন্তু বাস স্টেশনের আশেপাশে তার চেহারাখানা দেখা যাচ্ছে না। খানিকক্ষণ অপেক্ষার ফাঁকে হাতমুখ ধুয়ে ফেললেন সকলে, আর পুতুল আপা র্যাকস্যাকটাকে ঠিকমতো বাঁধাছাদা করতে বসলেন। তখন দেখলাম, একগাদা আচারের বোতল নিয়ে এসেছেন তিনি। সবার সাথেই কিছু না কিছু নগণ্য শুকনো খাবার আছে, যেমন আমার ব্যাগের ভেতরে পাঁউরুটি, বরুণদার কাছে চিঁড়া, সে জায়গায় পুতুল আপা জগদ্দল কাঁচের বয়ামে করে আচার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? হুড়োহুড়ি করে সেই বোঝা ভাগাভাগি করে নিলাম কয়েকজন।
বরুণদা আর শাহেদ ভাই মংক্ষিয়া দাদার খোঁজে বেরিয়ে গেলেন। খানিক বাদে তাঁরা ফিরলেন একেবারে চাঁদের গাড়ি চড়ে, এ গাড়িই রিজার্ভ করে ক্ষক্ষ্যংঝিরি পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। সেখানে নৌকোতে চড়ে রুমা পর্যন্ত বাকি পথ পাড়ি দিতে হবে, আর রুমা থেকেই শুরু হবে আমাদের পর্বতযাত্রা। আরেকটা দুঃসংবাদ জানা গেলো, গতকাল একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী রিগ্রিক্ষ্যং হিল রিসোর্টের ম্যানেজারকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ চেয়েছে তারা।

চাঁদের গাড়ি থামিয়ে নাস্তার জন্যে বাজারের একটা খাবার দোকানে ঢুকলাম সবাই। ভোরবেলা বাসস্টলে এসে রিপোর্ট করার কথা চঞ্চলের, সে কোথায় কোন হোটেলে আছে কিছুই আমাদের জানা নেই, তাই উল্টে তাকে খোঁজার ব্যাপারটাও যথেষ্ঠ জটিল হয়ে পড়েছে। খাবারের ফরমায়েশ দিয়ে চিন্তিত মুখে ভাবছি, এখন কী করা যায়, কিন্তু আমাদের খাওয়ার ফাঁকেই হঠাৎ চঞ্চলের আবিভর্াব ঘটলো, সবাই স্বস্তিতে হাঁপ ছাড়লাম। যাক, ব্যাটাকে আর খুঁজে বার করতে হয়নি, সে-ই আমাদের খুঁজে বার করেছে, শুধু তা-ই না, এভাবে আমরা হারিয়ে যাওয়ায় তার মৃদু তিরস্কারও আমাদের সহ্য করতে হলো। কী আর করা, কোনমতে মুখে কিছু গুঁজে দিয়ে আমরা হুড়োহুড়ি করে চাঁদের গাড়িতে উঠে বসলাম। তারপর ভোঁওওও ---!

জনৈক অভিযাত্রী রুমা পর্যন্ত যাওয়ার জন্যে উৎসুক ছিলেন, তিনি সুট করে ভিড়ে পড়লেন আমাদের গাড়িতে। কোন পরিকল্পনা করে আসেননি তিনি, ছুটিতে ঘুরতে এসেছেন, সবিনয়ে আমাদের সাথে বেড়ানোর অনুমতি চাইলেন। যখন তাঁকে আমাদের বেড়ানোর ধরনটা বোঝানো হলো, অর্থাৎ আমরা পাহাড়ি পথে প্রায় দেড়শো কিলোমিটার হাঁটবো, পাহাড়ীদের গ্রামে রাত কাটাবো, ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত হাঁটবো, দিনে মোটে দুবেলা খাবো, ঝোপেঝাড়ে টয়লেট সারবো, সর্বোপরি যে পথ দিয়ে এগোবো সেটা যথেষ্ঠ দুর্গম ও বিপজ্জনক, আমাদের দলে যোগ দেবার উৎসাহ তাঁর পুরোটাই উবে গেলো। পাছে আমরা তাঁকে জোরজার করে ধরে নিয়ে যাই, সেই ভয়ে তিনি তদ্দন্ডেই গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন।

গাড়ির ভেতরে আলাপ জমে উঠলো। চঞ্চলের সাথে আমার খুবই শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক, তাই একে অপরকে গলা কেটে খুন করার পরিবর্তে কথার ছুরি চালিয়ে মাথা কাটার চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কলম এখন আমার হাতে বলে বলছি না, সত্যি কথা হচ্ছে --- চঞ্চল কাজে যেমন, কথায় তেমন চঞ্চল নয়। আর হাঁটার সময় সবার পেছনে পড়ে থাকলেও, হেঁ হেঁ হেঁ, মুখটা আমার ভালোই চলে।

কিন্তু এক চঞ্চলকে পঁচিয়ে কাঁহাতক আর ভালো লাগে? কাজেই আস্তে আস্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে আলোচনা ঘুরে গেলো। ক্লাবের দু'বছরের সব অভিযানের ওপর আর্টিকেল আর সাথে মনকাড়া সব ছবির সংগ্রহকে একটা বইয়ের রূপ দেয়ার ইচ্ছে অনেকেরই। সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ চললো, তবে এই আলাপ কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছে শেষ হবার আগেই ক্ষক্ষ্যংঝিরি ঘাটে পৌঁছলাম আমরা।

ঘাটে উপস্থিত পুলিশ সদস্য এবং অন্যান্যরা জানালেন, নৌকো দিয়ে সাঙ্গু নদী ধরে রুমা পৌঁছোনো খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, কারণ কে বা কাহারা যেন কিছুদিন আগে কয়েকজন পর্যটককে নৌকো থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। কাজেই ভালো হবে, যদি আমরা গাড়িতে চড়েই আরো খানিকটা এগিয়ে নদী পেরিয়ে ডাঙার ওপর দিয়ে রুমাবাজারে পৌঁছোনোর চেষ্টা করি। এতক্ষণ চাঁদের গাড়িতে বসে থেকে হাতে পায়ে খিল ধরিয়ে, পেট্রলের মনমাতানো সৌরভে অস্থির হয়ে, সর্পিল পথের কিনারা ধরে এগোতে এগোতে নিচে ঢালু খাদের রূপ দেখে দেখে একেবারে হেদিয়ে পড়েছিলাম, নদীর বাতাসে একটু চাঙা হয়ে হেঁড়ে গলায় একটা গান ধরার উদ্যোগও আঁটছিলাম, কিন্তু আবার সেই চন্দ্রযানে চড়তে হবে শুনে আঁতকে উঠলাম। কিন্তু কীই বা আর করার আছে?

চাঁদের গাড়ি আবার হেলেদুলে আরো ওপরে চড়তে শুরু করলো। এবারের পথের অবস্থাও যাচ্ছেতাই। তবে দূরে পাহাড়ের ঢালে ক্ষুদে ক্ষুদে সব কুটির, আনারসের বাগান, আরো দূরে পাহাড়ের ওপর গাছপালার সারি দেখতে দেখতে সময়টা অতটা খারাপ কাটলো না। মোটামুটি চানাচুরভর্তা হয়ে সেই পথ পার হয়ে সাঙ্গু নদীর ঢালে একসময় হাজির হলাম সবাই। উঁকিঝুঁকি মেরে ঠিক বোঝা গেলো না, এরপর ঘটনাটা কী ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ড্রাইভার লোকটা চিন্তা ভাবনা করার সুযোগ দিলো না আমাকে, মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ঢালু একটা চরম বিশ্রী পথে সে সাঁ করে গাড়িটা গড়িয়ে দিলো মার্বেলের মতো। মিনিটখানেক পর দেখলাম, গাড়িটাও উল্টায়নি, আমরাও অক্ষত আছি, কেবল নেমে এসেছি সাঙ্গুর পাশে, তিরতির করে কয়েক গজ দূরে বয়ে চলছে এই ছেমরি নদী।

এরপর ড্রাইভার আর হেলপারের কথোপকথন শুনে বোঝা গেলো, নদী পেরিয়ে একটা ঢাল ধরে উঠে গিয়ে কাঁচা পথ ধরে রুমা বাজারে পৌঁছুনোর চেষ্টা চালানো হবে। সাঙ্গুর গভীরতা এখানে কম, কাজেই সমস্যা হবে না। এ পর্যায়ে শাহেদ ভাই গম্ভীর মুখে নেমে গিয়ে বললেন, এটা নাকি মিশন ইম্পসিবল থ্রি ছাড়া আর কিছুই নয়। নদীর অন্য পারের ঢালটা আরো বেশি খাড়া। অবশ্য বাকি সবাই গাড়ির ভেতরে মহানন্দে গ্যাঁট হয়ে বসে রইলাম --- গাড়ি এবার চলতে শুরু করলো নদীর বুকে, তির্যকভাবে নদী পার হয়ে যাবো আমরা। দু'ধারেই একটু দূরে উঁচু খাড়া পাহাড়, গাঢ় সবুজে ঢাকা, সামনে পেছনে দু'দিকেই বাঁক ঘুরে চোখের আড়াল হয়ে গেছে সাঙ্গু।

গাড়ি যখন অপর প্রান্তের ঢালটার মুখোমুখি পৌঁছলো, তখন বোঝা গেলো, শাহেদ ভাই খুব একটা অতিরঞ্জন করেননি। খুবই খাড়া একটা ঢাল, তাও আবার এখানে সেখানে গর্ত, এবং ঝুরঝুরে বালুভর্তি। এই ঢাল বেয়ে উঠতে গেলে গাড়িটা উল্টে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। আমাদের ড্রাইভার অবশ্য প্রবল আত্মবিশ্বাসী, সে জানালো, এর চেয়েও খাড়া ঢাল বেয়ে সে গাড়ি চালিয়ে উঠেছে, এগুলো তার কাছে ডালভাত। কিন্তু তার ডালভাত আমাদের সবার রুচলো না, হ্যাভারস্যাক গাড়ির ভেতরে রেখে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম, কেবল বরুণদা অটল বসে রইলেন, মনে হচ্ছে ডালভাতের ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ খুব একটা কম নয়।

ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে এই দৃশ্য পাকড়ানোর জন্যে তৈরি হয়ে রইলাম আমি আর সালেহীন। প্রথমবার প্রবল গর্জন করে এগিয়ে গেলো চাঁদের গাড়ি, ঢালের কিছুদূর উঠেই আবার হড়হড় করে গড়িয়ে ফিরে এলো পানিতে। আমাদের কয়েকজন এই ফাঁকে ঢাল বেয়ে ওপাশে উঠে গেছে, দাঁড়িয়ে দেখছে, কী হয় শেষ পর্যন্ত। কিন্তু হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয় ড্রাইভার, আবারও গড়গড়িয়ে রওনা দিলো সে। কিন্তু ফলাফল আগের মতোই। তবে এবার বরুণদা নেমে এলেন গাড়ি থেকে।

তৃতীয় দফায় ব্যর্থতার পর মনে হলো, আসলেই মিশন ইম্পসিবল, একে এখানেই মুলতবি রেখে পায়ে হেঁটে বাকিটুকু পথ, অর্থাৎ রুমাবাজার পর্যন্ত পাড়ি দিতে হবে। কাজেই যে যার মতো ব্যাগ গুছিয়ে বেঁধে, জুতোর ফিতে ঠিক করে নিয়ে, দুয়েকঢোঁক পানি খেয়ে --- শুরু হলো হাঁটা!

নদীর ঐ ধার থেকে হেঁটে রুমাবাজার পর্যন্ত পেঁৗছুতে আমাদের সময় লাগলো প্রায় ঘন্টাখানেক। মাঝে এক জায়গায় বসে জুতো খুলে ভেতরে ঢুকে পড়া বালির দানা পরিষ্কার করতে হয়েছে। এর মাঝে একের পর এক ছোট ছোট পাহাড় টপকানো ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। আশেপাশের বাড়িঘর থেকে কৌতূহলী স্থানীয় বাসিন্দারা মাঝে মাঝে এগিয়ে এসে জানতে চেয়েছেন, আমরা কোত্থেকে এসেছি। ঢাকা থেকে এসেছি জেনে সবাই ধরে নিয়েছেন যে আমরা কেওকারাডং যাবো, এই এক বছরে নাকি একের পর এক দল কেওকারাডঙের দিকে গিয়েছে।

বাজারে পৌঁছে সবাই সুড়সুড় করে ঢুকলাম একটা খাবার দোকানে। শাহেদ ভাইয়ের ব্যাগের ভেতরে কী একটা যেন ভেঙে গিয়েছে, সেটা নিয়ে তিনি ভারি বিব্রত, বাজারের একটা পাটাতনের ওপর ব্যাগ খুলে আবার সব গোছাচ্ছেন। তিনি এসে পড়ার পর খাবারদাবারের সুরত নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করলাম আমরা। ডিম কিংবা মুরগি খেতে হবে, মাছের অবস্থা তেমন সুবিধের নয়, আর পানি খাওয়ায় একটা রীতিমতো ঝক্কির ব্যাপার। তবে পুতুল আপার হ্যালোজেন ট্যাবলেটের ওপর ভরসা করে পুরোদমে পেটপূজায় বসে পড়লাম আমরা।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে জিরোচ্ছি, এমন সময় লারামের সাথে দেখা, আমাদের গতবারের কেওকারাডং যাত্রার গাইড, সে এসে জানালো, আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে যেতে হবে। কুছ পরোয়া নেহি, বরুণদা আর শাহেদ ভাই দলের সবার নামধাম আর ক্লাবের অফিসের ঠিকানা দিয়ে এসে সবাইকে উঠে পড়ার জন্যে ইঙ্গিত দিলেন। দারুণ একটা রসিকতাও সাথে আমদানি করে ফিরলেন তাঁরা, নাম-ঠিকানা লেখার সময় এক পর্যায়ে ক্যাম্পের সেনাসদস্য নাকি প্রশ্ন করেছেন, এই হিমু যার নাম, সে ছেলে না মেয়ে --- হা হা হো হো হি হি, আমি ছাড়া সবাই দাঁত বার করে কিছুক্ষণ হেসে নিলো, কী বিদঘুটে রসবোধ এঁদের! যাকগে, এককাপ চা শেষ করে সবাই এবার এগোলাম, বাজার থেকে চাল-ডাল ইত্যাদি কেনার জন্যে। কয়েকদিন হলো খিচুড়ি রান্না শেখার জন্যে ঘ্যানর ঘ্যানর করছিলাম আমার মায়ের কাছে, তিতিবিরক্ত হয়ে শেষে একদিন তিনি আমাকে একটা একঘন্টার সঠিকনিয়মেখিচুড়িরন্ধন কোর্স করিয়েছেন, সেই এক ঘন্টার বিদ্যার অহঙ্কারে আগেভাগেই সবাইকে জানিয়ে রেখেছিলাম, এবার সবাইকে এমন খিচুড়ি রেঁধে খাওয়াবো, যেমনটা কেউ আগে কখনো খায়নি। তাই চাল-ডাল কেনার ব্যাপারে আমার পরামর্শই নেয়া হলো। জুতোর দোকান থেকে একজোড়া করে অ্যাঙ্কলেট কিনে নিয়েছি কয়েকজন, এই দীর্ঘ পথ হাঁটায় কাজে দেবে।

কেনাকাটা শেষ করে আবার শুরু হলো হাঁটা, এবার হাঁটার শেষ হবে একেবারে বগামুখপাড়া, সাইকত পাহাড়ের গোড়ায় গিয়ে। মোটামুটি সমতল পথ শেষ হবে ঐ গ্রামে পৌঁছে। ইতিমধ্যে দুপুর গড়িয়ে গেছে, মাটিতে আস্তে আস্তে দীর্ঘ হচ্ছে আমাদের ছায়া।

রুমা থেকে দক্ষিণপূবে যেতে প্রথমেই পড়ে লাইরুনপিপাড়া, লাইরুনপি পাহাড়ের ঢালে শায়িত গ্রাম। লাইরুনপি পাহাড় বেয়ে তার ওপাশের সমতল মাটিতে সহজেই নেমে পড়া যায়, আর ফেরার পথে ঘটে তার উল্টোটা। ফেরার সময় সঙ্গত কারণেই ক্লান্ত থাকে সবাই, আর পাহাড়ের গোড়ায় এসে সেটাকে বিশাল খাড়া একটা দেয়ালের মতো মনে হয়, সেটা বেয়ে যত সহজে নামা গিয়েছিলো, তত সহজে ওঠা যায় না।

লাইরুনপিপাড়া ডিঙিয়ে ওপাশের মাটিতে নেমে ধীরেসুস্থে হাঁটা শুরু করলাম আমরা। এবার অভিযানে বেশির ভাগের পায়েই জাঙ্গলবুট, কারণ বরুণদা এর আগে একাকী যে অসমাপ্ত অভিযান চালিয়েছিলেন, তাতে নাকি এই বুট অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রেক স্যান্ডেলগুলো পরে হাঁটতে আরাম ঠিকই, কিন্তু সেটা স্বল্প দূরত্বের ক্ষেত্রে। আর এবড়োখেবড়ো পাথুরে পথে হাঁটতে গেলে স্যান্ডেল পরা কিছুটা বিপদজনক, পা মচকে যেতে পারে। তাছাড়া বরুণদা এ পথে আগে একবার হেঁটে গেছেন, কাজেই তাঁর উপদেশ ফেলবার নয়। তবে জাঙ্গলবুট কেনার পর অবশ্যই সেটার রোড টেস্ট করা জরুরি, কমসে কম দুহপ্তা সেটা পায়ে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে সেটার স্বাদ পা-কে ভালো করে চাখিয়ে না নিলে ভাগ্যে কঠিন ভোগান্তি আছে, এটা বলে দিচ্ছি। লাইরুনপিপাড়ার ঠিক নিচেই একটা ছোট ছড়া আছে, তাতে পা ভিজিয়ে ওপারে পৌঁছেই টের পেলাম, কপালে দুঃখ লেখা ছিলো। পানির সাথে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সব পাথরের কণা আর বালি ঢুকে গেছে মোজার নিচে, হাঁটতে গেলেই একেবারে মর্মে গিয়ে বিঁধছে।

যেকোন অভিযানেই পিছিয়ে পড়তে আমার জুড়ি নেই। আর এই পিছিয়ে পড়ার জন্যে নানারকম অজুহাতও আমার জিভের ডগায় সবসময় তৈরি থাকে। ব্যাকপ্যাকের ওজন অনেক বেশি, তাই পিছিয়ে পড়েছি --- কিংবা ছবি তোলার জন্যে থেমেছিলাম, তাই পিছিয়ে পড়েছি, ইত্যাদি হাবিজাবি। অন্যেরা অবশ্য এসব গাঁজাখুরি অজুহাত এক কানে নিয়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দেন, তারা জানেন আমি তিরিশ মিনিট পর পর থেমে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিই। কিন্তু, একটু থেমে, চারপাশের এই অপূর্ব সব খাটো খাটো পাহাড়ের সারিতে একটু চোখ বুলিয়ে না নিলে তো এখানে আসার আসল উদ্দেশ্যই মাঠে মারা পড়ছে। কেবল গটগটিয়ে হেঁটেই চলবো, একটু চোখ মেলে চেয়ে দেখবো না, তা কি হয়? কিন্তু এই প্রবল প্রকৃতিপ্রেমের মাশুলও আমাকেই দিতে হয়, একেবারে ঘন্টাখানেকের পথ পিছিয়ে পড়তে হয় অন্যদের চেয়ে। কারণ, আমাদের দলের অন্যদের প্রকৃতিপ্রেম আমার চেয়ে খুব একটা কম নয়, বরং খানিকটা বেশিই। তাই চলার ফাঁকেই তারা নিসর্গের প্রতি দৃষ্টিনৈবেদ্য দিয়ে অনেকখানি এগিয়ে যান। তাই কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো, এদিকে ওদিকে কয়েকটা ছবি তুলে যখন ক্যামেরাটা আবার ব্যাগে ভরেছি, তখন আমার আশেপাশে আর কেউ নেই। জোর পায়ে হেঁটে কিছুদূরে গিয়ে শাহেদ ভাই আর বরুণদাকে পাওয়া গেলো, তাঁদেরকে কিছুটা ধীরে হাঁটার অনুরোধ করে আমি খানিকটা এগিয়ে গেলাম। পেছনে কেউ না থাকলে কেমন যেন লাগে, ঠিক না? মংক্ষিয়া দাদা আবার এক ফাঁকে কিছু জঙলি বড়ই পেড়ে এনেছেন, হাঁটতে হাঁটতে সেগুলো কুটকুট করে চিবোনো গেলো।

রুমাবাজার থেকে বগামুখপাড়ার পথে যারা একবার শীতের মৌসুমে হেঁটে গেছেন, তারা জানেন, বড় বড় বোল্ডারের ফাঁকে ক্ষীণ পানির ধারা ছাড়া এই পথে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। শুধু ঐ বড় বড় পাথরের ওপর দিয়েই একটু সাবধানে চলতে হয়, কোনভাবে পা মচকে বসলে কপালে দুঃখ আছে। বর্ষা মৌসুমে এই গোটা পথ তলিয়ে যায় তীব্র পানির ঢলের নিচে। এক বছর আগে কেওকারাডঙে যাওয়ার পথে যে ছড়ায় হাঁটু পানি পার হয়ে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে ওপরের পাহাড়ি অঞ্চলে এক দিনের বৃষ্টির কারণে সে ছড়া পার হতে হয়েছে কোমর পানি ভেঙে।

বেশ খানিকটা পথ নিরূপদ্রব পার হওয়ার পর একটা ছড়ার পাশে দলের অগ্রগামী অংশটার সাথে সাক্ষাৎ হলো, মুখে একটু পানি ছিটিয়ে নেবার জন্যে বসেছেন তারা। সেখানে কাঁধের ব্যাগ খুলে উপদ্রুত কাঁধটাকে একটু রেহাই দিলাম, আর গোটা তিনেক দলগত চিত্রগ্রহণও চললো সাথে সাথে। কিন্তু খুব বেশিক্ষণ বসে থাকার জো নেই, আবারও চটজলদি পা চালিয়ে যেতে হলো আমাদের।

চলতে চলতে এবার শাহেদ ভাই আর পুতুল আপাকে সঙ্গে পাওয়া গেলো। খানিকটা পথ গিয়ে দেখা গেলো, দু'জন বাঙালি ফিরছেন এ পথ দিয়ে। তাদের পায়ে সাধারণ চপ্পল, সাধারণ শার্টলুঙ্গি। আলাপ করে জানা গেলো, রংপুর থেকে বগা লেকে এসেছিলেন তারা, উদ্দেশ্য নিখাদ ভ্রমণ। কোনরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই গুটগুট করে হেঁটে চলে গেছেন তারা বগালেকপাড়ায়। বাঙালির এই পর্যটনপিপাসু চেহারা আমাদের আশাবাদী করে তুললো, যাক, অতটা ঘরকুনো আমরা তবে নই! আমাদের আয়োজন, বিশেষ করে গাঁটরিবোঁচকা দেখে যে তারা অত্যন্ত চমৎকৃত হয়েছেন, বোঝা গেলো, সবিনয়ে আমাদের একটা ছবি তোলার অনুমতি চাইলেন একজন। তাদের ক্যামেরায় নিজেদের চেহারা অক্ষয় করে রেখে আবারও আমরা জোর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম সামনের দিকে।

বালিপাথরের একটা খাটো পাহাড় সারির সমান্তরালে এগিয়ে একটা মোটামুটি বড় ছড়া পেরিয়ে গেলেই বগামুখপাড়ার বিসতৃত পথটার দেখা মেলে। পথ নয়, আসলে ওটা ছড়ার পাথুরে খাত। প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ সেই ছড়া বরাবর এগিয়ে গেলেই বগামুখপাড়া চোখে পড়ে। ইতিমধ্যে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে, যার ফলে সমস্ত পথ ছায়াচ্ছন্ন। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু কয়েক জায়গায় জলের কলধ্বনি, আর আমাদের এগিয়ে চলার শব্দ। চলার গতির হেরফেরে এখন আমার সঙ্গে পুতুল আপা আর মংক্ষিয়া দাদা। সৈকত আমাদের সাথেই চলছিলো কিছুদূর পথ, কী ভেবে জোর পায়ে এগিয়ে গেছে সে।

দুয়েক জায়গায় একটু থেমে চলতে চলতে একসময় বগামুখপাড়ার কাছে কয়েকটা ছড়ার মোহনায় এসে দলের বাকিদের পাওয়া গেলো, এক একটা বোল্ডারের ওপর বসে এক একজন, সবার চেহারায় একটা ফূর্তি ফূর্তি ভাব। আমরা একটা বোল্ডারের ওপর বসতে না বসতেই বাকিরা উঠে পড়ার তোড়জোড় শুরু করলো। ওদিকে বাঁশের মাচায় ব্যাটারি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন পাহাড়ি, তাদের সৌজন্যে জানা গেলো, আজ বগামুখপাড়ায় জোর হুল্লোড় আর উৎসব হবে রাতে। এই খবর জানিয়ে দিয়ে হুমহাম করতে করতে নক্ষত্রবেগে এগিয়ে গেলো তারা।

কানের কাছে একটা বিদঘুটে গুনগুন শুনে চমকে উঠলাম, নাকের সামনে দুয়েকটা সংসর্গবৎসল মশাকে ঘুরঘুর করতে দেখা গেলো। অমনি হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়লাম, মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া বাঁধানোর কোন খায়েশ নেই আমার। পুতুল আপা আরেকটু জিরোতে চাইছিলেন, তাঁকেও ঠেলেঠুলে তুলে দেয়া হলো। ডিসেম্বর মাসে এই একই পথে ট্রেক করতে এসে সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে আরেক অভিযাত্রী দলের এক সদস্য, কাজেই সাবধানের মার নেই।

মিনিট পনেরো হাঁটতেই এবার বগামুখপাড়ায় পৌঁছে গেলাম সকলে। বগামুখপাড়ার গোড়ায় একগাদা দোকান, সেখানে চায়ের বন্দোবস্ত রয়েছে। দোকানের সামনে কাঠের মাচায় বসে, ব্যাগের হাত থেকে কাঁধদুটোকে, আর জুতোর হাত থেকে পাদুটোকে একটু রেহাই দিয়ে ক্যামেরা খুলে বসলাম। ফটোগ্রাফিতে আমার বিকট উৎসাহ, যদিও এলেম কম --- তাই ক্যামেরা বার করে স্থানীয়দের সান্ধ্য কার্যকলাপের কিছু ছবি তুললাম। উনুনে আগুন জ্বলছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে পাহাড়ি শিশু, বয়স্করা বসে গল্পগুজব করছে ---। আর আমরা এক একজন আলাপ করছি, পেটপূজায় নৈবেদ্য কী দেয়া যায়? বাস্তবিক, বেশ কষেই লেগেছে খিদেটা, বিচিত্র সব গুরগুর শব্দে পেট সে কথা জানান দিচ্ছে।
ওদিকে মংক্ষিয়াদা আজ রাতের জন্যে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই বার করে ফেলেছেন, একটা মারমা কুটির। গাঁটরি বোঁচকা কাঁধে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে সেই কুটিরে গিয়ে চড়লাম সকলে। বরুণদা যদিও ভোরের দিকে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, একেবারে এনংপাড়ায় গিয়ে রাতের আড্ডা গাড়বেন, কিন্তু ইঞ্জিনে তেল কম থাকায় আর সেটা হয়ে উঠলো না আর কি।

বান্দরবানের এদিকটায় পাহাড়িদের কুটির যদি দেখে না থাকেন, তাহলে এক দফা হালকা লেকচার দিই। কুটিরগুলো তৈরি করা হয় বাঁশ আর কাঠ দিয়ে। এখানে সব কুটিরই দোতলা। একতলাটা পুরোটাই ফাঁকা, তাতে কোন বেড়া নেই। সেই ফাঁকায় চড়ে বেড়ায় মুরগি, কুকুর আর শূকর । মাটি থেকে ফুট তিন-চার ওপরে ঘরের মেঝে, বাঁশের ফালি দিয়ে বোনা মজবুত মাদুর খুঁটির সাথে শক্ত করে এঁটে তৈরি করা। একটা কাঠের বীমে কয়েক জায়গায় দায়ের কোপ মেরে তৈরি করা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় এই মাদুরের পাটাতনে। শুধু ঘরের মেঝেই নয়, দেয়ালও এই বাঁশের মাদুর দিয়ে তৈরি। হালকা, কিন্তু খুব মজবুত।

পাটাতনে উঠে জুতো খুলে রেখে ঘরে ঢুকলাম সকলে। পলকে ঘরের কোণায় বিশাল এক হ্যাভারস্যাকের পাহাড় তৈরি হয়ে গেলো। যে যার পানির বোতল বার করে কয়েক ঢোঁক খেয়ে, হাতমুখ ধুয়ে একটু হাত পা ছড়িয়ে বসতেই পেট কাদম্বিনীর মতো মরিয়া প্রমাণ করিলো যে সে মরে নাই, এখনো আছে। কাজেই পেটের জ্বালাকে প্রতিরোধ করার জন্যে সামান্য ডালভাতের আয়োজন করতে উঠলেন মংক্ষিয়াদা। ওদিকে পুতুল আপা তাঁর সেই মহার্ঘ আচারের বোতল, আপেল, মেয়োনেজ, ইত্যাদি বার করে অল্প সময়ের মধ্যে এমন এক অসামান্য ফ্রুট সালাদ তৈরি করলেন, যার স্বাদ জিভে লেগে নেই বলে এখন প্রবল আফসোস হয়। আর শাহেদ ভাই ম্যাজিশিয়ানের মতো ব্যাগ থেকে বার করলেন ভুনা গরুর মাংসের ছোট্ট একটা বাটি, ভাবির কল্যাণে, কোরবানির সৌজন্যে। ডাল, ভাত, মাংস আর সেই সালাদামৃত (যিনি সালাদ তিনিই অমৃত, তৎপুরুষ সমাস) দিয়ে চেটেপুটে খাওয়া শেষ করে মনে হলো, এমন ভোজ অনেকদিন হয়নি।

খাওয়াদাওয়ার পর ঘুমপরীরা যদি উড়ে এসে জুড়ে বসে, নিশ্চিন্তমনে চিৎ হয়ে দুদন্ড ঘুমোনোর পরামর্শ দেয়, উচিত হয় কি ফেরানো তাহারে? তাই পায়ে খানিকটা মলম মালিশ করে যখন ঘুমকম্বল নিয়ে টানাটানি করছি, তখন বাকিরা এমন জুলজুল করে আমাকে তাকিয়ে দেখতে শুরু করলো, যেন আমি খুনের মামলার আসামি। আজ রাতে জোর উৎসব হবে, দূরদূরান্ত থেকে ব্যাটারি কাঁধে নিয়ে যখন জড়ো হয়েছে শতাধিক লোকজন, আর আমি পাষন্ড কি না পড়ে পড়ে ঘুমোবো? ধিক, শতধিক! --- কিন্তু ভাই, ঘুমপরীদের সাথে তাংফাং করা অনুচিত, এ আমি কিভাবে বোঝাই? অবশ্য আমার সুযুক্তি কেউ কানে নিতে চাইলো না, বিশেষ করে চঞ্চল তো খুবই নিন্দামুখর হয়ে উঠলো --- ভালো কথা ইদানীং কি আর কেউ কানে নিতে চায়, বলুন --- দূর থেকে যখন ব্যাটারিচালিত মাইকে ভেসে এলো হারমোনিয়ামে সেই চিরাচরিত মুরং সুর আর গান, সক্কলে হুড়মুড়িয়ে ছুটে বার হলো, যেন হাশরের ময়দানে রোলকল হচ্ছে। কীই বা করার রইলো আমার, স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া?



দুই: ভোর হোলো দোর খোলো

সেই সন্ধ্যে থেকে ঘুমুচ্ছি। যদিও হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছে, কানে ভেসে এসেছে উৎসবের সঙ্গীত, আবার অন্যেরা যখন পর্যটনে খ্যামা দিয়ে ঘুমোবার জন্যে ফিরে এসেছে, তখন তাদের লাথিঝাঁটাও কিঞ্চিৎ সহ্য করতে হয়েছে। বিশেষ করে এই চঞ্চলটা আমার ওপর চটা, কেন কে জানে, বিনা কারণেই আমাকে গজভুক্ত কপিত্থবৎ এক কোণ থেকে আরেক কোণে গড়িয়ে যাওয়ার মূহুর্মূহু হুকুমে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিলো, একবার বলে ডানে চাপো, তো আরেকবার বলে নিচে নামো। তার অভিযোগ, আমি নাকি গোটা ঘর দখল করে শুয়ে ছিলাম। বোঝো কান্ড, দশজনের ঘর একজন কিভাবে দখল করে শোয়, তা বোঝা অন্তত আমার বুদ্ধিতে কুলোয় না। এ নিয়ে চঞ্চলের সাথে তর্ক করাও বৃথা, ভারি সহিংস আচরণ করছিলো সে, বোধহয় পাহাড়িদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ব্যাটার পোষায়নি, অথবা গুরুতর ধাতানি খেয়ে ফিরে এসেছে, কিন্তু ওর হাবভাব দেখে প্রাণের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাইনি --- যাই হোক, কিন্তু সূর্যের দেখা পাবার পর ঘুমোনোর কোন অধিকার এঙ্প্লোরারস' ক্লাবের সদস্যদের নেই, কাজেই উঠে পড়তে হলো। তখনও মাইকে ভেসে আসছে মুরংদের সেই গান। গানের কথা সময়ের সাথে পাল্টায়, কিন্তু সুরের ব্যাপারে এঁরা ভদ্রলোক, এই একই সুরে নানা গান বেজে চলছে। গ্যালো বছর যখন সূর্যোৎসবে এসেছিলাম, তখন বগালেকপাড়ায় মুরংদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও এই একই সুর শুনেছি, একেবারে মাথায় গেঁথে আছে সেটা। আমার পরিচিত এক কিশোরী বহু পরিশ্রম স্বীকার করে রবি ঠাকুরের আহা আজি এ বসন্তে গানখানা সুরে ও তালে গলায় তুলতে পেরেছিলো, আর সেই একখানা গান শিখেই সাধনায় খ্যামা দিয়েছিলো সে, পরবর্তীতে যে কোন রবীন্দ্র সঙ্গীত, হোক সেটা বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল কিংবা এসো হে বৈশাখ এসো এসো, সেই আজি এ বসন্তের সুর-তালের ছাঁচে ফেলে বেশ টেনে গাইতো বেচারি। মনে হচ্ছে এটাও একই কেস। এঁদের যে একজন প্রতিভাবান সুরকারের বিশেষ অভাব, বোঝা গেলো। আর এঁদের দোষ দেবো কেন, গোটা বাংলাদেশেই তো সুরের আকাল চলছে, অসুরই এখন এ দেশে নন্দিত!

সাধারণত বরুণদা-ই আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। কিন্তু আজ দিনটাই অন্যরকম। আমি প্রকৃতি ভালোবাসি, প্রকৃতিও আমাকে ভালোবাসে, হাতছানি দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে ডাকে, তাই ভোরবেলার সেই মধুঘুম ভাঙলো প্রকৃতির প্রবল ডাকে। বড় স্কেলের কেলেঙ্কারি হয়ে যাবার আগেই ব্যাগ থেকে দরকারি কাগজপত্র, মানে টয়লেট পেপার নিয়ে অন্যের চপ্পল পায়ে গলিয়ে কার্ল লুইসের মতো ছুটলাম এক নিভৃত কোণে। আর কি মুশকিল, তেমন ঘন ঝোপঝাড় এখানে নেই, কাজেই কোন পাহাড়ি যদি প্রাতভ্রমণে বের হন, আমাকে ভারি নাজুক পরিস্থিতিতে দেখে ফেলতে পারেন। ওদিকে ভোরবেলা কনকনে ঠান্ডার কামড়, তার ওপর আছে মশার দংশনে ম্যালেরিয়ার ভয়, চারদিকে সতর্ক চোখ রাখতে হচ্ছে যাতে করে কোন শূকরবাহিনী এসে আমাকে গুঁতিয়ে দিতে না পারে (বান্দরবানের এদিকে প্রতিটি গ্রামেই শূকর পালন করা হয়। শূকরগুলো নিজের খেয়ালে চরে বেড়ায়। মানুষের বর্জ্য এদের বিশেষ পছন্দনীয়, তাই কাউকে "বড় বাইরে"-এর কাজে ব্যস্ত দেখলে এরা দল বেঁধে এসে ভোজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের কবলে পড়লে কপালে অশেষ ভোগান্তি আছে। টয়লেটে গেলে সবসময় হাতে লাঠি জাতীয় অস্ত্রশস্ত্র রাখতে হবে। বিশ্বাস না হয় তো একবার খালিহাতে সরজমিন গিয়ে পরখ করে আসতে পারেন), আর এদিকে খোলা আকাশের নিচে কেবল কয়েকটি ক্ষীণকায় কলাগাছকে পাহারায় দাঁড় করিয়ে সমাজের হাতে ধরা পড়ে কলঙ্কিত হবার কূলনাশা শঙ্কা, আর পেটের সেই চিনচিনে ব্যথাটা তো আছেই রে বাপ --- সব মিলিয়ে প্রকৃতির সেই ব্যাকুল ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে আমার নাভিশ্বাস উঠে যাবার অবস্থা। যাই হোক, কোনমতে কাজ সেরে ভারি পুলকিতচিত্তে বেরিয়ে এসে দেখলাম, দলের অন্যদের মধ্যেও সাজো সাজো রব, বুঝলাম, প্রকৃতি কেবল একা আমাকেই ডাকছে না। চপ্পলের মালিক দলনেতা উচ্ছল ভাই অত্যন্ত গোমড়ামুখে পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে --- দেখে তেমন একটা উচ্ছল মনে হচ্ছিলো না তাঁকে --- তাঁর শারীরিক হাবভাব দেখে বুঝলাম, প্রকৃতিতোষণের সাধ থাকা সত্ত্বেও এক জোড়া জুৎসই স্যান্ডেলের অভাবে এই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাধ্য তাঁর নেই, কারণ খালিপায়ে এখানে হাঁটাহাঁটি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় । তার ওপর তাঁর সাধের চপ্পল আমার পায়ে দেখে উচ্ছল অগি্নগর্ভ শমীবৃক্ষের মতো নিশ্চল হয়ে পড়লেন, নির্বাক হয়ে রক্তচক্ষু মেলে আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলেন একবার, আমার সুখী মুখ দেখে মনে মনে হয়তো পঞ্চাশ-ষাটটা গাল দিলেন, কিন্তু মুখে কিছু না বলে দলনেতাসুলভ ক্ষমাশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চুপচাপ আমার সারেন্ডার করা সেই চপ্পল পায়ে গলিয়ে গটগটিয়ে কোন এক নিভৃত ঝোপের সন্ধানে এগিয়ে গেলেন। আমি ভেবে দেখলাম, পরবর্তীতে এই পাড়ার অধিবাসীরা যে মর্মান্তিক চটবেন আমাদের ওপর, তাতে কোন সন্দেহ নেই, কারণ একটা গোটা পাহাড়কে বৃত্তাকারে কলুষিত করে রেখে যাচ্ছি আমরা, যার কেন্দ্র আমাদের এই রাত্রিকালীন আশ্রয়কুটির। শহুরে বাবুদের পরিচ্ছন্নতাবোধকে যে এরা পরবর্তীতে কী পরিমাণ অবজ্ঞার চোখে দেখবে, তা-ই ভাবতে ভাবতে হেলেদুলে এগিয়ে গিয়ে পাটাতনে চড়ে হেঁড়ে গলায় একটা মানানসই গান ধরলাম, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, এ এ এ, রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে ---। কিন্তু বেরসিক চঞ্চলটা মাঝপথেই কোত্থেকে উদয় হয়ে খেঁকিয়ে উঠলো, আমাকে নাকি জলদি করতে হবে, আমার জন্যে নাকি দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমিই নাকি সব নষ্টের গোড়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। ক্ষুণ্ন মনে ব্যাগ গুছিয়ে জুতো পরে অন্যদের পেছন পেছন এগিয়ে নেমে এলাম দোকানগুলোর সামনে, মনে মনে চঞ্চলকে বকলাম কিছুক্ষণ, ব্যাটা ফিলিস্টাইন, বর্বর অসভ্য, সঙ্গীতের মর্ম তুমি কী বোঝো?

সেই দোকানের মাচায় ব্যাগ রেখে নিচের ছড়ায় গিয়ে কুল কুল করে বয়ে যাওয়া হিম জলে হাতমুখচশমা ধুয়ে দাঁত মেজে খেতে বসলাম সকলে। খাবার রাতের উদ্বৃত্ত সেই ডাল আর ভাত, সেটা দিয়েই যতটা সম্ভব না লাগা খিদের আগাম নিবৃত্তি করলাম। আজ যেতে হবে বহুদূর, পথে কোথাও খাবারদাবার পাওয়া যাবে কি না, কে জানে? পুকুরপাড়া আর বগামুখপাড়ার মাঝে তিনটে পাড়া পড়ে --- লেনতংসে পাড়া, মেনথুই পাড়া, আর এনংপাড়া। কিন্তু শুধু খাওয়াদাওয়ার জন্যে সেসব পাড়ায় থামার অবকাশ নেই আমাদের। এক যদি পথে কলাটলা পাওয়া যায়, নয়তো পেটে কিল মেরে এগিয়ে যেতে হবে।

সবাই যখন চা খাওয়ার তোড়জোড় করছে, তখন ট্রাইপড বার করে একটা দলগত ছবি নেয়ার ধান্ধা করলাম। ক্যামেরাটা বসিয়ে যুৎসই ফ্রেম খুঁজছি, এমন সময় আবারো কোত্থেকে হাঁ হাঁ করে ছুটে এলো ঐ ব্যাটা চঞ্চল। আমাকে একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজেই ক্যামেরার স্পিড আর ফিল্ড সেট করলো সে। আমি একটা কিছু বলতে চাইছিলাম, ধমক খেয়ে আমাকে থেমে পড়তে হলো, আমি আবার ক্যামেরার কী বুঝি? তারপর ছবি তুলতে গিয়ে দেখা গেলো, ক্যামেরা আপত্তি জানাচ্ছে। এর কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা চঞ্চল সাহেব দিতে পারলেন না, বরং আমার ক্যামেরাটাকেই দুষবার একটা পাঁয়তাড়া কষতে লাগলেন। চটেমটে ব্যাটাকে হাঁকিয়ে দিয়ে সবাইকে জড়ো করে ক্যামেরাকে নিজ মর্জিতে চলতে দিয়ে একটা ছবি তোলা হলো, অবশ্যই আমি নতুন করে সব সেট করবার পর। আমাদের দশজনের একটা ঝকঝকে ছবি অক্ষয় হয়ে রইলো সেলুলয়েডে। তারপর ট্রাইপডটাকে আবারো গুটিয়ে ব্যাগে পুরে হাঁটা শুরু করলাম বাকিদের পেছন পেছন।

বরুণদা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, একটানা প্রায় ঘন্টা তিনেক খাড়াই বেয়ে উঠতে হবে আজ। সবাই একটা করে লাঠি সবাই জুটিয়ে নিয়েছি, কারণ ষষ্ঠি বিনে এই পথে চলতে গেলে খবরই আছে, কেবল শাহেদ ভাই লাঠি বইতে রাজি নন। তবে লাঠির মাহাত্ম্য বাকি সবাই কমবেশি জানি। সালেহীন তো প্রত্যেক অভিযান শেষে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একখানা লাঠি ঘরে বয়ে নিয়ে যায়, গাদা খানেক লাঠি সে ইতিমধ্যে জমিয়ে ফেলেছে, এক পল্টন দাঙ্গা পুলিশকে সন্তুষ্ট করা যাবে তা দিয়ে।

বগামুখপাড়ার পর ডানদিকে বেঁকলে বগালেকপাড়ার সেই বিদঘুটে পথ পাওয়া যায়, যে পথে পড়ে সেই ভয়ালদর্শন পতনছড়ি। কিন্তু আমাদের পথ বাম দিকে, একটা পাহাড়ের ঝুরঝুরে সরু পথ বেয়ে উঠে। সেই পথে পা ফেলেই টের পেলাম, আজ ভাগ্যে লাল কালিতে অনেক কিছু লেখা আছে। হাঁচড়ে পাঁচড়ে খানিকটা উঠে খানিকটা শক্ত মাটি পাওয়া গেলো। এই পথে একবার পা পিছলে পড়লে হয়তো কেউ প্রাণে মারা পড়বে না, কিন্তু পা মচকে যাবার একটা বিরাট সম্ভাবনা আছে। আর এখানে একবার পা মচকালে খবরই আছে! তখন লাঠিতে ভর দিয়ে বড়জোর দাঁড়িয়ে থাকা যাবে, চলা যাবে না। আর চলতে না পারলে এই নির্জন ঘন অরণ্যশাসিত পাহাড়ে রাত কাটাতে হবে, একেবারে খোলা আকাশের নিচে।

পথের দু'ধারে ঘন ঝোপ এখন, বিশাল সব গাছের জন্যে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছুতে পারছে না। সঙ্গত কারণেই মাটি কিছুটা ভিজে, পথের পাশে পড়ে থাকা মড়া গুঁড়ির ওপর ছত্রাকের আস্তরণ পুরু হয়ে জমেছে। লাঠি ঠুকে ঠুকে খানিকটা এগিয়ে গেলাম সবাই। আধঘন্টার মতো হাঁটার পরই কাহিল লাগছে। মনে মনে নিজেকে গালমন্দ করলাম, হাঁটার চর্চা থামিয়ে দেবার জন্যে। পাহাড়ি পথে হেঁটেছি সেই এক বছর আগে, চর্চার অভাবে পায়ের পেশী খানিক পর পরই আপত্তি জানাচ্ছে। কিন্তু সকালের এই মিষ্টি নরম রোদ, নির্মল বাতাস আর চারপাশের সবুজই চাঙা করে রেখেছে আমাকে, আমাদের সবাইকে। ঢাকার বাতাসে যারা শ্বাস নিয়ে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই টাটকা হাওয়া যে কী মিষ্টি লাগে, তা বলার মতো নয়।

ওদিকে চঞ্চল ভোরবেলা হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে আসল কাজে ঢিলেমি করেছে, এখন হাতের কাছে যুৎসই ঝোপ পেয়ে আর সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নয় সে, তাই এক দিস্তা দলিলদস্তাবেজ বার করে এক গহীন ঝাড়ে হানা দিয়েছে ব্যাটা। আমি, সালেহীন, মিলন ভাই আর উচ্ছল ভাই একটা গুঁড়ির ওপরে বসে কিছুক্ষণ সুখ দুঃখের আলাপ --- অ্যাতোক্ষণ হাঁটার পর খানিকটা বসলাম, এতেই সুখ, কিন্তু মিনিটখানেক বাদেই আবার উঠে পড়তে হবে, এটাই যা দুঃখ --- সেরে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। যথারীতি অন্যেরা হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো, আর আমি রূপকথার ছোট্ট গোল রুটির মতো গুটিগুটি চলতে লাগলাম। পুকুরপাড়াটা অ্যাতো দূরে কেন রে বাবা?
বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একটা সম্মানজনক উচ্চতায় উঠে আমরা কয়েকজন থামলাম। এরই মাঝে ক্যামেরা বার করে অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তী কয়েকজনের ছবি তুলেছি, ছবি তুলেছি দূরের পাহাড়সারির, মংক্ষিয়াদার। ইতিমধ্যে বরুণদা, পুতুল আপা আর শাহেদ ভাইও এগিয়ে এসেছেন। একটু থেমে পড়তেই আলাপ জমে উঠলো আমাদের। বিষয়: বাংলাদেশে পর্যটনের ভবিষ্যত নিয়ে হতাশা। বাংলাদেশের বাইরে অনেক দেশেই এমন সব পাহাড় চলে এসেছে দক্ষ পর্যটন ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধানে। সেখানে নিয়ন্ত্রিত ট্রেক প্রোগ্রামের সুবন্দোবস্ত রয়েছে, আয়েশী পর্যটকের জন্যে রয়েছে ঝুলযানের ব্যবস্থা --- আরো অনেক কিছু। কিন্তু আমাদের এমনি পোড়া কপাল, যে কোন দূরদর্শী মানুষ কখনো এদেশে পর্যটনের দায়িত্ব পায়নি। আর পর্যটনানুকূল মানসিকতাও গড়ে ওঠেনি আমাদের মানুষদের মাঝে। সবেধন নীলমণি কঙ্বাজারে হুড়োহুড়ি করে বেড়াতে যান সকলে, সেখানকার সৈকতটাকে আবর্জনার গাদায় পরিণত করেন, আর কর্তৃপক্ষ তাদের জন্যে গলাকাটা দামের হোটেল মঞ্জুর করে দিয়ে ভাবেন, বাহ, বেশ একখান কাজ করলাম। সোনার হাঁস কবে ডিম পাড়বে, তার জন্যে অপেক্ষা করতে রাজি নয় বাংলাদেশের লোকজন, যে যত জলদি পারে হাঁসটাকে কেটেকুটে সাফ করতে চায়।

কিন্তু একটানা বদনাম আর আপসোসই বা কতক্ষণ করা যায়? আবার পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা, আরো ওপরে। এবার আমি আর পুতুল আপাই একটু পিছিয়ে পড়লাম। তিন আদিবাসী নেমে আসছিলেন, পুতুল আপা তাদের দেখে যেন হাতে চাঁদ পেলেন, আদিবাসীদের সাথে আলাপ করার খুব ঝোঁক তাঁর। বাংলা খুব একটা বোঝেন না তারা, তবুও মিনিট পাঁচেক তাঁদের সাথে গল্প চললো। সবশেষে তাদের সাথে পুতুল আপার একটা ছবি তুলে নিয়ে চকলেট বিতরণ করে আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম। ততক্ষণে অন্যেরা নিঃসন্দেহে খানিকটা এগিয়ে গেছে।

খানিকটা সমতল পেয়ে জোর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। হুড়হুড়িয়ে বেশ খানিকটা গিয়ে আবার বাকিদের দেখা পাওয়া গেলো। একটা গোড়াপোড়া গাছের পাশে বাঁধানো টংঘরে বসে আছে সবাই। বরুণদা জানালেন, এই টংঘর হচ্ছে লেনতংসে পাড়ায় প্রবেশের পথের মুখে, ডানের পথটা ধরে এগিয়ে গেলেই পড়বে পাড়াটা --- লেনতংসে পাড়ার কারবারির ছেলের সাথে গত রাতের উৎসবে নাকি তাঁর দেখাও হয়েছে, পাড়ায় নেমন্তন্ন করে গেছে সে।

পাটাতনে ব্যাগটা খুলে রেখে ক্যামেরা বার করে কিছুক্ষণ টহল দিলাম। প্রকৃতির ছবি তো অনেকই তোলা হলো, এবার নিজের কৃষ্ণপক্ষের চাঁদবদনটাকেও সেলুলয়েডে পোক্ত করার বাসনায় সৈকতকে দায়িত্ব দিলাম। ইতিমধ্যে টংঘরে আরেক পথিক পাহাড়ি এসে বসেছেন, তাঁর নাম ধনঞ্জয় ত্রিপুরা, তিনি চলেছেন তিনমাথায়। তিনমাথা জায়গাটা হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত আর মিয়ানমারের স্থলসঙ্গম, বর্ধিষ্ণু একটা গ্রাম আছে সেখানে, সেই গ্রামে ধনঞ্জয়ের কন্যার শ্বশুরবাড়ি। মেয়েকে দেখতে চলেছেন তিনি। এদিকে আমাদের পুতুল আপা দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে হাঁটতে গিয়ে একটু কাবু হয়ে পড়েছেন, তাই মংক্ষিয়াদার মধ্যস্থতায় ঠিক হলো, ধনঞ্জয়দা আমাদের সাথে পথ চলবেন, আর পুতুল আপার হ্যাভারস্যাকটা থাকবে তাঁর কাঁধে। তিনি সম্মত হতে আমাদের দলের আকার দশ জন থেকে বেড়ে দাঁড়ালো এগারোজনে।

ঘন ঘন বিশ্রাম নেয়ায় খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি আমরা, এবার তাই সবাই জোর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। অনেকক্ষণ পর বেশ খানিকটা সমতল পথ পাওয়া গেছে, তেমন একটা চড়াই উৎরাই নেই, কাজেই বেশ কিছুটা পথ পেরোনো গেলো। তবে পথ সমতল হলেও তার ল্যাঠা কম নয়, বড় বড় গাছের কারণে দিনের বেশির ভাগ সময়েই এদিকটায় মাটিতে রোদ পড়ে না, তাই পথের মাটি নরম, কাদাটে আর খানিকটা পিচ্ছিল। পথ চলতে চলতে হঠাৎ ঘড়ঘড় শব্দ শুনে দেখি, একটা হেলিকপ্টার বেশ নিচু দিয়েই হেলেদুলে উড়ে যাচ্ছে, আয়েশী বাদুড়ের মতো, নিশ্চয়ই কাছে কোন আর্মি ক্যাম্পে সাপ্লাই পৌঁছে দেবে।

চলতে চলতে আশেপাশের পাহাড়, বাতাসে দোদুল্যমান এক মানুষ লম্বা ঘাসের শীষ, ইত্যাদির ছবি তুলতে তুলতে হঠাৎ খেয়াল হলো, বেশ খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি। তেড়েফুঁড়ে খানিকটা হেঁটে একটা পাহাড় টপকাতেই দেখি মংক্ষিয়াদা দাঁড়িয়ে, আমার অপেক্ষায়, চোখে ভারি অননুমোদী দৃষ্টি, এভাবে হাঁটতে হাঁটতে হেদিয়ে পড়াটাকে ভালো চোখে দেখছেন না তিনি। তাই তাঁর মন আর নিজের মান রক্ষার্থে এবার ক্যামেরাটাকে ব্যাগবন্দী করে ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটা দিলাম। ডানে চলে গেছে একটা পথ, ওদিক দিয়ে গেলে সায়কতপাড়া পড়বে। সায়কতপাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত গ্রাম। কেওকারাডঙের একেবারে গোড়ায় যে দার্জিলিংপাড়া, সেটাও এই সায়কতপাড়ার চেয়ে খানিকটা নিচুতে।

পাহাড়িরা পাহাড়ের কিছু কিছু জায়গায় মজবুত বেড়া দিয়ে রাখেন, যাতে তাঁদের পোষা গয়ালগুলো চরতে চরতে অন্যের সীমানায় চলে না যায়। আর এই বেড়া টপকানোর জন্যে রয়েছে তাঁদের সেই অভিনব সিঁড়ি, যেগুলো বেয়ে তাঁরা নিজেদের ঘরের পাটাতনে ওঠেন, একটা সরু গুঁড়ির কয়েক জায়গায় দায়ের কোপ মেরে তৈরি করা। এমনই একটা এবার পড়লো পথে। সেটা ডিঙিয়ে খানিকটা যেতেই অপূর্ব এক দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সকালের রোদ এসে পড়েছে সেই অপূর্ব সবুজ পাহাড়ের ঢালে, যেন সবুজ আগুন জ্বলছে গোটা পাহাড় জুড়ে, মাথার ওপরে নির্মেঘ নীল আকাশ, দূরে একটার পর আরেকটা পাহাড়ের ঢাল, আস্তে আস্তে পাতলা একটা কুয়াশার চাদরে যেন হারিয়ে যাচ্ছে তারা, আর সামনে এই আঁকাবাঁকা চলার পথ। চারিদিকে সব নিঝুম, কোন পাখি ডাকছে না, কোন ঝর্ণার ফিসফাস নেই, শুধু নিজের চলার খসখস শব্দ। এই নির্জন নিস্তব্ধ সকালগুলো আমাদের জীবন থেকে এত দূরে কেন থাকে, আমরা কেন এভাবে সরে সরে থাকি এই পাহাড়ি রোদের সাম্রাজ্য থেকে? আমি পথ চলতে চলতে নিজের কানে কানেই ফিসফিসিয়ে কথা বলতে থাকি, ঠোঁটে কয়েকটি পঙক্তি ছুটে আসে নিজ থেকেই,

--- এজন্যেই কি আমি অনেক শতাব্দী ধ'রে স্বপ্নবস্তুর
ভেতর দিয়ে ছুটে-ছুটে পাঁচশো
দেয়াল-জ্যোৎস্না-রাত্রি-
ঝরাপাতা নিমেষে পেরিয়ে বলেছি, 'রূপসী, তুমি,
আমাকে
করো তোমার হাতের গোলাপ।'


বেশ একটা ইয়ে এসে গিয়েছিলো নিজের মধ্যে, বুঝলেন, হঠাৎ চোখ পড়লো সামনে, দূরে তড়বড়িয়ে হেঁটে চলছে দলের বাকি লোকজন, আর তাদের মধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে বারে বারে ভারি তাচ্ছিল্যের সাথে আমাকে দেখে নিচ্ছে --- কয় কিলোমিটার পেছনে পড়ে আছি, কিংবা আদৌ এগোচ্ছি কি না --- আর কেউ নয়, সেই জংলি চঞ্চল ব্যাটা! রাগে আমার মাথার রন্ধ্রগুলো জ্বলে উঠলো, ব্যাটা বেরসিক, জানো তো শুধু গয়ালের মতো চরে বেড়াতে, সৌন্দর্য উপলব্ধি যদি তোমার কাজই হতো --- বহুকষ্টে যোগবলে রাগ কমিয়ে আনি, নাহ, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ আর গোয়েটে ইনস্টিটুটে অ্যাতোদিন যাতায়াত করেও বর্বর আর অসংস্কৃতই রয়ে গেছে ছোকরা! রাগের চোটে হাঁটার গতি একটু কমে গিয়েছিলো, মংক্ষিয়াদার তাড়া খেয়ে আবার হনহনিয়ে হাঁটতে থাকি।

একটা মোড় ঘুরে খানিকটা এগিয়ে দেখি, পথের ওপর যে যেভাবে পারে একটু বসে পড়েছে সকলে, হিরো থেকে জিরো হয়ে জিরোচ্ছে। আমিও ধুপ করে বসে পড়লাম, হাতের লাঠিটাকে মাটিতে গেঁথে। ধনঞ্জয় ত্রিপুরা তাঁর পাথেয় যে ক'টি কলা এনেছিলেন, সেগুলো একে একে খোসা হারিয়ে আমাদের ভোগে নিয়োজিত হলো। এক প্যাকেট বিস্কুটও কার ব্যাগ থেকে বেরিয়ে পড়লো। বাড়িতে বসে কলা বা বিস্কুট আমি ছুঁয়েও দেখি না, কিন্তু এখন, বাপ রে, পেটে টহল মারছে এক দুর্দমনীয় ক্ষুধা, এখন করলা ভাজি দিয়ে পান্তাভাত সাধলেও গপগপিয়ে খেয়ে ফেলতে রাজি আছি। এমনকি বিস্কুটের ভাগাভাগি নিয়ে চঞ্চলের সাথে একদফা ঠান্ডা কুস্তিও হয়ে গেলো। দু'জন দু'জনের দিকে বিষাক্ত চোখে তাকিয়ে টোস্ট বিস্কুট খেতে লাগলাম কড়মড়িয়ে, যেন একে অন্যের খুলিটাই চিবিয়ে খাচ্ছি।

পেটকে কিছুটা বুঝ দিয়ে পানির বোতল মাত্র খুলেছি, ও মা, তাকিয়ে দেখি পটাপট উঠে পড়ছে সবাই। আমি পানি খেয়ে বোতলের ছিপি আটকে গোঁফের পানি মুছতে মুছতেই তারা শ'খানেক গজ এগিয়ে গেলো। কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে লাঠিটাকে প্রেয়সীর মতো জাপটে ধরে আবার এগোতে লাগলাম।

এবার সবাই আমাকে ছেড়ে এগিয়ে গেছে, তাই পেছন থেকে হুড়ো দেবার লোক নেই। আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ক্যামেরাটা বার করলাম। ঐ তো দূরে কী চমৎকার একটা পাতায় সাজানো নাম না জানা গাছ, আর ঠিক তার পাশেই একটা ন্যাড়া শুকনো গাছ। বিত্ত ও দারিদ্র্যের নিশ্চুপ সহাবস্থান --- ছবির শিরোনাম ভাবতে ভাবতে আমার শিরোভাগ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, নানা কায়দায় কয়েকটা ছবি তুলি, বেশ সময় নিয়ে। তারপর খানিকক্ষণ নেমে এসে দেখি, কাছেই পাহাড়ের ওপর একটা পাড়া --- মেনথুই পাড়া --- দেখা যাচ্ছে। এবার সুবিধাজনক কিছু জায়গা থেকে সেই গ্রামেরও কয়েকটা ছবি তুললাম। তবে ছবি তুলতে গিয়ে মিনিট পাঁচেক সময় অপচিত হয়েছে, ইতিমধ্যে আমার সহযাত্রী বন্ধুরা যে অস্তমিত হয়েছেন, তাতে আর সন্দেহ কী? তাই ক্যামেরাটা আবারও ব্যাগে বুঁজিয়ে রেখে হাঁচড়ে পাঁচড়ে নিচে নেমে এলাম। প্রায় চলি্লশ মিনিট ধরে নামতে হয়েছে, যে পাহাড়টায় এতক্ষণ ধরে চড়েছি আমরা, তারই অন্য পাশে খানিকটা পথ নেমেছি এবার।

গ্রামটাকে পাশ কাটিয়ে আরো নিচে নেমে দেখি একটা গম্ভীর সরসর শব্দ হচ্ছে। একটা ছড়ায় পানি বয়ে যাচ্ছে পাথরের ওপর, সারাটা পাহাড় জুড়ে তার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। সেই ছড়ার পাশে হাত পা এলিয়ে বসে আমাদের লোকজন, আর কিছু দূরে কয়েকটি পাহাড়ি তরুণী, ঝিম মেরে এক জায়গায় বসে আছে তারা। পরিশ্রমের কারণেই বোধহয় আমাদের সম্পর্কে তাদের কোন কৌতূহল প্রকাশ পাচ্ছে না। বহু দূর থেকে আসছে বেচারীরা, সম্ভবত রুমাবাজার থেকে, কারণ তাদের সাথে নানারকম মনোহারি পণ্যের বোঝা, আর যাবেও খুব সম্ভবত বহুদূর। পাহাড়িরা আমার চেয়ে চারগুণ ওজন বহন করে প্রায় তিনগুণ বেগে চলতে পারে এ অঞ্চলের পথঘাট দিয়ে, আর চলতেও পারে একটানা অনেকক্ষণ। কিন্তু মাঝে মাঝে কয়েকটা জায়গায় একটু বসে লম্বা বিশ্রাম নেয় তারা, আধঘন্টা বা পৌনে এক ঘন্টার মতো। পাহাড়িদের পায়ের গড়নই সম্পূর্ণ অন্যরকম। একমণ আদা পিঠের ঝুড়িতে --- ঝুড়িগুলোর ফিতে ওদের কপালের সাথে বাঁধা থাকে --- বয়ে দূরদূরান্ত থেকে রুমাবাজারে নিয়ে যায় তারা বিক্রি করতে, কিন্তু এবড়োখেবড়ো পিচ্ছিল পথের ওপর এমন অনায়াসে খালি পা ফেলে চলে, যেন কোন পার্কের বাঁধানো রাস্তায় হাঁটছে। একইভাবে গাদা গাদা লাকড়ি ঝুড়িতে করে কুড়িয়ে নিয়ে যায় তারা। আর মাত্র বারো কেজি ওজন নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে চলছি আমি, ভাবতেই লজ্জা লাগে।

ছড়াটার পাশে এসে ব্যাগ খুলে সবেমাত্র বসেছি, হাত পা একটু মেলে বসারও ফুরসত মিললো না, চঞ্চল এসে হুকুম ঝাড়লো, 'রুটি বের করো!' যেন আমি ভিক্তর উগোর সেই জ্যাঁ ভালজ্যাঁ, রুটি চুরি করে গা ঢাকা দিয়েছি। আমিও কম যাই না, নরম ঘাসের ওপর শরীর মেলে দিয়ে মধুর গলায় বললাম, 'ব্যাগে আছে, বের করে নাও!' চঞ্চল দাঁতে দাঁত ঘষলো, তারপর আমার রুকস্যাকটাকে রীতিমতো র্যানস্যাক করে সেই এক পাউন্ডার পাঁউরুটির প্যাকেটখানা এমনভাবে বার করে আনলো, যেন এয়ারপোর্টে সোনার বারের চালান আটক করেছে। আমিও চোরাচালানিদের মতোই হাবভাব নিয়ে বসে রইলাম, যেন ওটা আমার ব্যাগে ভুল করে ঢুকে পড়েছে।

কিন্তু যতোই বেরসিক বর্বর হোক না কেন, আর গুন্ডামি করে বেড়াক না কেন, আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে চঞ্চল বেশ কাজের গুন্ডা। পুতুল আপার মেয়োনেজটাকে সুচারুভাবে রুটিতে মেখে মেখে সবার হাতেই ধরিয়ে দিলো সে একেক টুকরো। আমার পূর্বপুরুষদের অসীম পূণ্যফল, যে আমার ভাগেও একটা টুকরো জুটেছিলো। ওর মতো বদের এই বদান্যতায় আমি অভিভূত হয়ে গেলাম, অর্ধেক খিদে তখনই উবে গেলো। তবে সাহিত্যপ্রবণ মন আমার, সেই কবে শৈশবে বান্দরের রুটি ভাগ বা এই গোছের একটা গল্প পড়েছিলাম, সেটাই থেকে থেকে অন্তরাত্মায় ঘা দিলো কিছুক্ষণ।

ভরপেট না হোক, ভরমন খাওয়া হলো সবার। আর আফটার লাঞ্চ রেস্ট আ হোয়াইল, তাই সবাই একটু গড়িয়ে নিলো ঘাসে। পেছনে পাথর আর খাটো ঝোপের আড়ালে ঝরঝর অবিশ্রান্ত বয়ে চলেছে হিমসলিল, সামনে ধাপে ধাপে উঠে গেছে সবুজ পাহাড়, অনেক উঁচুতে পাহাড়ের পেছনে উঁকি দিচ্ছে আকাশের বিশুদ্ধ নীল উষ্ণীষ। দিনের পর দিন কংক্রীট আর পিচের মাঝে বন্দী আমরা জীবন কাটাচ্ছি, ছোট্ট একটা পরিসরে ছুটে বেড়াচ্ছি, তাই হঠাৎ এই বিশালতা যেন আমাদের সবাইকে একটু বিষণ্ন, একটু নীরব, আর একটু অলস করে দিলো, যেন মরচেপড়া প্রদীপের ভেতর থেকে সেই বিশাল দৈত্য বেরিয়ে এসেছে আমাদের সামনে, যা এতোদিন ধরে খুঁজছিলাম তা এতো কাছে পেয়ে সবার চেষ্টা, সবার চঞ্চলতা জড় হয়ে পড়েছে ---।

বেশ লাগছিলো, বুঝলেন, গুন গুন করে গানও গাইছিলাম, রামধনু চোখে চোখে, কথাকলি মুখে মুখে, এখানে মনের কথা বোলো না, না আ আ আ, এখানে মনের কথা বোলো না ---। কিন্তু গানের আমেজ ছারখার করে দিয়ে একটা তিতিবিরক্ত কর্কশ কন্ঠ যা বলে উঠলো, তার সারমর্ম হচ্ছে, অনেক বিশ্রাম হয়েছে, এবার বডি তুলতে হবে। কি, পাঠক, অ্যাদ্দূর পড়ে এসে নিশ্চয়ই ধরতে পারছেন, এই রসভঙ্গকারী নচ্ছাড়টা কে? পদে পদে ব্যাটার নামে দরূদ পড়তে পারবো না, বুঝে নিন!

বরুণদা এর আগে এই পথে এক দুর্ধর্ষ অ্যাডভেঞ্চার করে গেছেন, অলস হাত তুলে আমাদের এগোনোর পথ দেখিয়ে দিলেন তিনি। আমাদের আগুয়ান বাহিনী, অর্থাৎ দলনেতা উচ্ছল ভাই, মিলন ভাই, সৈকত, সালেহীন আর চঞ্চল চটপট উঠে পড়ে পিঠে হ্যাভারস্যাক ঝুলিয়ে, কোমরে কষি বেঁধে বুক ফুলিয়ে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে গেলো। আমি তখনো ঘায়েল হয়ে পড়ে, একে একে সকলে উঠবার পর সেই ঘাসের কোমল সান্নিধ্য ছেড়ে কোনমতে উঠে দাঁড়ালাম। নাহ, লেটকে পড়ে থাকলে তো চলবে না, কদম কদম বাঢ়ায়ে যা খুশিসে গীত গায়ে যা ---। গাঁটরিবোঁচকা কাঁধে তুলে আবার টলন্ত পায়ে চলন্ত হলাম।

আমাদের পথ ভারি নিরীহ চেহারা নিয়ে একটা প্যাঁচ খেয়ে উঠে গেছে এক ঢিবির ওপরে। ঢিবির উচ্চতা চারতালা সমান, একেবারে কাছে না গেলে বোঝা যায় না, কী পরিমাণ কুটিল ষড়যন্ত্র এখানে রয়েছে! ঢিবিটা একেবারে মসৃণ, তার যে খাঁজগুলোতে পা রাখতে হবে, সেগুলোও মসৃণ, আবার ঝুরঝুরে মাটি ভর্তি, পা রাখতে না রাখতেই পিছলে যেতে শুরু করে। আর এক খাঁজ থেকে আরেক খাঁজের দূরত্বটাও যেন স্বাভাবিক আকারের মানুষের জন্যে তৈরি নয়, ব্রবডিংন্যাগের লোকজনের জন্যেই তৈরি বোধহয়। বহুকষ্টে দাঁতমুখ খিচিয়ে খামচাখামচি করে ঢিবি বেয়ে একটা আপাতসমতল জায়গায় উঠে দাঁড়ালাম। একটা পথ চলে গেছে ডানে, বোধহয় কোনও পাড়ার দিকে, আরেকটা পথ গোঁৎ খেয়ে সোজা নিচে নেমে গেছে। ধনঞ্জয়দার এগোনো দেখে বুঝলাম, এখন আমাদের নিচে নামতে হবে। ভালো করে রুকস্যাক এঁটে নিয়ে তিন পা এগিয়েই বিশাল একটা ধাক্কা খেলাম যেন।

আমার সামনে বিশাল দিগন্ত বিস্তৃত। পাহাড়ের পর পাহাড় সামনে, পাহাড় ছাড়া অন্য কিছু দেখবার জো নেই। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে আছি তেমনই একটা পাহাড়ের চূড়োয়, আর আমার নিচে ঝপ করে প্রায় খাড়া নেমে গেছে পাহাড়ের ঢাল। ঢালে বিশাল সব ঝোপ, উঁচু উঁচু গাছ, বাঁশের ঝাড়, সবই আছে যা কিছু থাকবার কথা, কিন্তু তবুও দেখতে পাচ্ছি, পায়ে চলার পথের ঠিক পাশেই ঝপ করে নেমে গেছে পাহাড়, বিশাল খাদ নিচে, বারোশো থেকে পনেরোশো ফুট নিচে ক্ষুদে কিছু গাছপালা আর পাথর দেখা যাচ্ছে। ঐ গাছগুলো আদপে ক্ষুদে নয়, অনেক ওপর থেকে তাকিয়ে আছি আমি।

আমি চলার পথের দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে একটা ঢোঁক গিললাম। পথটা পাহাড়ের ঢালের ওপর, অর্থাৎ, পথটাও একই রকম ঢালু, তাতে এবড়ো খেবড়ো সব নুড়ি, আর সাকুল্যে একটি মাত্র পা রাখার মতো চওড়া সেটি। পথের পাশে মুখ ব্যাদান করে আছে সেই দেড়হাজারফুটি খাদ। পপাত চ মমার চ।

আমি একজন অ্যাক্রোফোবিয়াক --- উচ্চতাকে দারুণ ভয় পাই আমি, তিনতলার ছাদে উঠেও রেলিঙের ধারে কাছে ঘেঁষি না। আপনিই বলুন, এ পরিস্থিতিতে আমার যদি তখন হাঁটুতে হাঁটুতে লেগে টরেটক্কা আওয়াজ উঠতো, দোষ কিছু হতো? --- কিন্ত না, হাঁটু আমার কাঁপেনি। আমি কোনমতে নিজের মনটাকে অন্য একটা ব্যাপারে স্থির করে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। খানিকটা গিয়ে বুকে কিছুটা বল ফিরে এলো। নাহ, বেশ এগোচ্ছি তো! কিন্তু একটা মোড় ঘুরে দেখি পথের ওপর আড়াআড়ি কাত হয়ে পড়ে আছে একটা ইয়া মোটা নাম-না-জানা কাঠের গাছ, তার ওপারে সশঙ্কিত চিত্তে দলের অগ্রবর্তীরা দাঁড়িয়ে, আর এ পারে আমি, ধনঞ্জয়দা আর পুতুল আপা।

মংক্ষিয়াদা আমাকে ঘোড়ার সওয়ারির মতো গাছের ওপর চেপে এক পা টপকে দিতে বললেন। এ ছাড়া ঐ গাছ টপকে যাবার কোন পথ নেই। বামে প্রাচীরের মতো পাহাড়, ডানে খাদ, পথের ওপর কোমর সমান উচ্চতায় ঝুঁকে পড়া গাছ। সময় নষ্ট না করে গাছটার ওপর চড়ে বসলাম। আর গাছটাও বজ্জাত কম নয়, ঘোড়ার মতোই নড়েচড়ে উঠলো সে, স্পষ্ট শব্দ শুনলাম, গোঁওওও! এখন যদি গাছটা পিছলে নিচে নেমে আসে, তার সওয়ারীও খানিকটা পিছলে পড়বে, প্রায় হাজার ফুট নিচে! ঢোঁক গিলে নিজের হৃৎপিন্ডটাকে আলজিভের ওপর থেকে সরিয়ে আবার নিচে ফেরত পাঠালাম, নিজের জায়গা ছেড়ে আঘাটায় উঠে এসে ধুকধুক করছিলো ব্যাটা। তারপর একটা পা বাড়িয়ে দিয়ে হেলে পড়তেই ডান পায়ের নিচে আবার শক্ত মাটি ফিরে পেলাম। পুতুল আপাও আমার মতোই বৃক্ষারূঢ় হয়েই এই পুলসিরাত পেরিয়ে এলেন। ধনঞ্জয়দাকে পেরোতে দেখলাম, অবলীলায় গাছটাকে ডিঙিয়ে এসে ধুপ করে পড়লেন তিনি। গাছটা আবারও একটা আপত্তির হ্রেষাধ্বনি তুললো, ভ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁ --- একটু নিচের দিকে নড়ে উঠলো, তারপর আবার সব চুপ। আবার অতি সন্তর্পণে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম সবাই। ইতিমধ্যে দলের আগুয়ান বাহিনী খানিকটা এগিয়ে গেছে, মংক্ষিয়াদা পুতুল আপাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছেন, আর পেছনে আমি, ধনঞ্জয় ত্রিপুরা, শাহেদ ভাই আর বরুণদা।

এই বিশ্রী পাহাড়ি পথে নামতে গিয়ে বার দুই পা পিছলে গিয়েছিলো, কপালের জোরে নিচে গিয়ে পড়িনি। তুলনামূলকভাবে নিরাপদ কোন জায়গা ঐ পথের ওপর নেই, সমস্ত পথটাই নেমেছে খাদের পাশ ধরে, যত নিচে নামছি, অন্ধকার ঝোপঝাড় এগিয়ে আসছে। হুঁশিয়ার হয়ে একটু ধীরে নামছিলাম, শাহেদ ভাই আমার মনে সাহস যোগানোর জন্যে বললেন, 'হিমু, আস্তে আস্তে হাঁটেন। ভয়ের কিছু নাই।'

আমিও নিজেকে প্রবোধ দিলাম, 'জি্ব শাহেদ ভাই, রাস্তাটা একটু ইয়ে, কিন্তু ভয়ের তেমন কিছু নাই।'

সহজ সরল ধনঞ্জয় ত্রিপুরা এই পথে হরদম আসাযাওয়া করেন, তিনি আমাদের এই মিথ্যাচারের পরম্পরা সহ্য করলেন না, বলে উঠলেন, 'না না, এতা খুব খালাপ লাস্তা --- গলু পলে গেলে মলে যায়।'

আমরা একটা বায়বীয় আশ্বাসে বলীয়ান হয়ে বোধকরি একটু জোরসে হাঁটা শুরু করেছিলাম, কিন্তু এমন নিদারুণ দুঃসংবাদ শুনে আমি থমকে দাঁড়ালাম। শাহেদ ভাই গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, 'কী? --- গরু?'

ধনঞ্জয় হাসিমুখে ইতিবাচকভাবে মাথা নাড়লেন।

শাহেদ ভাই বহুকষ্টে আমাকে সাইজে এনেছিলেন, তাঁর সব প্রচেষ্টা ঐ গরুর সাথেই মাঠে মারা গেলো, তিনি ডুকরে উঠলেন, 'গরু পড়বে কেন? য়্যাঁ? গরু পড়বে কেন এখানে?'

আমারও মনে তখন একই প্রশ্ন। গরু কি পড়ার আর জায়গা পেলো না? এমন সূচাগ্রমেদিনীতুল্য পথে বেড়াতে এসে পা পিছলে মরলো কেন সে? এ কি ফাজলামো নাকি?
ধনঞ্জয় তখন ঠিক পায়ের নিচে খাদের অপেক্ষাকৃত অন্ধকার অংশ দেখিয়ে জানালেন, কয়েকদিন আগে একটি গরু ওখানে পড়ে গিয়েছে, এবং পতনের যা অবশ্যম্ভাবী ফল, সেইটি লাভ করেছে। এসব জায়গায় পদস্খলনের শাস্তি বড় কড়া। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। প্রথমত, গরুটা পড়ে গিয়ে মারা গেছে। দ্বিতীয়ত, এখনই কেন আমাকে এই দুঃসংবাদটা পেতে হলো, যখন হাঁটু দু'টোকে বহুকষ্টে বাগে ধরে রাখা গেছে? তৃতীয়ত, আমার সাথে কি গরুর কোন সূক্ষ্ম তুলনা ফাঁদার চেষ্টা করছেন ধনঞ্জয়?
ওদিকে শাহেদ ভাই ক্ষেপে উঠলেন একদম, 'না না, এখানে গরু টরু পড়ে না! হিমু আপনি আস্তে আস্তে আগান তো ভাই!'

ধনঞ্জয় স্মিত হেসে চুপ করে গেলেন, আমি আরো সাবধান হয়ে পা টিপে টিপে নামতে লাগলাম। পড়ে মরা গরুর দলে শামিল হতে চাই না আমি। একটা কিছু ঘটে গেলে এই ধনঞ্জয়দা পরে বলে বেড়াবেন, এখানে দু'টো গরু পড়ে মারা গেছে!

এই পশ্চাদবর্তী দলের মধ্যে আমি যেহেতু এগিয়ে, তাই আমার বেগেই আস্তে আস্তে নামতে লাগলো সবাই। সেই গরুপতন পয়েন্ট পেরিয়ে আরো খানিকটা নেমে পথটা পাহাড়ের ভেতরে সেঁধিয়ে গেলো। খাদের কিনারা থেকে সরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা, চলার গতি কিছুটা বাড়লো। কয়েকটা জায়গায় বিশাল সব বোল্ডার বেয়ে নামতে গিয়ে একটু সময় লাগলেও, কোন অঘটন ঘটলো না। তবে বরুণদা কিছুদিন আগেই এ পথে এসেছিলেন, তখন এখানে তাঁর গাইড জুয়াম মদের ঝোঁক সামলাতে না পেরে পড়ে গিয়েছিলো। সে কারণে মাঝপথ থেকেই সেবার ফিরে যেতে হয়েছে বরুণদাকে, আর জুয়াম কিরে কেটে জানিয়েছে, এই পথে, যেখানে শুয়োরের মতো হামাগুড়ি দিয়ে চলাও নিরাপদ নয়, আর কখনো পা ফেলতে আসবে না সে।

আরো খানিকটা নেমে নিচের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো আমাদের। দূরে কিছু খাটো পাহাড়ের ওপর বিকেলের সূর্য আলো ঢালছে। আর আমাদের নিচে পাথুরে খাতের ওপর ঝিরঝির করে বয়ে চলছে প্রশস্ত একটি ধারা, তার দু'পাশে বিশাল দেয়ালের মতো পাহাড়, দু'তিনতলা উঁচু সব বোল্ডার ছড়িয়ে আছে এদিক সেদিক, তার ফাঁকে ফাঁকে পানির রঙ ইস্পাতের মতো নীল, হু হু করে বয়ে চলেছে। সেদিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলছে আমাদের আগুয়ান জনগণ।

পাহাড়ের অলিগলি দিয়ে বাকিটা পথ পেরিয়ে এসে দেখি জলের ধারে পাথরে হাসি হাসি মুখে বসে সবাই। বরুণদা একটা বোল্ডারের ওপর নবাব আলিবর্দি খানের মতো ভঙ্গি করে বসলেন, একটা ছবি তুলে দিলাম, আর সেই বিশাল বোল্ডারে ক্লাবের নামখানা টুকে রাখা হলো। তবে এই করাঙ্ক স্থাপনের গৌরব আমাদের একার নয়, এখানে যে এর আগেও ইংরিজি বর্ণজ্ঞানসম্পন্ন রসিক ব্যক্তিবর্গের পদার্পণ ঘটেছে, তারও প্রমাণ মিললো। বাকিরা ছবির ধার ধারলেন না, তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে গেলেন পানির দিকে। দলনেতা উচ্ছল এরই মধ্যে গোসল সেরে ফেলেছেন, বাকিরাও পুলকিত বদনে জুতো খুলে তীব্র পানির ধারায় পা মেলে রেখেছেন। বোঝা নামিয়ে রেখে আমিও সেই জলে নেমে পড়লাম। সেই ভোরবেলা থেকে হাঁটছি সবাই, এর মধ্যে আর জুতো খোলা হয়নি। মুখে মাথায় খানিকটা পানি ছিটিয়ে বরফশীতল পানিতে পা ডুবিয়ে বসে রইলাম, পানির স্রোত এত তীব্র যে মাসাজের কাজ হয়ে যায়।

পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আশপাশটা দেখে নিলাম। যে পাহাড়টা মাত্র টপকে নেমে এসেছি, তার দিকে তাকালে ঢোঁক গেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। খাড়া পাহাড়টা আমাদের দৃষ্টিসীমা থেকে আকাশকে মুছে দিয়েছে পুরোপুরি। চলার পথটা এই ছড়া ধরে খানিক এগিয়ে বাঁয়ের জঙ্গলে ঢুকে গেছে। মংক্ষিয়াদা জানালেন, আর মাত্র একটা পাহাড় ডিঙিয়ে গেলেই পুকুরপাড়ায় পৌঁছে যাবো আমরা।

ছড়ায় মিনিট দশেক বসে, পা দু'টোকে একটু সেবা দিয়ে আবার জুতো পরে নিলাম। বিকেলের আলো আস্তে আস্তে মরে আসছে, কিছুক্ষণ পরই ঝুপ করে আঁধার নেমে আসবে, তাই মংক্ষিয়াদা তাড়া দিলেন সবাইকে। খানিকটা পানি খেয়ে নিয়ে আবার যখন উঠলাম, ততক্ষণে সবাই এগিয়ে গেছে, শাহেদ ভাই একটু দূরে অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। এগিয়ে যাবার আগে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিলাম সেই খতরনাক পাহাড়টাকে। অন্ধকার, অটল।

খানিকটা এগোতে না এগোতেই ঘটলো বিপত্তি, ব্যাগের সাথে বাঁধা গোল করে পাকানো স্লিপিংব্যাগটা গড়গড়িয়ে খুলে গেলো। সেটাকে আবার ঠিকমতো বুঁজিয়ে শক্ত করে বাঁধতে গিয়ে নষ্ট হলো কয়েকটা মিনিট। শাহেদ ভাই জঙ্গলের ভেতর থেকে হাঁক ছেড়ে জানতে চাইলেন, কোন সমস্যা হলো কি না। জবাব দিতে যাবো, শুনতে পেলাম, মাথার ওপরে ঝোপে একটা ভারি খসখস শব্দ হলো। কী জন্তু কে জানে, তা দেখবার জন্যে আর অপেক্ষা করলাম না, দিলাম ঝেড়ে দৌড়, এক ছুটে একেবারে জঙ্গল পেরিয়ে আবার সেই পাথুরে খাতের ওপর। দূরে শাহেদ ভাই, বরুণদা আর মংক্ষিয়াদা বিড়ি টানতে টানতে অপেক্ষা করছেন আমার জন্যে।

ছড়ার ওপরে যে পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম আমরা, সেটা আগেরটার মতো ঘাতক চরিত্রের না হলেও বেশ খাড়া। ভেজা ভেজা, পিচ্ছিল মাটি, পাহাড়ের বেশির ভাগ অংশেই রোদ পড়ার সুযোগ নেই উঁচু উঁচু গাছের জন্যে। ক্ষণিকের জন্যে রোদেলা একটা অংশ পাওয়া গেলো পথে, তারপর আবার সেই স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার পথ। লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে চললাম আমরা। উচ্ছল ভাই, মিলন ভাই, সালেহীন, সৈকত আর চঞ্চল এগিয়ে গেছে বেশ খানিকটা, বাকিরা ধীরে ধীরে এগোচ্ছি।

আরো খানিকটা এগিয়ে শুরু হলো খাড়া পথ। তবে পা রাখার মতো যথেষ্ঠ জায়গা আছে এখানে। কিছুদূর গিয়ে দম নেয়ার জন্যে একটু থেমে নিলাম, একটানা অত খাড়া পথে চলা ভারি কষ্টসাধ্য কাজ। পুকুরপাড়ার এক বাসিন্দা ফিরছিলেন এই পথে, আমাদের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করে তিনি এগিয়ে গেলেন তরতর করে। ওদিকে বরুণদা আর মংক্ষিয়াদা এগিয়ে গেছেন খানিকটা।

সূর্যের আলো বিবর্জিত এই পাহাড়ের পিচ্ছিল আর ঢালু পথ বেয়ে বেয়ে এক জায়গায় এসে চোখে পড়লো জুম্ম চাষের প্রস্তুতির চিহ্ন। পাহাড়ের খাড়া ঢাল থেকে ঝোপঝাড় সব পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে, বিশাল এক গাছকে কেটে ফেলে দেয়া হয়েছে, একটা সাঁকোর মত দুই পাহাড়ের ঢালের ওপর পড়ে আছে সেটা, তার অনেক নিচে দেখা যাচ্ছে নিকষ অন্ধকার। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে গেলাম উৎফুল্ল মনে, কী ভাগ্য আমার যে এই সাঁকোর ওপর দিয়ে যেতে হচ্ছে না!

আরো খানিকটা এগিয়ে চোখে পড়লো একটা বদ্ধ ছড়া। জায়গাটা বাঁশ ঝাড়ের পাশে, পানি এখানে জমাট হয়ে আছে, কোন স্রোত নেই, ছোট ছোট বোল্ডার ছড়ানো, আর একটা গাছের গুঁড়িতে আমাদের অপেক্ষায় বসে বরুণদা আর মংক্ষিয়াদা। ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিলো, বরুণদার ব্যাগে চিঁড়াভাজার ওপর হামলা করলাম। বরুণদা মিটিমিটি হাসলেন, কারণ ক্লাবসভায় শুকনো খাবার হিসেবে চিঁড়ার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলাম আমি, আর সেই আমিই এখন হামলে পড়ে চিঁড়া খাচ্ছি সমানে। পুতুল আপাও ইতিমধ্যে চলে এসেছেন, কয়েকটা খেজুর দিয়ে আমাকে আপ্যায়ন করলেন তিনিও।

কিন্তু বেশিক্ষণ বসা গেলো না, জায়গাটা নিকষ অন্ধকার। কানের কাছে ভনভন শব্দ শুনে মশার ভয়ে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গেলাম আমরা। এবার পথ চলে গিয়েছে উঁচু ঘাসের ঝোপ আর বাঁশের ঝাড়ের মধ্য দিয়ে। মাটি এখানে শক্ত, দ্রুত পায়ে চলতে শুরু করলাম সবাই। একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার, গাছপালার জন্যে আলো ঢোকার কোন রাস্তা নেই, আর রাস্তা থাকলেও ঢোকার মতো আলো এখন নেই আকাশে। পথ শেষ হলো খাটো দেয়ালের মতো এক পাহাড়ের সারির গোড়ায়, ডানে বা বামে যতদূর চোখ যায়, দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে এই পাহাড়, এটিই বান্দরবান আর রাঙামাটি জেলার সীমানা। পাহাড়ের গোড়ায় কয়েকটা টং ঘর ছাড়া আর কিছু নেই, কিন্তু টেনিস কোর্টের মতো সমতল জায়গাটা।

খোলা আকাশের নিচে বেরিয়ে এসেছি আমরা, পেছনে ফেলে আসা সূর্যটাকে দেখাচ্ছে বড় একতাল সিঁদুরের মতো, আর আমাদের সামনে প্রসন্নমুখে ভেসে আছে ঝকমকে চাঁদ। এ দুয়ের আলোতে দেখে নিয়ে পাথুরে পথে এগোতে শুরু করলাম। বরুণদা আর শাহেদ ভাই আবারও এগিয়ে গেছেন, আর খানিকটা এগোলেই বান্দরবান পেরিয়ে রাঙামাটিতে পা দেবেন তাঁরা।

পাহাড় পেরোতেই পথ আবার ঢেকে গেলো ঘন ঝোপে। এবার আর টর্চ ছাড়া উপায় নেই, আর হিম পড়ে গেছে বেশ। ব্যাগ থেকে জ্যাকেট আর টর্চ বের করে এগিয়ে গেলাম। পুতুল আপা খানিকটা পিছিয়ে পড়েছিলেন, তিনিও এর মধ্যে চলে এসেছেন। আবার যখন খোলা জায়গায় বেরিয়ে এলাম, দূরে একজোড়া সিগারেটের আগুন চোখে পড়লো, বরুণদা আর শাহেদ ভাই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিচ্ছেন। চাঁদ এর মধ্যে আকাশে তার মৌরসি পাট্টা গেড়ে বসেছে। সেই হালকা আলোয় দূরে চোখে পড়ছে একটা ঝকঝকে হ্রদ, আর তাকে ঘিরে একটা গ্রাম। চারপাশে গম্ভীর অন্ধকার সব পাহাড়ের সারি, তার মাঝে গোটা জলাশয় যেন চাঁদের আলোয় জ্বলছে। এ দৃশ্যের জন্যে আরো দুটো পাহাড় টপকে যেতে রাজি আছি আমি।

কিন্তু আজকের মতো পাহাড় বেয়ে ওঠার কাজ আপাতত শেষ, এই পাহাড় বেয়ে নেমে গেলেই গ্রামে পৌঁছে যাবো আমরা। আর পাহাড় বেয়ে নামতে গিয়ে বোঝা গেলো, ঝামেলার এখন কিছুটা বাকি। খুবই ঝুরঝুরে মাটি, গোড়াতেই পা পিছলে গিয়ে প্রবল এক অভূতপূর্ব হোঁচট খেলাম, পুতুল আপা আঁতকে উঠে ঈশ্বরকে স্মরণ করলেন। হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে অভয় দিলাম সবাইকে, আছি, মরি নাই! লাঠিটা ছিলো বলে কয়েকশো ফিট নিচের অন্ধকারে পড়ার হাত থেকে রেহাই পেলাম, কিন্তু লাঠি বেচারা নিজে মচকে গিয়ে অচল হয়ে পড়লো।

কী আর করা, কোন মতে টর্চের আলোয় সেই বদখদ পথ পেরিয়ে খানিকটা সমতলে নেমে এলাম আমরা। বরুণদার কাছে রাতে মুরগি খাবো মুরগি খাবো বলে খানিকটা ঘ্যানর ঘ্যানর করে করার পর আশ্বাস পেলাম, রাতে মুরগি হবে। এক দফা ভালো খানা জুটবে, সেই উল্লাসে বাকিটা পথ যেন উড়ে পেরিয়ে এলাম। খানিকটা চড়াই খানিকটা উৎরাই ভেঙে গ্রামের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলাম, আধ ঘন্টা হাঁটার পর।

এখানে ঝোপঝাড়গুলো সেচের অভাবে ঠিক বাড়তে পারছে না, এই অজুহাতে একটা ঝোপের সামনে ছোটোবাইরের জন্যে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, বাকিরা এগিয়ে গেলো। হাতের কাজ সেরে নিয়ে একবার ফেলে আসা পাহাড়টাকে চাঁদের আলোয় দেখে নিলাম। আমার আকাশের অনেকখানি আড়াল করে নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে সে। মনে হলো চারদিকে পাহাড় আর ঘন জঙ্গল, মাথার ওপর প্রাচীন চাঁদ, আকাশে নক্ষত্রের নিজস্ব নকশা, এগুলো যুগ যুগ ধরে যেন সঙ্গ দিয়ে আসছে আমাকে, যেন আমি এদেরই স্বজন।

একটা শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলাম। গ্রামে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়লো বিরাট সব গয়াল আর প্রকান্ড আকৃতির শূকর, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে সব, আমাদের দেখে গাঁক গাঁক করে অভ্যর্থনা জানালো তারা। খোঁড়াতে খোঁড়াতে কারবারির কুটিরের দিকে এগিয়ে গেলাম, কাছে যেতেই পরিচিত কন্ঠের কলরব কানে এলো। ব্যাগ আর জুতো খুলে কোনমতে টলতে টলতে কুটিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, সালেহীন বত্রিশ দাঁত বার করে বরণ করে নিলো আমাদের।


তিন: পুকুরপাড়া

পুকুরপাড়া গ্রামটা ত্রিপুরা অধু্যষিত, কিন্তু কারবারির ঘরটা আর দশটা পাহাড়ি কুটিরের মতোই, অন্তত আমার কাঁচা চোখে কোন পাকা পার্থক্য চোখে পড়লো না। কুটিরের প্রথমেই খানিকটা বারান্দা, সেখানে জুতোজোড়াকে সমর্পণ করে ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে ঢুকে প্রথমে যে ঘরটা পড়ে, সেখানে একটা তাঁত বসানো। সে ঘরেরই এককোণে ডাঁই হয়ে পড়ে আছে আমাদের কলম্বুষ সদস্যদের ব্যাগগুলো। আমার ঘুমকম্বলটাকে খুলে নিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকলাম। মোমবাতি জ্বলছে কয়েকটা, আবছা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন কৌতূহলী গ্রামবাসীর পাশে আমাদের কয়েকজন বসে। গ্রামবাসীদের মাঝে চেনা মুখ দু'জনের, ধনঞ্জয় ত্রিপুরা, আর দেবাশিস, যাঁর সাথে সন্ধ্যের আগে পাহাড়ে মুলাকাৎ হয়েছিলো। গুজগুজ আলাপ চলছে গ্রামবাসীদের মধ্যে। আমি ঘরে ঢুকেই এক কোণে স্লিপিংব্যাগ বিছিয়ে বসলাম। উচ্ছল ভাইয়ের কাছ থেকে ব্যথার মলমটা চেয়ে নিয়ে, টর্চে নতুন ব্যাটারি ভরে নিয়ে লেগে পড়লাম নিজের পদসেবায়। উপস্থিত শিশুরা দেখলাম আমার স্কন্ধোত্তর চুল আর মোচদাড়ি দেখে বিমল আমোদিত হলো, নিজেদের ভাষায় যে কিচিরমিচির তারা জুড়ে দিলো, তার সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে, 'দ্যাখ কী আজব চিড়িয়া এসে জুটেছে।'

খানিকটা ধাতস্থ হবার পর আশপাশে চোখ বুলিয়ে দেখি, মিলন ভাইও আমার পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন, ঘুমকম্বলের ওপর চিৎপাৎ হয়ে পড়ে আছেন তিনি। সালেহীন আর উচ্ছল ভাই তুলনামূলকভাবে চাঙা, আর চঞ্চল তো কথাই নেই, তাৎক্ষণিক কফির মগে রসিয়ে রসিয়ে চুমুক মারছে সে, আর খামাখাই আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই জালেম দুনিয়ার বে-ইনসাফির দুঃখ ভোলার জন্যে সালেহীনের বিস্কুটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বসলাম। পুতুল আপা আশ্রয় নিলেন অন্দরমহলে, কুটিরের ভেতরের দিকের ঘরে। মিলন ভাইয়ের সৌজন্যে মুরগির ইনস্ট্যান্ট সু্যপের কয়েকটা প্যাকেট গরম পানি সহযোগে বিতরিত হলো, সারাদিন হাঁটাহাঁটির পর সেই নোনতা তরল চোঁচোঁ করে গিলে নিলাম সবাই।

ওদিকে মংক্ষিয়াদা দেবাশিসের সাথে আলাপ করে জানালেন, আমাদের খবর শুনে বেশ বিস্মিত হয়েছে গ্রামের লোকেরা। আমরা কেন সেই গরুমারা পাহাড় ডিঙিয়ে এখানে এসেছি, তা বুঝতে পারছে না তারা। সেনাবাহিনীর লোকও নাকি বিপজ্জনক বলে গত তিন বছর ধরে ঐ পথ মাড়ায় না। পুকুরপাড়ায় সেনাছাউনি রয়েছে, তাদের যাতায়াতের জন্যে রুমা থেকে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক একটা পথ তৈরি করা হয়েছে। সেই পথ কিঞ্চিৎ দীর্ঘতর, কিন্তু সে পথে গরু পড়ে মরে যায় না। আর নিতান্ত ঠ্যাকায় না পড়লে আমাদের টপকে আসা পথ পাহাড়িরাও ব্যবহার করে না।

এমন একটা সংবাদের জন্যেই বোধহয় অপেক্ষা করছিলাম। জিতা রহো দেবাশিস! আমি গলা খাঁকরে ভ্যানর ভ্যানর শুরু করলাম, ঐ গরুমারা পাহাড় ডিঙিয়ে রুমায় ফিরতে আমি চাই না, একটা বিকল্প পথের আলামত যখন পাওয়া গেছে, সেটাই বাজিয়ে দেখা যাক, নতুন পথের সন্ধানেই তো আমরা দিগ্বিদিক ছুটে চলেছি --- ইত্যাদি। আর সবচে' বড় কথা হচ্ছে, এই বিকল্প পথে গরু পড়ে গিয়ে মরে যায় না, আর কী চাই? দলনেতা কী বলেন?

আমার প্রস্তাবের কড়া সমর্থন পাওয়া গেলো মিলন ভাইয়ের কাছ থেকে। বেচারার দুই পায়ের পেশীতেই মারাত্মক টান ধরেছে, পথের মাঝখানে এক জায়গায় তো প্রাণসংশয় দেখা দিয়েছিলো তাঁর। যে কোন বিকল্প পথেই তিনি যেতে রাজি, কিন্তু ঐ গরুমারা পাহাড়ে আর নয়! মিলন ভাইয়ের সমর্থনে, ইংরেজিতে যাকে বলে ডোমিনো এফেক্ট, পড়লো সবার ওপর, নতুন পথের পক্ষে উলু দিয়ে উঠলো বাকিরা। এর পরে নতুন আলোচ্য বিষয় হলো, পরদিন ভোরে আমরা কী করবো? এই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে সবার টনক নড়লো, তাই তো, স্রেফ পুকুরপাড়াই তো দেখতে আসিনি আমরা, এসেছি পুকুরপাড়ায় রাইনক্ষ্যং নদীর প্রপাত দেখতে। প্রসঙ্গ উঠতেই মংক্ষিয়াদা ভারি আপ্লুত হয়ে সেই প্রপাতের সৌন্দর্যকীর্তন করলেন কিছুক্ষণ। খানিক আলাপসালাপের পর পরদিন কাকভোরে, অর্থাৎ কাকও যখন পাশ ফিরে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমোয়, সেই ব্রাহ্ম মূহুর্তেই প্রপাততীর্থযাত্রা ঠিক হলো। জানা গেলো, পুকুরপাড়া থেকে আধঘন্টা হাঁটাপথ পেরোলেই সেই প্রপাতের দেখা মিলবে। তবে, পাহাড়িদের আধঘন্টার ওপর ভরসা নেই আমার, মনে মনে সেটাকে সাড়ে তিন দিয়ে গুণ করে নিলাম।

আমাদের বিতর্কের ফাঁকে মংক্ষিয়াদা ইতিমধ্যে মুরগি ম্যানেজ করে ফেলেছেন, পাশের রান্নাঘর থেকে একটা দারুণ ঘ্রাণ ঘরময় কুচকাওয়াজ করে বেড়াচ্ছে। জিভের জলোচ্ছ্বাসকে কোনমতে সামলে খানিকটা সময় ঝিমিয়ে কাটালাম। ওদিকে বরুণদা, উচ্ছল ভাই আর চঞ্চল রান্নার কাজে মংক্ষিয়াদাকে সহযোগিতা করার জন্যে বসে গেছেন। সারাটা পথ সঙ্গ দেয়ার জন্যে আর ব্যাগ বহন করার জন্যে ধনঞ্জয় ত্রিপুরাকে ধন্যবাদ আর উপহারসহ বিদায় জানিয়েছেন পুতুল আপা।

রাতের খাবারের গুণবর্ণনা করে আর কাজ নেই, সবার চেয়ে সেরা আচার হচ্ছে ক্ষিদে। হুমহাম করে পাহাড়ি মুরগি ভুনা আর ডাল দিয়ে পাহাড়িদের লালরঙা ভাত খেয়ে নিলাম সবাই। খেতে বসে ভাবলাম, কয়েক ঘন্টা আগেও এক বিঘত সরু পথের ওপর প্রাণটা হাতে করে হেঁটেছি, হোঁচট খেয়ে খাদের মুখে ছিটকে পড়েছি, পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে থাকা শিকড় ধরে ঝুলে ঝুলে এগিয়েছি --- এগুলো কি সত্যিই ঘটেছে, নাকি সব তন্দ্রার ঘোরে দেখা স্বপ্ন রে বাপ?

খাওয়াদাওয়ার আগেই কারবারির সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এখন মশা নেই, কাজেই নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারবো আমরা। তবুও সাবধানের মার নেই, খাওয়াদাওয়ার পর বীর চঞ্চল তার অ্যারোসলের শিশি বের করে ঘরময় কিছুক্ষণ দাপাদাপি করলো। তারপর আলো নিবিয়ে নিদ্রাসায়রে ডুব দিলাম সবাই। অন্তত ডোবার চেষ্টা করলাম। ঘরের দরজা জানালা যদিও ভেজানো, বাঁশের মাদুরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে মাঘের হিম বাতাস তুলোটে জ্যাকেট, পুরু স্লিপিং ব্যাগের ঠুনকো বাধা ডিঙিয়ে একেবারে হাড়ে গিয়ে নক করছে। নকের শব্দও যেন দাঁতে শুনলাম, খটাখট খটাখট ---। হাঁটার ক্লান্তি যে সবাইকে গ্রাস করেছে, বুঝতে পারলাম একটি পূর্বাশঙ্কিত শব্দের অভাবে, সবার নাকই জাতির বিবেকের মতো নিশ্চুপ।

দুয়েক ঘন্টার জন্যে বোধহয় ঘুমটা লেগে এসেছিলো, কিন্তু স্বপ্ন দেখার ফুরসত মিললো না। ফিসফাস খুটখাট শুনে যখন ঘুম ভাঙলো, তখন সোয়া পাঁচটা বাজে। প্রথমটায় জেগে গিয়ে ভাবলাম, জাগিনি, ঘুমিয়েই আছি, ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছি যে আমি জেগে উঠেছি --- কিন্তু বারান্দায় ধুপধাপ শুরু হতেই বুঝলাম, না দেখা দুঃস্বপ্নই সত্যি হয়েছে। কী আর করা, কোনমতে উঠে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালাম, আজ চঞ্চলের চপ্পল জোড়া হাইজ্যাক করে এগিয়ে গেলাম খানিকটা দূরে। আকাশে চাঁদ বত্রিশ দাঁত বার করে হাসছে, তারাগুলোও খুব তাল দিচ্ছে তার সাথে, কিন্তু এ আকাশ শেষ রাতের আকাশ, একটু পরই চারদিক ফসর্া হয়ে যাবে। তাড়াহুড়ো করে আসল কাজ সেরে দাঁত মেজে নিলাম। তবে আজ আর পরিবেশ দূষণ নিয়ে অনুশোচনা হচ্ছে না, পুকুরপাড়ার শূকরবাহিনীই সব জঞ্জাল সাফ করে দেবে।

ক্যামেরা বার করে, জঙ্গলদল জুতো পায়ে দিয়ে সবাই যখন তৈরি, তখন পৌনে ছ'টা বাজে। আকাশ ফর্সা প্রায়, গ্রামও আস্তে আস্তে জেগে উঠছে। প্রধান চত্বরে বিরাট এক আগুন জ্বলছে, তাকে ঘিরে নানা বয়সের শিশু, এক বিঘৎ হাঁ করে আমাদের দেখছে সবাই। আমাদের চালচলন নিঃসন্দেহে ভীষণ উদ্ভট ঠেকছে এদের কাছে। তাদের হাসিমুখের কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে সবাই এগিয়ে গেলাম পূর্বোদ্দিষ্ট নদীপ্রপাতের পথে।

প্রপাতের দিকে যাবার পথ হ্রদের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে। চারদিকে কুয়াশার আস্তর, ফসলের মাঠে একটা নিঃসঙ্গ ন্যাড়া গাছকে কেবল দেখা যাচ্ছে, বাকি সব আড়ালে। একটা পাথরের মই বেয়ে নিচে নেমে সেই মাঠের ভেতর আড়াআড়ি চললাম সবাই। মাঠের বেশির ভাগ অংশেই কাদা, তার ওপর বাঁশ ফেলে কিছুটা গম্য করা হয়েছে। ছবি তুলতে তুলতে হঠাৎ হুঁশ হলো, বাকিরা এগিয়ে গেছে খানিকটা, আমি আর পুতুল আপা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি। হ্রদের তীরে এসে আরো পিছিয়ে পড়লাম আমি, কারণ এই অপূর্ব দৃশ্যকে মনের ক্যামেরা আর হাতের ক্যামেরায় তুলবার জন্যে খানিকটা সময় চাই। সূর্য ঢাকা পড়েছে কুয়াশায়, হ্রদের ওপর ভিখিরির কম্বলের মতো ছড়িয়ে আছে কুয়াশা, এখানে ওখানে ছেঁড়া ফাটা দিয়ে চোখে পড়ছে কাকচক্ষু জল। হ্রদের তীরে কয়েকটি ধূসর গাছ রুখে দাঁড়িয়েছে, কিছুদূরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে সব কুটির, তার মাঝের পথে জড়ো হওয়া শিশুদের মাঝে ইতিমধ্যে সাড়া পড়ে গেছে, অর্থাৎ বাকিরা এগিয়ে গেছে সে পথে। পুতুল আপাও এর মধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছেন। বাচ্চাদের দঙ্গলে খানিকটা সময় কাটিয়ে জ্যাকেট খুলে কোমরে জড়িয়ে নিয়ে খানিকটা জোর পায়ে হাঁটা দিলাম।

মাটির রঙ লাল, দু'পাশে ঘাসের ঝোপের উচ্চতা আস্তে আস্তে বাড়ছে। ঘাসের ঝোপে থেকে থেকেই সরসর শব্দ হচ্ছে --- উঁহু, সাপ বা সজারু নয়, ক্ষুদে ক্ষুদে ধূসর পাখি লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। পথ মাঝে মাঝে দু'তিন দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মাটিতে জুতোর ছাপ দেখে চিনে নেয়া যাচ্ছে সহজেই। তাছাড়া চঞ্চলের কাছে চক আছে, মাটিতে তীর এঁকে দিক দেখিয়ে গেছে সে।

পথ আস্তে আস্তে সমতল ছেড়ে উঁচুনিচু হচ্ছে। পাশে ঘাসের ঝোপও ঘন হচ্ছে পাল্লা দিয়ে। গলা ছেড়ে ডাক দিয়ে বহু দূর থেকে পুতুল আপার জবাব পেলাম। আধঘন্টা পার হয়ে গেছে পনেরো মিনিট আগে, পথ ফুরোচ্ছে না, ফুরোতে আরো আধ ঘন্টা লাগবে, তা-ও বুঝতে পারছি। হঠাৎ হঠাৎ ঘাস পাতলা হয়ে গিয়ে হ্রদটা চোখে পড়ছে, নতুন সূর্যের রোদ যেন অলঙ্কার হয়ে ফুটে আছে তার জলে। একটা বাঁকে পৌঁছে চোখে পড়লো রাইনক্ষ্যং নদীর আঁকাবাঁকা সরু সর্পিল শরীরটা, সূর্যের আলো এসে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে বলে ছবি তুলতে পারলাম না। এ নদীর ছবি তুলতে হবে অন্য পারে দাঁড়িয়ে, নয়তো সূর্যাস্তের সময়। কিন্তু দু'পাশের ঘন সবুজকে চিরে বয়ে যাওয়া এ নদীর রূপ ভোলার নয়।

এদিকে পথের পাশে ঘাসের ঝোপ ফুরিয়ে গিয়ে যখন কাঁটাঝোপ শুরু হলো, তখন মেজাজের সূর্যটাও ভাবের কুয়াশা কেটে আস্তে আস্তে চড়তে শুরু করলো। এদিকে পথ পুরোদস্তুর জঙ্গলে ঢুকে গেছে। পাথুরে মাটির দু'পাশে ছোট বড় সব গাছ, শিশিরে রোদ পড়ে ঘাসের চাদরে হাজারটা ক্ষুদে সূর্য দেখা যাচ্ছে।

একটা পাথরের তোরণ, আর তার সামনে কাত হয়ে পড়ে থাকা গাছের নিচ দিয়ে এগিয়ে যেতেই কথাবার্তা কানে এলো। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে একটা তিনতলা টিলা ডিঙোতেই দৃশ্যটা চোখে পড়লো।

পাহাড় আর অরণ্যের জন্য এই ভোরে নদীর এই অংশ আঁধারে ছেয়ে আছে। সালেহীন আর চঞ্চল তীরে দাঁড়িয়ে, উচ্ছল ভাই আর মিলন ভাই ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় নিচ্ছেন, সৈকত হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে, বাকিদের চোখে পড়ছে না। তীরের কাছে পানির গভীরতা হাঁটু ছাড়িয়ে --- সৈকতের হাঁটু একটু উচুতে --- গজ ত্রিশেক দূরে গম্ভীর প্রতিধ্বনি তুলে ধাপে ধাপে বয়ে চলছে রাইনক্ষ্যং নদীর জল। মূল প্রপাত বাঁয়ে আরো প্রায় আধ কিলোমিটার, সেখানে পৌঁছুতে হলে ডাঙার ওপর দিয়ে এগোনোর কোন পথ নেই, যেতে হবে নদীর এই অতি পিচ্ছিল পাথুরে খাত ধরে। ডানে বামে যতদূর পর্যন্ত চোখ যায়, সূর্য চোখে পড়ছে না, বিষন্ন অন্ধকারে বুকফাটা শব্দে পাতালের লেলে নদীর মতো ছুটে চলছে স্রোত। কে জানে, হয়তো এর খানিকটা পান করলে আমরাও আমাদের অতীতবিস্মৃত হবো --- চঞ্চল ব্যাটাকে একটু গিলিয়ে দিয়ে দেখবো নাকি?
উচ্ছল ভাইয়ের কাছ থেকে জানা গেলো, বরুণদা, শাহেদ ভাই আর মংক্ষিয়াদা নদীর উজান ধরে এগিয়ে গেছেন, সৈকত তাঁদের পিছু পিছু চলছে, আর কোমর পানি ভেঙে এগিয়ে কোন দুর্ঘটনায় পড়তে বাকিরা কেউ রাজি নয়। এই তথ্য জানিয়ে উল্টোদিকে হাঁটা ধরলেন তাঁরা। কথা সত্য, নদীর পিচ্ছিল খাতে পড়ে গিয়ে যদি কারো পায়ে আঘাত লাগে, কপালে কঠিন দুঃখ আছে, অন্যের কোলে চ্যাংদোলা হওয়া ছাড়া গতি নেই।

চঞ্চল চরম বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে। জায়গাটা এত বিচ্ছিরি আঁধারে, যে ভালো ছবি তোলাও মুশকিল। পুতুল আপা একবার পানিতে নেমে পড়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন, আবার দাঁড়িয়ে পড়ছেন। ওদিকে সৈকত হাঁচোড়পাঁচোড় করে এগিয়ে গেছে। আমি অবশ্য এই ঝুঁকি নিতে নারাজ, প্রপাতের একেবারে গোড়ায় না গেলেও আমার ক্ষতি নেই, এখান থেকে যতটুকু দেখার আমি দেখে নিয়েছি। কী আর করা, হতোদ্যম চঞ্চল আর আমার একটা ছবি তুলে দিতে বললাম সালেহীনকে।

বেশ কিছুক্ষণ পর বাকি চারজন ফিরে এলেন, সবার মুখ হাসি হাসি, প্যান্ট গোটানো, ঊরু পর্যন্ত জলের দাগ। ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা। বরুণদার ক্যামেরায় কয়েকটা ছবি তোলা হয়েছে, ঢাকায় ফিরে সেগুলো দেখতে হবে আর কি। নদীপ্রপাতকে কাছ থেকে খুঁটিয়ে না দেখতে পারার বিষাদে ফেরার পথে সবাই খানিকটা গজগজ করলাম। আঙুর ফল তো টকই হয়।

আবারও সেই উঁচুনিচু, কাঁটাঝোপে ভরা পথ পেরিয়ে ফিরে এলাম খানিকটা খোলা জায়গায়। সূর্য অনেকখানি তেজ নিয়ে জ্বলছে এখন, চারদিক আলোয় ভেসে যাচ্ছে। দিনের আলোয় হ্রদ আর তার চারপাশে ঘিরে থাকা পাহাড়গুলোকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। মেঘশুন্য আকাশের নিচে মিষ্টি সবুজ ঘিরে আছে গ্রামটাকে।

ফেরার পথে সেই ঝোপের পাখিগুলোকে চোখে পড়লো আবারও, মহাব্যস্ত তারা। গ্রামবাসীরাও বেরিয়ে এসেছে তাদের ঝুড়ি-কাস্তে হাতে। খানিকটা দূরে তাদের জুম্ম চাষের ক্ষেত। আমাদের ফিরতে দেখে কলস্বরে কিছু একটা বললেন তাঁরা, ভাষার প্রাচীর ডিঙিয়ে সে বক্তব্য আমাদের মর্মে পৌঁছুলো না। তবে আমাদের সহাস্য নমস্কার তাঁরা একই উচ্ছ্বাস নিয়ে ফিরিয়ে দিলেন।

ফেরার পথে ছবি তুলতে তুলতে এগিয়ে গেলাম। আমার ক্যামেরায় গেঁথে রইলো গ্রামবাসীদের ঘর, হ্রদ আর আকাশের মাঝে ছড়িয়ে থাকা গ্রাম, পাহাড়ের ঢালে পিঠে বোঝাভর্তি ঝুড়ি নিয়ে ত্রিপুরা রমণী ---।

ক্ষেতে সেচের জন্যে বাঁশের পাইপে চালিত পরিষ্কার মিষ্টি পানি পেটভরে খেয়ে হেলেদুলে আমরা যখন আবার কারবারির কুটিরে ফিরে এলাম, তখন বেলা পৌনে দশটা বাজে। গ্রাম ছেড়ে বেরোনোর আগে গত রাতের উদ্বৃত্ত ডালভাতমুরগি দিয়ে যতটা সম্ভব পেট বোঝাই করে খেয়ে নিলাম সবাই। জিনিসপত্র গোছগাছ করার সময় দেখি, উচ্ছল ভাই আমাদের গৃহকত্রর্ীর কাছ থেকে একটা শুকনো লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো ফ্লাস্ক কিনে নিয়েছেন, সেটা তাঁর পিঠ থেকে ঝুলছে বাঁদরশিশুর মতো।

সব কিছু বেঁধেছেঁদে, কারবারির পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সবাই, সাড়ে দশটা বেজে গেছে ততক্ষণে। দিন এখন প্রাপ্তবয়স্ক।

পাড়া ছেড়ে যাবার আগে সেনাছাউনিতে রিপোর্ট করে যেতে হবে। আস্কন্দিত গতিতে সেদিকে হাঁটা শুরু করলাম, ক্যাম্পের প্রবেশপথ আমাদের পথেই পড়বে। যথারীতি দলের ফ্রন্টে সেই পাঁচজন এগিয়ে --- উচ্ছল ভাই, মিলন ভাই, চঞ্চল, সৈকত আর সালেহীন। পুতুল আপা একটু পিছিয়ে পড়েছেন, দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে আমার আর পুতুল আপারই হাঁটা শ্লথ হয়ে গেছে, তবে আমি বরাবরই শ্লথ, কিন্তু পুতুল আপা দুর্দান্ত হাঁটারু।

বেশিদূর যেতে হলো না, গ্রামবাসী আগেই খবর পৌঁছে দিয়েছিলো ক্যাম্পে, সান্ত্রীকে দুয়েক কথায় সব বুঝিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা, সে শুধু আমাদের মাথা গুণে রাখলো। যাত্রার আগে ক্যাম্পের ক্যান্টিনে চা খাওয়ার একটা প্রস্তাব উঠেছিলো, কিন্তু সেটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে গটগটিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। সেনা ছাউনির চারপাশে সতর্ক প্রহরায় দাঁড়িয়ে সশস্ত্র সৈনিকেরা গম্ভীর মুখে আমাদের খুঁটিয়ে দেখলো, কিছু বললো না। সেনা ছাউনির সৌজন্যে পথ এখন প্রশস্ত, কখনো চড়াই কখনো উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে নীল আকাশের নিচে।

পুকুরপাড়ার কারবারি জানিয়েছেন, একটু জোর পায়ে ঘন্টা দুয়েক হাঁটলে বড়থলি নামের একটা ত্রিপুরা জনপদে পৌঁছুবো আমরা। সেখান থেকে আরো ঘন্টা দুয়েক হাঁটলে প্রাংশা নামের আরেকটা ত্রিপুরা গ্রামে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করা যেতে পারে। সেই প্রাংশা থেকে ঘন্টা তিনেক হাঁটলে রুমাবাজারে পৌঁছে যাবো আমরা। খুব একটা আশাপ্রদ সংবাদ নয় এটি, বিশেষ করে পাহাড়িদের ঘন্টাকে বাঙালি ঘন্টায় রূপান্তরিত করতে হলে যখন সাড়ে তিন দিয়ে গুণ করতে হয়। মংক্ষিয়াদা জানিয়েছেন, সন্ধ্যের মধ্যে প্রাংশায় পৌঁছুতে পারলেই আজকের দিনের জন্যে যথেষ্ঠ অগ্রগতি হয়েছে বলে ধরে নেয়া যাবে। কাজেই আমাদের চলার লক্ষ্য হচ্ছে প্রাংশা, ভায়া বড়থলি। বড়থলিতে হাট আছে, সেনাছাউনি আছে, সেখানে কিঞ্চিৎ জলযোগ করা যেতে পারে।

সেনাসদস্যদের যাতায়াতের সুবিধার জন্যে পথ তৈরি হয়েছে এ অঞ্চলে, যার ফলে পাহাড়ের প্রান্ত ধরে গুটিগুটি পায়ে এগোনোর হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। রোদ খানিকটা চড়ে গেছে, বেশ জোর পায়ে হাঁটতে লাগলাম। বরুণদা, শাহেদ ভাই, পুতুল আপা আর মংক্ষিয়াদা আমার পেছনে। ঢালু পথে গতি আপনাআপনি বেড়ে যায়, কিন্তু পায়ের গোড়ালি আর তালুতে ফোস্কা পড়ে গেছে বলে নামার সময় একটু লাগছে। চোখ কান বুঁজে কয়েকটা ঢাল টপকে নেমে দেখি, পথের মোড়ে একটা টংঘর, তার পাশে খড়ের গাদা, সেখানে নবাবের মতো আধশোয়া হয়ে দলের অগ্রার্ধ, যেন তাকিয়ায় শুয়ে বাঈজীর নাচ দেখছে জমিদার, জমিতেই যখন আশ্রয় নেয়া তখন কিছুটা জমিদারি করে নেয়াই শ্রেয়। তেড়ে ফুঁড়ে এগিয়ে গিয়ে তাদের পাশে বসলাম ধপ করে। রোদ আজ বেশ চড়া, খানিকটা হেঁটেই পিপাসা পেয়ে গেছে। পানির বোতলটা বের করে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে সৈকতের সাথে কিছুক্ষণ গুলতানি মারলাম, কারণ বাকিরা এর মধ্যে আবার উঠে হাঁটা শুরু করেছে। দলের মধ্যে আমি, সৈকত আর সালেহীনই ছাত্র, আমার ছাত্রত্ব চুকিয়ে দেবার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে এক হপ্তা আগে, সালেহীনের পরীক্ষাও শেষ, আর সৈকতের পরীক্ষা মাসখানেক ধরে চলছে, ঈদ উপলক্ষে লম্বাচওড়া ছুটি পেয়েছে বলেই বেরিয়ে পড়েছে সে। সৈকত মৃত্তিকাবিজ্ঞানের ছাত্র, সমপ্রতি ঠেসে অণুজীববিদ্যা পড়তে হচ্ছে বেচারাকে। সদ্যলব্ধ জ্ঞানের আলোকে সে জানালো, এবার প্রচুর ধূলোবালি ছানাছানি করতে হচ্ছে আমাদের, ঢাকায় গিয়েই কষে কৃমির ঔষধ খেতে হবে। মাটিতে যেসব জীবাণু রয়েছে, বিশ মিনিট সাবান পানিতে হাত ধুলে নাকি তার পঞ্চাশ শতাংশ দূর হয়, কাজেই আমাদের কপালে কঠিন খারাবি আছে।

জীবাণুশঙ্কিত মন নিয়ে আবার উঠে পড়লাম, দলের পেছনের অংশ বেশ জোর পায়ে এগিয়ে আসছেন। আজ আমরা চলছি একেবারে ঊষর প্রান্ত দিয়ে, যতদূর চোখ যায়, গাছপালা খুব একটা নেই, লালচে পাহাড়ের সারি চারদিকে, মাঝে মাঝে কয়েকটা বিবাগী গাছ চোখে পড়ছে। আকাশে এক চিলতে মেঘেরও দেখা নেই, চারদিকে ঝকঝকে রোদ, এমন নির্মেঘ আকাশ ঢাকায় চোখে পড়ে না। তবে আকাশের এই সৌন্দর্য উপভোগের মাশুল দিতে হচ্ছে রোদে ভাজাভাজা হয়ে।

চলতে চলতে একসময় প্রশস্ত পথ ফুরিয়ে এলো, হঠাৎ এক গিরিসঙ্কটে ঢুকে পড়লো সেটা। পাথরের শঙ্খপাক সিঁড়ি বেয়ে একটা ছড়ার ওপর নেমে এলাম, বিচিত্র আকার ও আকৃতির সব পাথর ছড়িয়ে আছে সেখানে। পানির বোতল হালকা হয়ে এসেছে, সেটাকে ভর্তি করে নেয়ার পাশাপাশি মুখেও একটু পানি ছিটানো গেলো। ছড়ার পানি সবসময় বরফশীতল, অদ্ভুত এক সঞ্জীবনী শক্তি আছে এর। মিনিট পাঁচেক বিশ্রাম নিয়ে আবারও এগিয়ে চললাম আমরা। নিস্ফলা মাঠের ভেতর দিয়ে চলছি, চারদিকে পাহাড়ের প্রহরা, মাঝখানে এক ধু ধু মাঠ, পথটা এগিয়ে গেছে দূরের পাহাড়ের দিকে। সেই পাহাড়ের গোড়ায় এসে আবার ক্যামেরা বার করলাম, এই রুক্ষ দেশে মাথা উঁচু করে একা দাঁড়িয়ে এক বিদ্রোহী বৃক্ষ, তার স্মৃতি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই।

দলের অন্যেরা ততক্ষণে এগিয়ে গেছে, তাদের পিছু পিছু এগিয়ে টের পেলাম, নতুন জ্বালাতন শুরু হয়েছে। খুব একটা খাড়া নয় এখানকার পাহাড়, কিন্তু পথের মাটি ভয়াবহ ঝুরঝুরে, পা বসতে চায় না, হড়হড়িয়ে পিছলে যায়। এদিকে চঞ্চল আমার দেরি দেখে একটা দড়ি ছুঁড়ে দিয়েছে। হাঁচড়ে পাঁচড়ে সেই বামন পাহাড় টপকে ওপরে উঠে মনটা দমে গেলো। সমতলের পালা শেষ, চোখের সামনে যতটুকু দেখতে পাচ্ছি, পথ চলে গেছে উঁচু উঁচু পাহাড়ের চড়াই বেয়ে।

আরো খানিকটা এগিয়ে একটা টংঘর পাওয়া গেলো, সেখানে দলের দুয়েকজন বসে, বাকিরা খানিক বিশ্রাম নিয়ে আরো এগিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ সেখানে বসে থেকে মংক্ষিয়াদার দেখা মিললো, তিনি জানালেন, শাহেদ ভাই আর পুতুল আপার এসে পড়বেন এক্ষুণি। ওঁদের জন্যে চকলেট রেখে আমি আবারও হাঁটা ধরলাম, পথ এবার শক্ত মাটির ধাপ ধরে এগিয়ে গেছে।

আধঘন্টা হাঁটার পর পাহাড় থেকে নিচে নেমে এলাম। পথের ওপর কয়েকটা গয়াল চরে বেড়াচ্ছে, আমাকে সন্দিগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ দেখে নিয়ে ঢাল বেয়ে তেঁড়েফুঁড়ে চলে গেলো সে। কেওকারাডঙে যাবার পথে বিশাল আকৃতির সব গয়াল দেখেছিলাম, পুকুরপাড়ার গয়ালগুলো অতটা বড়সড় নয়। স্বভাবে হিংস্র না হলেও গয়ালগুলো মাঝে মাঝে খামোকাই তেড়ে আসে, তাদের নিবৃত্ত করা খুব সহজ কাজ নয়।

বাঁশের ঝাড় চারপাশে, মিষ্টি একটা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আরো খানিকটা এগিয়ে একটা ছড়ার দেখা পাওয়া গেলো, সেই ছড়ার পাশে একটা পাথরে বসে আছেন বরুণদা, উচ্ছল ভাইয়ের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে সামনে কোথাও। আমি ব্যাগ নামিয়ে বসতে না বসতেই মংক্ষিয়াদা, শাহেদ ভাই আর পুতুল আপা চলে এলেন। মুখে একটু পানি ছিটিয়ে, আর খানিকটা পানিতে গলা ভিজিয়ে নিয়ে ছড়ার নড়বড়ে বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে আবার এগিয়ে গেলাম সবাই। এটাই পথ।

মিনিট বিশেক সেই ছড়া ধরে হেঁটে একটা গুঁড়ির সাঁকো পেরিয়ে আবার শক্ত পাহাড়ে পা দিলাম আমরা। আমি আর পুতুল আপা একটু পিছিয়ে পড়েছি, বাকিরা এগিয়ে গেছে খানিকটা।

আরো আধঘন্টার মতো হেঁটে একটা পাহাড়ের চূড়ায় এক টংঘরের দেখা মিললো, দূর থেকে দেখি, আমাদের দলের বাকিরা গুটগুট করে এগিয়ে চলছে ওটার দিকে। পথ এখন বেশ খাড়া, দ্রুত এগোনো মুশকিল হয়ে পড়েছে। সেই টংঘরে পৌঁছে একটা বড়সড় বিশ্রাম নেয়ার জন্যে বসলাম সবাই। টংঘরের চারদিকে পাহাড়ের ঢাল, অনেক অনেক দূরে ঝাপসা মেঘের মতো আরো পাহাড়ের শীর্ষ দেখা যাচ্ছে। দূরে দিগন্তের কাছে খানিকটা মেঘ, এ ছাড়া গোটা আকাশে নীলের রাজত্ব। ক্যামেরা বার করে কিছুক্ষণ টহল দিলাম আশেপাশে।

পাহাড়ি এলাকায় বেশ খানিকটা পরপর, সাধারণত কিছুটা দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার পর এমন টংঘরের দেখা পাওয়া যায়। বাঁশ দিয়ে তৈরি এ ঘরগুলোতে স্রেফ বসবার জন্যে একটা পাটাতন, আর ওপরে একটা ছাউনি আছে। ছাউনির নিচে একটা মাচায় শুকনো লাউয়ের খোলে পানিও পাওয়া যায়। পাহাড়িরা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হলে এই টংঘরে এসে বিশ্রাম নেন। যদি সাথে কোন উদ্বৃত্ত রসদ থাকে, এই ঘরে রেখে যান পরবর্তী আশ্রয়সন্ধানী পথিকের জন্যে। পাহাড়ের অধিবাসীরা আমাদের বিচারে হয়তো দরিদ্র, কিন্তু মানসিকতায় আমাদের চেয়ে অনেক উদার। অন্যের জন্যে এই মমত্ববোধ না থাকলে এই রুক্ষ পরিবেশে মানুষ টিকতে পারবে না।

টংঘরের চারপাশে বুনো টক ফল ধরে আছে। আমার শৈশব কেটেছে সিলেটে, সেখানে এই ফলের ছড়াছড়ি, টক তরকারি রান্নায় বেশ জনপ্রিয়, চুকর নামেই চিনি এটাকে। কাঁটাওয়ালা গাছে শ'য়ে শ'য়ে ফল ধরে আছে, মংক্ষিয়াদা অনেকগুলো ফল পেড়ে নিলেন, রাতে ডালের সাথে রান্না করবেন। আমরাও হাত বোঝাই করে পেড়ে আনলাম, যতক্ষণ বসে আছি, ততক্ষণ একটা কিছু মুখে দেয়া যাবে। ভিটামিন সি-এর উৎস ধারে কাছে আর কিছু নেই।

টংঘরে মিনিট পনেরো বসে সবাই আবার উঠে পড়লাম। অন্যদের তুলনায় আমি আর পুতুল আপা পিছিয়ে পড়েছি। চলতে চলতে পথের দু'পাশে ভিড় করে থাকা সেই চুকর ঝোপ থেকে ফল পাড়তে পাড়তে চললাম।

বালুময় এই পথ ধরে এগিয়ে পাহাড়টা ডিঙিয়ে যাবার পর দলের আর কারো দেখা পেলাম না। আমি আর পুতুল আপা ধীরেসুস্থে পাহাড় বেয়ে নামছি। চলতে চলতে পুতুল আপা প্রতিজ্ঞা করলেন, ঢাকায় ফিরেই এবার কোন জিমে ভর্তি হবেন তিনি, ঘরে বসে থেকে থেকে তাঁর পেশী অচল হয়ে পড়েছে। বাস্তবিক, ঠিক এক বছর আগে পর্যন্ত যখন এক্সপ্লোরারস' ক্লাবের সদস্যরা টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সৈকত অতিক্রম করেছেন, পুতুল আপা ছিলেন সবার আগে। আমি অবশ্য বরাবরই ফেল্টুশ, তাই আমার ততটা দুঃখ নেই।

এরপর ঠিক কতক্ষণ হেঁটেছি, ঠিক মনে নেই আমার, তবে দলের আর কারো দেখা মেলেনি। তিন পাহাড়ির একটা দলের দেখা মিললো, তারা পথের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সামনে আদা ভর্তি ঝুড়ি। কিছুক্ষণ আলাপ করা গেলো, বাংলা বেশ বোঝে তারা। জানতে পারলাম, সামনেই বড়থুলি, দশ মিনিট হাঁটলেই দেখা মিলবে। খানিকটা উল্লসিত হয়ে উঠলাম, যাক, তাহলে আরো পঁয়ত্রিশ মিনিট হাঁটলে বড়থুলির দেখা মিলবে। পাহাড়িদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা।
সূর্য মাথার ওপর থেকে ঢলে পড়ছে ধীরে ধীরে, চারদিকে এখনও রোদ, কিন্তু আরো একটা পাহাড় ডিঙিয়ে যেতেই আবার গাছের ছায়াঢাকা পথ পাওয়া গেলো। পথ ধরে এগিয়ে একটা ছড়ার সামনে একটু বিশ্রাম নিতে বসলাম। ছড়ার ওপর একটা নড়বড়ে চেহারার সাঁকো, তার দুপাশে থকথক করছে কাদা। মিনিট দুয়েক বসতে না বসতেই দেখি সেই পাহাড়িরা এসে পড়ছে, ক্ষিপ্র পায়ে হাঁটছে সকলে। আমাদের স্বচ্ছন্দ গতিতে অতিক্রম করে গেলো তারা, সাঁকোটা পার হতে পাঁচ সেকেন্ড সময়ও লাগলো না তাদের। কানের কাছে একটা পরিচিত ভনভন শব্দ শুনতেই আঁতকে উঠলাম, সর্বনাশ, মশা আছে না কি এখানে? কাল বিলম্ব না করে আবার পথ চলতে শুরু করলাম আমরা।

খানিকটা পথ এগিয়ে এক গ্রামবাসীর দেখা মিললো, নমস্কার জানিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, আমাদের দলের কাউকে দেখেছেন কি না। তিনি জানালেন, আমাদের দলের কয়েকজনের সাথে তাঁর দেখা হয়েছে, সামনের গ্রামের দিকে গিয়েছেন তাঁরা, মিনিট পনেরো আগে। আরো টুকটাক আলাপ করে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা।
এর পরের পাহাড়ের মাথায় উঠে চোখে পড়লো, সামনে বিসতৃত উপত্যকায় বেশ বড় একটা গ্রাম, অনেকগুলো কুটির। গ্রামের সামনে ছড়ার প্রস্থ অনেক, গভীরতাও যে কম নয়, বুঝতে পারলাম বুক পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনকে দেখে। আমাদের লোকজন কি তবে এখানেই এসে উঠলো না কি?

আরো খানিকটা হেঁটে যখন সমতলে নামলাম, তখন বুঝলাম, এই ছড়া ডিঙিয়ে গ্রামে যাওয়া সম্ভব নয়। অন্য কোন ঘুরপথে গ্রামে যেতে হয়। কতগুলো ক্ষুদে বাচ্চা ছড়ার কিনারায় এসে জড়ো হয়েছে, বিশালকায় কয়েকটা শুয়োর নদীতে নেমে চকচক করে পানি খাচ্ছে, গ্রামের কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে চোখে পড়ছে না। সেই ছেলেপিলের দলের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন পুতুল আপা, সব কয়টা ভোঁ দৌড় দিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে কুটিরগুলোর দিকে ছুটে গেলো। মিনিট খানেকের মধ্যে স্বাস্থ্যবান এক পুরুষ উদ্যত লাঠি হাতে বেরিয়ে এলেন, আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করতে হলো না, পিঠে রুকস্যাক দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন তিনি, হাত তুলে বামের পাহাড়সারির দিকে নির্দেশ করলেন। সেদিকে উঁচু নিচু ভাঙা পাথর বোঝাই, কোন পথ আছে কি না বোঝার উপায় নেই। তবে খানিক এগোতেই কয়েকটা পাথরের ওপর চকে আঁকা তীর চিহ্ন আর ঊঈই লেখা দেখে বোঝা গেলো, এদিকেই এগোতে হবে।

পুতুল আপা সেই পথে এগিয়ে গেলেন, আমি ঘাসের ওপর ব্যাগ বিছিয়ে খানিকটা ঝিমিয়ে নিলাম। কানে আসছে দূরে শিশুর দঙ্গলের টুকরো টুকরো কথা, আর শূকরগুলোর পানি খাওয়ার শব্দ। মিনিট দশেক জিরিয়ে নিয়ে উঠে এগিয়ে গেলাম আমি।

তীর চিহ্ন ধরে ঝোপজঙ্গলে ভরা পথ পেরিয়ে হঠাৎ পাড়ার আরেক অংশের দেখা মিললো। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কুটির, মাঝখানে বিভিন্ন বয়সের ছেলেপুলে ফুটবল খেলছে। আমাদের দেখে থমকে দাঁড়ালো সবাই। বেজায় তৃষ্ণা পেয়েছে আমার, বোতলের পানি ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই, পুতুল আপার অবস্থাও তথৈবচ। এ পাড়ার সবাই বেশ ভালো বাংলা বোঝে, নমস্কারাদি শেষে আমাদের একটা কুটিরের বারান্দায় বসতে দিয়ে সেই লাউয়ের খোলে ভর্তি জল নিয়ে এলো এক কিশোর।

তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেলো, আমাদের অগ্রবর্তী দল সামনে আর্মি ক্যাম্পে বিশ্রাম নিচ্ছে। আরো জানা গেলো, এ গ্রামে একটা চার্চ আছে, চার্চ সংলগ্ন স্কুলও আছে, শিশুরা সেখানে লেখাপড়া করে। গ্রামের সবচেয়ে কৃতী বালকটিই আমাদের জল সরবরাহ করেছে, কাপ্তাই থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।

সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা, হঠাৎ ডাক শুনে থামতে হলো। এক বৃদ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসছেন। প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, পরে বুঝলাম, আমাদের সাথে করমর্দনের জন্যেই তাঁর আগমন। বৃদ্ধা খৃষ্টান, চার্চের পাশের কুটির থাকেন, আমাদের সাথে আলাপ করে চরম প্রীত হয়েছেন তিনি। তাঁর করমর্দনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করে বিদায় নিলাম আমরা। সূর্য ঢলে পড়েছে এক পাশে, দূরে রোদের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে পাহাড় সারি।


চার: যথার্থ যাত্রী

কিন্তু শুধু তারাই যথার্থ যাত্রী, যারা চ'লে যায়
কেবল যাবারই জন্য, হালকা মন, বেলুনের মতো,
নিশিত নিয়তি ফেলে একবার ফিরে না তাকায়,
কেন, তা জানে না, শুধু 'চলো, চলো' বলে অবিরত।


শার্ল বোদল্যের তাঁর এই কবিতাটি মাঙ্মি দু্য কাঁ-কে উৎসর্গ করেছিলেন। আর ক'টা দিন বাঁচলে ঊঈই সদস্যদের উৎসর্গ করে দিয়ে যেতেন এই চরণ চারখানা। অ্যাকেবারে আমাদের দশা দেখেই যেন লিখে গিয়েছেন বেচারা। তাঁর এই যথার্থ যাত্রী তো আমরাই, এই এঙ্প্লোরারস' ক্লাব অব বাংলাদেশের পুকুরপাড়া অভিযানের পোড়াকপালিয়ার দল!
বোঝেননি তো? মন দিয়ে তাহলে বাকিটা পড়ুন।

গ্রামের পাশেই এক পাহাড়ের ঢালে সেনাছাউনি। ক্যাম্পে ঢুকে দেখলাম, ঊঈই সদস্যরা সেনাদের সাথে বেশ জমিয়ে ফেলেছেন, চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করা হচ্ছে তাঁদের। সৈনিকরা জঙলা ছোপধরা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে আছেন, বেশ হাসিখুশি আমুদে ভাব তাদের মধ্যে। বালতিতে করে গরম পানি নিয়ে আসা হয়েছে চা বানানোর জন্যে, আর মুড়ি দিয়ে টা-য়ের কাজ চালানো হচ্ছে।

মারদাঙ্গা এমন চরণের অভাব বোদল্যের-এর নেই, কিন্তু ওপরওয়ালা আমাদের প্রত্যেককে মোটে দু'টি করে দিয়েছেন, আমার ভাগের দু'টো আবার গড়পড়তার চেয়ে অধিক লিকলিকে। এই দুই শ্রীচরণ ভরসা করে অ্যাদ্দূর এসে টের পেলাম, ডান ঊরুর মাংসপেশী আসলে ঠিক কোথায় আছে। এতদিন বইপত্রেই তার নাম শুনে এসেছি, কিন্তু আর্মি ক্যাম্পে বসে যখন জুড়িয়ে যাওয়া চায়ে চুমুক দিয়ে মনটাও প্রায় জুড়িয়ে এসেছে, তখন মারাত্মক এক মোচড় মেরে নিজের অবস্থা ও অবস্থান জানিয়ে দিলো ব্যাটা। মালিশ ছাড়া করার কিছু নেই, তারই ফাঁকে ফাঁকে আলাপ চালিয়ে গেলাম।

সেনাদের মধ্যে যিনি আমাদের আপ্যায়নের ভার নিয়েছেন, তিনি বেশ বিস্মিত আমাদের কাজকারবার দেখে। গরুমারা পাহাড় ডিঙিয়ে এসেছি শুনে চোখ কপালে তুললেন তিনি, কারণ ঐ পথে নাকি তাঁরাও কেউ যাতায়াত করতে সাহস পান না। কেন আমরা খোদার খামাখা এখানে এসেছি, জানতে চাইলেন তিনি, দেশ দেখতে এসেছি শুনে ঠা ঠা করে হেসে ফেললেন তিনি, তাঁর সহকর্মীরাও দেখলাম খুব আমোদিত হলেন এই উত্তর শুনে। দেড় বছর ধরে এখানে আছেন তাঁরা, এখন প্রহর গুণছেন আর সূরা ইয়াসিন জপছেন, কবে এখান থেকে বিদায় নেবেন। এখানে সবকিছুই ভালো, তবে মশা আর শীত বাদ দিয়ে। মশার সীজনে লাখে লাখে মশা ছেয়ে থাকে চারদিকে, আর এই শীতে সূর্য ডুবতে না ডুবতেই এমন বিশ্রী ঠান্ডা পড়ে যে রাতে একবার এপাশ আরেকবার ওপাশ করে সময় কাটাতে হয়।

সামনে পথের কথা জিজ্ঞেস করতে আরো একবার হেসে ফেললেন তিনি। আমরা নাকি নিজের চোখেই দেখতে পাবো, পথ কেমন। প্রাংশা পর্যন্ত পথ মন্দ নয়, কিন্তু প্রাংশা পেরিয়ে রুমাবাজারে যাবার পথে ময়না পাহাড় বলে এক বস্তু রয়েছে, সেটা পার হতে গিয়ে নাকি সৈনিকরাও মাথা ঘুরে পড়ে যায়, দোয়াদরূদ জপতে জপতে সেই পথ চলে তারা। প্রাংশা পৌঁছতে কত সময় লাগতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বললেন, সামনের বিশাল পাহাড়টা পার হতেই আমাদের ঘন্টা তিনেক লাগবে। তারপর ছড়ার মধ্যে দিয়ে আরো বিরাট পথ পাড়ি দিতে হবে। তখন বাজে প্রায় পাঁচটা, রাত দশটার আগে কোনভাবেই প্রাংশায় পৌঁছোনো সম্ভব না। আঁধার ঘনিয়ে আসবে আধ ঘন্টার মধ্যে, বাকিটুকু পথ পাড়ি দিতে হবে সেই আঁধারেই।

পেটে দানাপানি পড়ায় বেশ চাঙা লাগছিলো, তাই দমলাম না। প্রাংশা পর্যন্ত পথ যখন ভালো, গরুমারা পাহাড়ের মতো কিছু যখন নেই, তখন রাতের আঁধারে চলতেও আপত্তি নেই আমাদের। চাঁদ আছে, তাছাড়া মুশকিলাসান টর্চ তো আছেই, আমি কী ডরাই সখি ভিখিরি আঁধারে? আরো মিনিট পাঁচেক বসে একে একে উঠে পড়লাম সকলে। সেনারা হাসিমুখে বিদায় জানালেন আমাদের, তবে ঢাকায় ফিরে অন্য কোন দলকে এ পথে পাঠাবার কোন ফিকির যাতে না করি, সে পরামর্শও দিলেন। এদিকে পরিস্থিতি নাকি ভালো না, কখন কী ঘটে, কিচ্ছু বলা যায় না।

পান্তভূতের জ্যান্ত ছানার মতো আহ্লাদে ধুপধুপিয়ে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে বড়থলির পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম আমরা। পথ এখানে খাড়া, কিন্তু অনেক প্রশস্ত, আর ঝুরঝুরে কাঁকরে ভর্তি, পায়ের নিচে প্রতিটি মূহুর্তে নিঃশব্দে চূর্ণ হচ্ছে তারা। যথারীতি খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি আমি, আমারও খানিক পেছনে পুতুল আপা, আর তাঁর সাথে বরুণদা আর মংক্ষিয়াদা।

বড়থলির পাহাড় গরুমারা পাহাড়ের মতোই বিশাল, ঘন গাছপালায় ঢাকা। সূর্য আর আকাশে নেই, গোধূলির আলোয় লালচে মাটির পথে হেঁটে চলছি আমরা। পাহাড়ের প্রথম ধাপটা টপকে নামার পথে একটা ছোট্ট ছড়া পড়লো, সেখানে দেখি, কয়েকজন গ্রামবাসী বিশ্রাম নিচ্ছেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই আছে দলে। তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেলো, সকাল ন'টায় রুমা থেকে হাঁটা শুরু করেছেন তারা, আর এখন বাজে পাঁচটার ওপরে, এরই মধ্যে বড়থলিতে পৌঁছে গেছে সবাই। আমরা প্রাংশার দিকে যাচ্ছি শুনে তারা পথ বলে দিলেন, পাহাড় ডিঙিয়ে ছড়া ধরে এগোলেই প্রাংশায় যাবার সোজা রাস্তা।

ঢাল বেয়ে খানিকটা নেমে এবার ঝুরঝুরে মাটির বদলে শক্ত ভেজা ভেজা পাথুরে পথে পা পড়লো আমার। ইতিমধ্যে শাহেদ ভাই টপ গীয়ারে পা চালিয়ে আমাকে পেরিয়ে গেছেন, পুতুল আপা খানিকটা পিছিয়ে পড়েছেন বলে বরুণদা আর মংক্ষিয়াদাও চোখের আড়ালে, গোটা পাহাড়ে আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে দলের আর কেউ নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এঁকে বেঁকে উঠে গেছে পথ। দু'পাশে এতো ঘন ঝোপঝাড় যে দু'মিনিট হাঁটার পর পেছনে ফিরে তাকালে আর কোন কিছু চোখে পড়ে না, না ফেলে আসা পথ, না দিগন্ত। যদিও এ আলোয় চলতে এখনও সমস্যা হচ্ছে না, কিন্তু শিগগীরই যে হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ধাপে ধাপে পথ উঠে গেছে ওপরে, আর আমি উঠছি তো উঠছিই। ক্যাম্প ছেড়ে আসার প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে, কয়েকবার হাঁক ছেড়ে সামনের দলের লোকজনকে ডাকলাম, সাড়া না পেয়ে পেছনের দলের লোকজনকেও ডেকে দেখলাম, অবস্থা তথৈবচ।

একসময় ওপরে ওঠার পালা শেষ হলো, পথ খানিকটা সমতল ধরে এগিয়ে গেছে। এখানে পথ আবার কিছুটা সরু ও পিচ্ছিল, পথের ডান পাশে গভীর খাদ, তবে খাদের ঢালে বিশাল সব বাঁশের ঝাড়, খাদে কেউ চাইলেও পড়তে পারবে না। মাথার ওপর বাঁশ ঝাড় আর অন্যান্য গাছের ক্যানোপি, তবুও ফাঁক গলে নরম আলো এসে পড়ছে মাটিতে, বোঝা যাচ্ছে বেশ, চাঁদ উঠে গেছে। আরো মিনিট পনেরো হেঁটে এক অসাধারণ পথ পাওয়া গেলো, তার দুপাশেই পাহাড় ঢালু হয়ে নেমে গেছে, যতদূর চোখ যায় ঘন বাঁশঝাড়, আর আকাশে ভাসছে চমৎকার চাঁদ। বাঁশের ডগা আর পাতা দুলছে বাতাসে, পথের ওপর কেঁপে কেঁপে উঠছে ছায়ারা। চারদিক অন্ধকার, হঠাৎ সরসর শব্দ উঠছে ঝোপে, ঝিঁঝিঁ ডাকছে দূরে কোথাও।

মুগ্ধ হয়ে হাঁটছিলাম, পাড়া কাঁপিয়ে একটা গজলেও টান দিয়েছিলাম, ম্যায় নজর সে পি রাহা হুঁ, ইয়ে সামা বদল না যায়ে --- কিন্তু বাস্তবে ফিরে এলাম গাছের আড়ালে চাঁদ হারিয়ে যেতেই। আবছা আলোয় দেখতে পাচ্ছি, ধাপে ধাপে পথ উঠে গেছে পাহাড়ের বহু ওপরে। বেশ জেঁকে ঠান্ডা পড়ে গেছে, আর পথ এখন নিরেট আঁধারে, জ্যাকেট আর টর্চ ছাড়া গতি নেই। পেছন ফিরে একটা বড় হাঁক ছাড়লাম, 'পুতুল আপা! বরূণদা! মংক্ষিয়াদা!' কোন সাড়া নেই। পাহাড়িদের ঢঙে কুউউউ দিলাম, কিন্তু কোন কিইইই ভেসে এলো না। কী আর করা, একটা ধাপের ওপর পা ছড়িয়ে বসে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে বার করে নিলাম যা কিছু লাগে। একটা চকলেটও পাওয়া গেলো এক পকেটে, পানির বোতলটাও বার করে নিলাম, এতক্ষণ হাঁটার পর বসে থেকে কিছুক্ষণ কুটকুট করে চিবানো যাবে। চকলেটে দুয়েকটা কামড় দেয়ার পর দেখলাম, সত্যিই কুটকুট করে শব্দ হচ্ছে, এবং বেশ জোরে, এবং শব্দটা আসছে আশপাশ থেকে। ঘাবড়ে গিয়ে টর্চের আলো ফেললাম, কিছু চোখে পড়লো না। আলো নিবিয়ে আবার চকলেটে দাঁত বসিয়েছি, তখন পাশের ঝোপে বিকট ধস্তাধস্তির শব্দ পেলাম, শব্দটা আমার কাছ থেকে শুরু হয়ে দূরে চলে গেলো --- আর তারপরই বহুদূরে শোনা গেলো মানুষের প্রলম্বিত কান্নার মতো একটা শব্দ।

এতক্ষণ অন্য কোন চিন্তা মাথায় ঢোকেনি, এই জংলি জলসা শুরু হতেই শাহেদ ভাইয়ের সাবধানবাণী মনে পড়লো, এখানে নাকি প্রচুর শেয়াল আছে। অনেক বছর আগে এক টিলার গর্তের মুখে একবার ভুঁড়ো শেয়ালের ধমক খেয়েছিলাম, সিলেটে, সেই আতঙ্ক আমার এখনও কাটেনি, চকলেটটা কোনমতে মুখে ভরে পানির বোতল হাতে নিয়ে দিলাম এক ছুট।

ধাপ কাটা আছে পথের ওপর, তাই বেশ দ্রুত পার হয়ে এলাম অংশটা, কিন্তু পাহাড় থেকে নামার পথ খুব একটা সুবিধের নয়। একহাতে লাঠি আর অন্য হাতে টর্চ নিয়ে অতি সন্তর্পণে সেই সরু, খোঁচা খোঁচা পাথরে ভরা পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে একটা হাঁক ছাড়লাম, 'চঞ্চল! শাহেদ ভাই!' আমার ডাকের প্রতিধ্বনি ফিরে এলো প্রায় সাথে সাথেই।

বহুদূর থেকে যেন উত্তর এলো, 'হিমু! আসেন তাড়াতাড়ি!' শাহেদ ভাইয়ের স্বর।

আমি এবার আরো বুলন্দ গলায় হাঁক ছাড়লাম, শৃগালাশঙ্কা কাটেনি আমার, 'দাঁড়ান একটু, আমি আসি!'

জবাব এলো, 'জলদি আসেন!'

এবার এগোতে গিয়ে আমার চক্ষুস্থির, পথ চলে গেছে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে, যত্রতত্র গাছের শিকড় বেরিয়ে আছে বলে রক্ষা। একবার তো পা পিছলে পড়ছিলাম গড়গড়িয়ে, লাঠিটার কল্যাণে টাল সামলে নিতে পেরেছি। মিনিট দশেক হাঁচড়ে পাঁচড়ে কখনো পাথর কখনো শিকড় আঁকড়ে শেষ পর্যন্ত নেমে এলাম পাহাড় থেকে, একটা ছড়ার পাশে। কুলকুল করে বয়ে চলছে পানি, স্বল্প পরিসরে গুটিসুটি মেরে বসে আছে চঞ্চল, সালেহীন, সৈকত, মিলন ভাই আর শাহেদ ভাই। মিলন ভাই একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, বেচারার দুই পা গতকালই টান খেয়ে বসেছে, তার ওপর আবার এই ধকল।

শাহেদ ভাই জানতে চাইলেন, বাকিরা কোথায়। পুতুল আপা, মংক্ষিয়াদা আর বরূণদা বেশ খানিকটা পিছিয়ে, জানালাম আমি, কারণ শেষবার ডেকে ওঁদের কোন সাড়া পাইনি। সিদ্ধান্ত হলো, পুতুল আপারা এসে না পৌঁছুনো পর্যন্ত আমরা এখানেই বসে থাকবো। শাহেদ ভাইয়েরা এখানে মিনিট বিশেক হলো বসে আছেন। সৈকত তার বকের মতো ঠ্যাং ফেলে এগিয়ে ছিলো সবার চেয়ে, সবার আগে সে-ই এসে পৌঁছেছে, কিন্তু অন্ধকার পড়ে যাবার পর আর বেশি এগোতে সাহস করেনি সে, বিশ মিনিট চুপচাপ বসে অপেক্ষা করার পর বাকিদের সাথে তার মুলাকাৎ হয়েছে।

ব্যাগটা খুলে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসতে না বসতেই শীত করতে শুরু করলো। এতক্ষণ পথ চলেছি, শরীর গরম ছিলো, কিন্তু গায়ের ঘাম এখন শুকোতে শুরু করেছে, আর প্রবল ঠান্ডা শরীরে কামড় দেয়া শুরু করেছে। ঘাড় ফিরিয়ে একবার আমাদের ক্যাম্পের চেহারাটা ভালো করে দেখে নিলাম। বাঁয়ে পাহাড়ের ফাঁকে চলে গেছে জলের ধারা, ডানে আবছা চাঁদের আলোয় যতদূর চোখে পড়ে, বড় বড় বোল্ডার পড়ে আছে ছড়ার ওপর। আমাদের পেছনে আর সামনে খাড়া দেয়ালের মতো বিশাল পাহাড় নরকের প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ, একটা গভীর করিডোরের মেঝেতে আমরা বসে, এবং একটু পর পর হাড় কাঁপানো বাতাস এসে ধাক্কা মারছে আমাদের।

সবাই যৌথভাবে মিনিট দশেক উসখুস করার পর চঞ্চল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো, তারপর ছোটখাটো ডালপালা কুড়োনো শুরু করলো, বুঝলাম, আগুন জ্বালাবে সে। বাস্তবিক, আগুন ছাড়া এই ঠান্ডায় টেকা দায়, তাছাড়া চঞ্চলটা মহা অগ্ন্যুৎস্পৃহ, ম্লেচ্ছ ভাষায় যাকে বলে পাইরোম্যানিয়াক, সুযোগ পেলেই আগুন জ্বালিয়ে বসে, আগেও দেখেছি। দেখতে না দেখতে একগাদা কাঠিকুটো জড়ো করে একটা ছোটখাটো আগুন ধরিয়ে বসলো সে, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করলো, বাংলা ভাষায় অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় মোটামুটি এমন --- পাঁচ মিনিটের মধ্যে পঞ্চাশ মণ লাকড়ি নিয়ে আসো, নাহলে ---! চঞ্চলের সাথে লাকড়ি নিয়ে তর্কাতর্কি করতে যাওয়া বিপজ্জনক, তাই চুপচাপ আমি আর সালেহীন শুকনো কাঠ খুঁজে জড়ো করতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুনের আরো কয়েকটা জিভ লকলকিয়ে বেড়ে উঠলো, আমাদের চারপাশে মোলায়েম জ্যোৎস্নার বোনা ছায়ার নকশা তার উদ্বাহু নৃত্যের তোড়ে হারিয়ে ফুরিয়ে গেলো।

আধ ঘন্টা চুপচাপ কেটে গেলো, মিলন ভাই পাহাড়ে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছেন, সৈকতের অবস্থাও খুব একটা সুবিধের নয়, শাহেদ ভাই একটু পর পর উঠে গিয়ে টর্চ ফেলে দেখছেন, পুতুল আপারা এসে পৌঁছুলেন কি না, চঞ্চল বসে বসে আগুনের কুন্ডটাকে ছহিহ্ তরিকাতে খোঁচাচ্ছে, যাতে সেটা চাঙা থাকে, আমি আর সালেহীন কাঠ কুড়োচ্ছি রূপকথার ওয়াসিলিসার মতো। কী কুক্ষণে একবার চঞ্চলকে একটা টীপি তৈরি করতে বলেছিলাম, যাতে আগুনটা সময় নিয়ে জ্বলতে পারে, একটা জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ হাতে নিয়ে ততোধিক জ্বলন্ত চোখ করে আমাকে বিরাট একটা নিঃশব্দ ধমক দিলো সে, আমি আঁতকে উঠে আবার টোকাইবৃত্তিতে মন দিলাম।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে আশপাশে পড়ে থাকা প্রতিটি কাঠের টুকরোকে এই যজ্ঞে আহুতি দিলাম আমরা, আধপোড়া কাঠ আর ছাইয়ের একটা সম্মানজনক স্তুপ তৈরি হলো সেই ছড়ার পাশে। কিন্তু আগুনটাকে জিইয়ে রাখার জন্যে আরো কাঠ দরকার, আর আগুন নিভে গেলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে জমে যাবো আমরা। শাহেদ ভাই ততোক্ষণে টর্চ হাতে নিয়ে আবার ওপরে উঠে গেছেন, বরুণদা-পুতুল আপা-মংক্ষিয়াদার খোঁজ নিতে। আর এদিকে শুকনো কাঠ ফুরিয়ে যাওয়ায় ছড়ার পানিতে পড়ে থাকা মোটা মোটা ভেজা ছাতাপড়া ডাল তুলে এনেছি আমরা, শেষ কাঠের টুকরোগুলোকে গ্রাস করে জ্বলতে থাকা আগুনের ওপর রেখে সেঁকা হচ্ছে সেগুলোকে, ভেজা ভেজা ভাবটা একটু কমলেই আগুনে গুঁজে দেয়া হবে। চঞ্চল এতেও সন্তুষ্ট নয়, ফের পাহাড়ের ওপর চড়ে ঝোপঝাড় থেকে পাতাসহ একগাদা ডাল ভেঙে নিয়ে এসেছে। সেই শিশিরে ভেজা ডালপালাও সে আগুনে গুঁজে দিতে চায়।

আগুন আর ধোঁয়া নিয়ে আমরা যখন কিছুটা বিব্রত, তখন ওপর থেকে মানুষের গলা ভেসে এলো। মিনিট খানেকের মধ্যে এক বিশাল দুঃসংবাদও ভেসে এলো --- পুতুল আপার পা ভেঙে গেছে!

আমাদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। এই জঙ্গলের মধ্যে এখন কীভাবে চিকিৎসা করা যায়? নূ্যনতম চিকিৎসাটুকু পেতে হলেও আমাদের রুমা পেঁৗছুতে হবে। সামনে পথ কেমন, মংক্ষিয়াদা জানেন না, কারণ তিনি আগে কখনো এ পথে আসেননি। সামনে আদৌ পথ আছে কি না, তা-ও বোঝার উপায় নেই, কারণ টর্চের আলো আর আগুনের তেজে যতদূর চোখ যায়, চড়ায় পানির মৃদু স্রোতের মাঝে জেগে থাকা অতিকায় সব বোল্ডার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। সুস্থ পা নিয়েই এ পথে চলা মুশকিল, আর ভাঙা পা নিয়ে পুতুল আপা কিভাবে এগোবেন এ পথে?

পুতুল আপাকে ধরে ধরে বরুণদা আর শাহেদ ভাই যখন নামলেন, তখন আমরা জানলাম, ভাঙেনি, কিন্তু পুতুল আপার পা মারাত্নকভাবে মচকে গেছে। তা-ও মচকে গেছে একেবারে এই ছড়ার কাছে এসে, তীরে এসে তরী ডোবা আর কাকে বলে?

পুতুল আপা স্যান্ডেল খুলে ছড়ার হিমশীতল পানিতে পা ডুবিয়ে রাখলেন কিছুক্ষণ, ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপছেন বেচারি। কিন্তু বাকিটা পথ হেঁটে যেতে পারবেন, শুরুতেই বাকিদের আশ্বস্ত করলেন তিনি। দুটো ব্যথানাশক ট্যাবলেট আর ব্যথাবিমোচক মলম তাঁকে সরবরাহ করা হলো তৎক্ষণাৎ, তারপর আগুনের পাশে আধঘন্টা বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দেয়া হলো। পুতুল আপা অবশ্য বেশিক্ষণ বসতে চাইলেন না, বসে থাকলেই ব্যথাটা তাঁকে কাবু করে ফেলবে, জানালেন তিনি। কাজেই দশ মিনিটের মধ্যেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবারো পা বাড়ালাম আমরা, অজানা, অনিশ্চিত পথে।

পুতুল আপার পা-ই শুধু ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, তাঁর টর্চটিও আঘাত পেয়ে বিকল হয়ে গেছে। ফুরিয়ে গেছে সৈকত আর উচ্ছল ভাইয়ের টর্চের ব্যাটারী। আমাদের দশজনের দলে কর্মক্ষম টর্চ তখন চারটা বা পাঁচটা, তাই এক টর্চের আলোয় দু'জনকে পথ চলতে হচ্ছে। কিন্তু পথের যা দশা, তাতে প্রত্যেকের পায়ের সামনে টর্চের আলো না ফেললে কী ঘটে যায় তা বলা মুশকিল। পানির ওপর জেগে থাকা পাথরগুলোর ওপর পা ফেলে এগিয়ে যেতে হচ্ছে, পানিতে পা ভিজিয়ে চললে নির্ঘাত নিউমোনিয়া লাগবে, তাছাড়া পানিতে ডুবে থাকা পাথরগুলো সাংঘাতিক পিচ্ছিল হয়। ছড়ায় যুগ যুগ ধরে পানি বয়ে চলছে, তাতে ভিজে ভিজে পাথরগুলো শুধু পিচ্ছিলই হয়নি, তাদের তলা থেকে মাটি আর পাথর সরে যাওয়ায় তারা নড়বড়েও হয়ে পড়েছে। পাঠক বিশ্বাস করতে চাইবেন না, কিন্তু এক একটা দু'টনী বোল্ডারও পায়ের চাপে নড়ে ওঠে ঢেঁকির মতো। সেই পিচ্ছিল, নড়বড়ে পাথরগুলোর ওপর হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে চলতে হচ্ছে আমাদের। একজন কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে পেছনে আলো ফেলেন, সেই আলো অনুসরণ করে আরেকজন এগিয়ে আসেন, এমনি করেই চলছে গোটা দল। সবার পেছনে বরুণদা, শাহেদ ভাই আর মংক্ষিয়াদা পুতুল আপাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছেন। সামনের ছ'জন কিছুদূর এগিয়ে আবার বসে পড়ছি হাতির পিঠের মতো উঁচু উঁচু বোল্ডারের ওপর, অপেক্ষা করছি কখন পেছনের চারজন আবার এগিয়ে এসে আবার মিলিত হবেন। আমাদের পথের ওপর কখনো আকাশের চাঁদ আলো ফেলছে, কখনো পথ ঢেকে যাচ্ছে দু'পাশের গাছপালার প্রসারিত বাহুর নিচে, কখনো বা মাথার ওপর বিপজ্জনকভাবে উঁকি দিচ্ছে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসা ঝুলন্ত পাথরের ব্যালকনি, চাঁদের আলোর সংসর্গ হারিয়ে গাঢ় আদিম অন্ধকার সেখানে সহাস্যে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। মংক্ষিয়াদা সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন, ছড়ার দু'পাশে আলো ফেলে দেখতে বলছেন, কোন পায়ে চলা পথ ছড়া থেকে উঠে গেছে কি না, কিন্তু ছড়ার দু'পাশে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার শুধু ঘন বন, নিরেট পাথরের দেয়াল, অথবা ছড়ার আরো শীর্ণ, আরো অন্ধকার, আরো বিপজ্জনক কোন শাখা। শ্লথ গতিতে এগোচ্ছে গোটা দল, প্রতিটি পা মেপে মেপে ফেলছে সবাই, বিপজ্জনক কোন পাথরে পা পড়লে উঁচু গলায় পেছনের অভিযাত্রীকে সতর্ক করে দিচ্ছে সামনের জন, বিপজ্জনক কোন স্থানে একজনের বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে এগিয়ে আসছেন আরেকজন, তাঁর হাত আবার প্রসারিত হচ্ছে আরেকজনের দিকে --- আর দশ মিনিট পর পর থেমে অপেক্ষা করছে সবাই, ধীর গতিতে একটিমাত্র সচল পায়ে এগিয়ে আসা পুতুল আপা আর তাঁর সঙ্গী তিনজনের জন্যে। চারপাশে শুধু জলের নরম শব্দ আর তার প্রতিধ্বনি, বাতাসে বাঁশের পাতার সরসর শব্দ, আর নিজেদের নিঃশ্বাসের ভারি শব্দ। এই অস্বস্তিকর কলতানকে মাঝে মাঝে লঘু করে তুলছে সদস্যদের সরস মন্তব্য। এই রাতটি শুধু যে অভিযাত্রীদের স্মরণসরণীতে চিরকালের পথিক হয়ে আছে, তা-ই নয়, ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি বন্ধনের দার্ঢ্য আরেকমাত্রা বৃদ্ধি করেছে।

এভাবে ঘন্টাখানেক চলার পর বিশাল এক বোল্ডারে বসলাম সবাই, পা দুটোকে যতটা সম্ভব শুকনো জায়গায় রেখে। কে যেন একটা বিস্কুটের প্যাকেট বার করলো, সবার মধ্যে উৎসবের আমেজ চলে এলো। এমন আগ্রহ করে কখনো কিছু খাইনি, অন্তত, বিস্কুট না। বিস্কুটের সাথে হেঁড়ে গলায় একটা গানও ধরলাম, আকাশে হেলান দিয়েয়েয়েয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ ---! কেউ কোন আপত্তি না করায় বুঝলাম, গানটা ততটা খারাপ লাগছে না এই পরিবেশে। নানা আসরে বেসুরো গলায় ভুলভাল গান গেয়ে জুতো ও সব্জি সংগ্রহের অভিজ্ঞতা আমার আছে, কিন্তু পাঠকদের কানে কানে বলি, সে রাতে রাঙামাটির সেই গহীন গিরিখাতে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার মাঝে জেগে থাকা বোল্ডারে বসে গান গেয়ে পাঁচ সহযাত্রীর নীরব বাহ্বা আর মিলন ভাইয়ের এগিয়ে দেয়া একটা বিস্কুটই আমার সুদীর্ঘ শিল্পীজীবনের সেরা পুরস্কার। তবে এমনও হতে পারে যে, জোর গলায় প্রতিবাদ করা, বা জুতো ছুঁড়ে মারার উদ্যম কারো মধ্যেই অবশিষ্ট ছিলো না, সকলেই ভীষণ হেদিয়ে পড়েছিলো। আশপাশে তখন অনেক শেয়ালের রাত্রিকালীন হাঁকডাক ভেসে আসছিলো, সেগুলোর পাশাপাশি আমার সঙ্গীতকেও হয়তো তাঁরা খানিকটা সহ্য করে নিয়েছেন। আর মিলন ভাই হয়তো এই ভেবে বিস্কুটটা এগিয়ে দিয়েছেন যে, সেটা খেতে হলে আমাকে গান বন্ধ করে খেতে হবে। কে জানে?

পুতুল আপাদের এগিয়ে আসার খবর পেয়ে আবারো পা চালিয়ে গেলাম আমরা। ছড়া একের পর এক মোড় নিচ্ছে, কিন্তু ছড়ার পাশে কোন পায়ে চলা পথের দেখা পাচ্ছি না আমরা। টর্চের ব্যাটারীও আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ছে, চাঁদ মাথার ওপর থেকে হেলে পড়েছে খানিকটা, এখন প্রায় মধ্যরাত। সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ হবে, যদি টর্চ বিকল হয়ে পড়ে।

আরো আধঘন্টা হাঁটার পর সকলেই উল্লসিত চিৎকার করে উঠলো, পাওয়া গেছে, দুলহান মিল গ্যয়ি! টর্চের শীর্ণ রশ্মি আর চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে বেশ সুডৌল একটা পায়ে চলা পথ, ঢুকে পড়েছে ছড়ার বাঁদিকের জঙ্গলে। সেই পথে চঞ্চল খানিকটা ঢুকে এসে রিপোর্ট করলো, পথ সামনে অনেকখানি এগিয়ে গেছে, কানাগলি নয়। পুতুল আপারা খানিকটা এগিয়ে আসার পর সেই পথে ধুপধাপ করে এগিয়ে চললাম সবাই। নড়বড়ে পাথরের ওপর দিয়ে পথ চলার পালা শেষ হলো, পায়ের নিচে টেরা ফির্মা (শক্ত মাটি। একটু ল্যাটিন কপচালাম, পাঠক ক্ষমা করবেন।)পাওয়া গেছে যখন, আর কিছুই পরোয়া করি না!

কিন্তু সেই পথ যখন আবারও ঘুরে ফিরে সেই ছড়ার পাথরের ওপর ফিরে এলো, আমরা শিউরে উঠলাম। সর্বনাশ, গোলকধাঁধাঁয় ঘুরপাক খাচ্ছি নাকি সবাই? মিনিট দশেক সেই ছড়ায় চলার পর আমাদের আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণ করে আবারও শুকনো পথের দেখা মিললো। সবাই সেই পথ ধরে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে দেখি, পাহাড়ের ওপর ধাপে ধাপে উঠে গেছে সেই পথ। বিশ্বাস করুন, পাহাড়ে হাঁটার সুযোগ পেয়ে খুশিতে চোখে পানি চলে এলো। কেবলই মনে হতে লাগলো, আমি পাইলাম, ইহাকে পাইলাম, সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ --- ইত্যাদি ইত্যাদি।

পাহাড়ে আধঘন্টা চলার পর মোটামুটি খোলা একটা জায়গা পাওয়া গেলো, একটা গাছের অতিকায় শিকড়ের ওপর বসলাম সবাই, পেছনের দলের জন্যে অপেক্ষায় সবাই। খানিকটা ফুরসত পেয়ে এবার আবারও খোনা গলায় গুনগুন করে উঠলাম, আমার প্রাণের 'পরে চলে গ্যালো কে, বসন্তের বাতাসটুকুর মতো ---। কিন্তু এবার যেন আপত্তির একটা মৃদু গুঞ্জণ শোনা গেলো আশপাশ থেকে, আর মাঘ মাসের ভয়ঙ্কর হিম হাওয়াও হারেরেরে করে ছুটে এসে গায়ে ঝাপটা মেরে বুঝিয়ে দিলো, বসন্তের এখনো বহুত বাকি। ক্ষুণ্ন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, সহস্র নক্ষত্রের দীপাবলী জ্বলছে সেখানে। এক বছর আগে, দার্জিলিং পাড়ায় এক সন্ধ্যেবেলা বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম চরিত্র, নূর মোহাম্মদ ভাইয়ের কাছ থেকে নক্ষত্রপরিচয় সম্পর্কে কিছু সবক নিয়েছিলাম, এই অজস্র তারার ভিড় দেখে বুঝলাম, বেচারা নূর মোহাম্মদের পরিশ্রমটাই মাঠে মারা গিয়েছে।

তারার কাটাকুটি দেখতে দেখতে ভারি অশালীন একটা কৌতুক মনে পড়ে গেলো, গুরুজনেরা যেহেতু একটু পিছিয়ে পড়েছেন, তাই উদাত্ত গলায় সেটি সহযাত্রীদের কাছে পেশ করলাম। হু হু ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে একটু উষ্ণতার ছোঁয়া যদি এনে দেয়া যায়, তাতে ক্ষতি কী?

অশালীন কৌতুকের গুণ হচ্ছে, একটা বলা শেষ হলেই আরেকটার কথা মনে পড়ে যায়। কাজেই দূরে মংক্ষিয়াদার গলার স্বর যখন শুনতে পেলাম, ততক্ষণে ডজনখানেক চুটকির প্রভাবে পরিবেশ উষ্ণ তো বটেই, রীতিমতো উত্তপ্ত! কিন্তু আবারও হুড়োহুড়ি করে উঠে পড়লাম আমরা। সবার মাথায় তখন একই চিন্তা, কখন প্রাংশা গ্রামে পৌঁছুবো, কোন একটা কুটিরের মাদুরে শরীর লম্বা করে একটু শোবো। ক্ষিদের কথা সবাই ভুলে গেছি, খাওয়া নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না কেউ, এখন শুধু একটা নিরাপদ আশ্রয়ে ঘুমকম্বলের নিচে শুয়ে দু'দন্ড ঘুমোতে চায় সবাই। মিলন ভাই তো আরেকটু হলে গাছের শিকড়ে বসেই ঘুমিয়ে পড়ছিলেন, আমার বদখাসলত কৌতুকের ঠ্যালায় উঠে পড়তে হয়েছে বেচারাকে।
ছড়ার পাশের এই কলাগাছে ভরপুর পাহাড় থেকে যখন নিচে খানিকটা সমতলে নেমে এলাম আমরা, তখন দেখা গেলো নতুন বিপত্তি। তিন দিকে তিনটা পথ চলে গেছে, একই রকম চওড়া তিনটা পথ, আর সবক'টা পথই মিশে গেছে গাছপালার আড়ালে।

মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এখানে গ্রামগুলোতে রাতে কোন আগুন জ্বলে না, যে বাইনোকুলার বার করে দেখে নেবো। গ্রামের আশেপাশে পাহাড়ের চূড়োয় যেসব টংঘর আছে, সেগুলো রাতে চোখে পড়বে না। এই তিনটা পথের যে কোন একটা সঠিক, আর সঠিক পথে নূ্যনতম ক'মাইল পথ হাঁটলে গ্রামের দেখা মিলবে, তা-ও কেউ নিশ্চিতভাবে জানি না, কাজেই একবার যদি ভুল পথে এগিয়ে যাই, সারারাত হাঁটলেও প্রাংশা গ্রামের সন্ধান মিলবে না, আর হাঁটতে হাঁটতে কোন চুলোয় গিয়ে ঠেকবো কে জানে? এক মগের মুল্লুক থেকে অন্য মগের মুল্লুক, মানে বার্মায় পৌঁছে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়।

পুতুল আপার সাথে বরুণদা আর মংক্ষিয়াদা এসে পৌঁছেছেন, শাহেদ ভাই খানিকটা এগিয়ে এসেছিলেন আগেই, আমাদের হতবুদ্ধি অবস্থা দেখে মংক্ষিয়াদা টর্চ নিয়ে এগিয়ে গেলেন। একটা পথের ওপর মিনিটখানেক আলো ফেলে কী যেন পরখ করে দেখলেন, তারপর বললেন, 'এটা জুম্মের রাস্তা।' এর উল্টোদিকের পথটা আরো সময় নিয়ে দেখলেন তিনি, তারপর জানালেন, এটা গ্রামের রাস্তা নয়। কাজেই নাকবরাবরের পথ ধরেই এগিয়ে চললাম আমরা। তিন পথের সঙ্গমস্থলে থকথক করছে কাদা, কয়েকটা বাঁশ ফেলে রাখা হয়েছে সেখানে, তার ওপর সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেলাম সবাই।

আরো মিনিট দশেক হাঁটতেই এক অদ্ভুত প্রান্তরে এসে পৌঁছুলাম যেন। পেছনে তাকিয়ে দেখি, বিশাল এক পাহাড় যেন কটমটিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, যেন বলছে সে, এবারের মতো ছেড়ে দিলাম, আবার এদিকে পা বাড়াবি তো দেখিস ---! সামনে বাঁদিকে অনুচ্চ খাড়া দেয়ালের মতো পাহাড়ের সারি, ডান দিকেও তাই। আর এই দুই সারির মাঝে, যতদূর চোখ যায়, সমতলের বুক চিরে চলে গেছে একটা পায়ে চলা পথ, পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে চাঁদ, শুধু নক্ষত্রের রোদে চকচক করছে সেই সাদা রাস্তা।

পথের গোড়াতেই একটা টংঘর চোখে পড়লো, তেপান্তরের মাঠে একা বধূর মতো বসে। হাতের লাঠিটা এতক্ষণ বিচ্ছিরি বদখদ পথে পদে পদে আমার প্রাণ রক্ষা করেছে, সমতলে এসে তাকে সযত্নে শুন্যে তুলে জোর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। মিলন ভাই একটু অসুস্থ বোধ করছেন, তাকে খানিকটা পানি খাইয়ে একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিয়ে তাঁর পিছু পিছু চলতে শুরু করলাম। দূরে, আমার বাঁয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আবছাভাবে চোখে পড়ছে একটা টংঘরের ছায়াবয়ব, বাঁয়ে গাঢ় অন্ধকার।

ফেব্রুয়ারির সেই রাতে, সেই সমতল পথে ঠিক কতক্ষণ পা চালিয়েছি, এই অক্টোবরে এসে আমার ঠিক মনে পড়ছে না, মাইল তিনেকের মতো পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। পাহাড়ে পথ চলার সময় পূর্ণ মনোযোগ থাকে পথের ওপর, কিন্তু সমতলে পা পড়লে মনের রাশ যেন শিথিল হয়ে পড়ে। এ পথে চলতে চলতে মাথায় ভিড় জমিয়েছে হাজারো চিন্তা, প্রিয়জনের মুখ মনে পড়েছে কয়েকবার, হয়তো এই বিপজ্জনক পথে চলতে চলতে নিজেকে নিয়ে খুব বেশি বিব্রত ছিলাম বলেই আর কারো কথা ভাবার সুযোগ মেলেনি।
রবিবুড়োর বীরপুরুষ কবিতাটার কথা ভাবছিলাম,

চোরকাঁটাতে মাঠ রয়েছে ঢেকে
মাঝখানেতে পথ গিয়েছে বেঁকে।
গোরু বাছুর নেইকো
কোনোখানে,
সন্ধে হতেই গেছে গাঁয়ের পানে,
আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে,
অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো। ---


অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না বলেই চলতে চলতে হঠাৎ যেন সালেহীনের সাথে প্রায় ধাক্কা খেলাম। তাকিয়ে দেখি, কাছেই ঠায় দাঁড়িয়ে সৈকত। কী ব্যাপার, এই দু'জন এখানে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে কেন? উত্তরটাও পেয়ে গেলাম সাথে সাথেই, আমাদের তিনজনের সামনে, গজ বিশেক দূরে, পাশের মাঠ থেকে পথের ওপর উঠে এসেছে কয়েকটি বিশাল আকৃতির ছায়া, আর প্রতিটি ছায়ার ওপরদিকে একজোড়া করে সবজে চোখ মিটমিট করছে তারার আলোয়!

কী ভাই, ঘাবড়ে গেলেন নাকি?

'ভয়ের কিছু নেই, ওগুলো তো গয়াল!' সালেহীনকে অভয় দিচ্ছিলাম বটে, কিন্তু নিজের গলাই শুকিয়ে গিয়েছিলো আশঙ্কায়। সালেহীনও আমার বক্তব্যে খুব একটা আশ্বস্ত হলো না। পরিস্থিতি বেশ মিলে যাচ্ছিলো রবিবুড়োর কবিতার সাথে, কিন্তু এই গরুগুলো হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলো? এ কথা সত্য, যে গয়াল আসলে এক ধরনের গরু, কিন্তু বেশ বড়সড়, পোক্ত ও দুর্দান্ত স্বভাবের গরু। এরা কোন কারণে চটে গেলে দল বেঁধে গুঁতিয়ে দিতে আসে। আমরা তিনজন আমাদের হাতের পলকা লাঠি দিয়ে এদের ঠেকাতেও পারবো না, কিংবা এদের সাথে দৌড়েও কুলিয়ে উঠতে পারবো না। গ্রামের লোকজন বোধহয় এদের রাতের বেলা এমনিতেই ছেড়ে রাখে, বিনে পয়সার পাহারাদারি করার জন্যে।
অপরিচিত লোক দেখলেই বোধহয় গয়ালগুলো ফুঁসে ওঠে, তাছাড়া এখন রাত বাজে প্রায় দেড়টা, এ সময়ে কোন ভদ্রলোক এ পথে চলাফেরা করে না, কাজেই গয়ালগুলোর মনে সন্দেহের উদয় হওয়াটা স্বাভাবিক। আমরা স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম মিনিট তিনেক, গয়ালগুলো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখে নিয়ে হঠাৎ আবার মাঠে ফিরে গেলো। কেবল একটা ছোটখাটো গয়াল ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো পথের ওপর। যে-ই না একটা পা সামনে বাড়িয়েছি, অমনি স্পেনের রাস্তার সেই মদ্যপ ষাঁড়ের মতোই গোটা শরীরে একটা ঢেউ তুলে তেড়ে এলো সে।

গয়াল তো আর রয়াল বেঙ্গল নয়, মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দিলাম, চোখের ওপর টর্চ ফেলে। টর্চের আলো দেখেই পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো সে, থেমে দাঁড়ালো, কিন্তু ফিরে গেলো না। মাটিতে খুর ঠুকলো কয়েকবার, লেজ সাপটালো, কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কুটিল চোখে দেখতে লাগলো আমাদের। গ্রামের লোক বোধহয় একে দানাপানি কিছুটা বেশি খাওয়ায়, তাই পাহারাদারির কাজে নিমকহারামি করতে চাইছে না গরুটা।

সৈকত পরামর্শ দিলো, 'হিমু ভাই, চলেন একটু ঘুরে যাই।'

অতি উত্তম প্রস্তাব, পথের পাশে একটু ঘুরে যাবার মতলবে টর্চটা নিবিয়ে পা বাড়াতেই দেখি ব্যাটা আবার তেড়ে আসে! এবার মেজাজটাই গেলো খারাপ হয়ে, টর্চ জ্বেলে এগিয়ে গিয়ে কড়া একটা ধমক দিলাম, 'কী ব্যাপার? কী চাও তুমি? এমন করছো কেন, বেয়াদব? --- দুষ্ট গরু কোথাকার!'

এবার বোধহয় ব্যাটার বোধোদয় হলো, কান দুটো খানিকক্ষণ নেড়েচেড়ে পথ থেকে সরে দাঁড়ালো সে। আমরা গটগটিয়ে এগিয়ে গেলাম, একবার পেছন ফিরে দেখি, তখনও পথের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ব্যাটা।

পুতুল আপার সাথে মংক্ষিয়াদা আছেন, কাজেই গয়াল ওঁদের কোন অনিষ্ট করতে পারবে না, এই ভরসায় সামনে এগিয়ে গেলাম। আরো প্রায় মিনিট বিশেক হাঁটার পর চোখে পড়লো গ্রামটা, পাহাড়ের ওপর কতগুলো কুটির। চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। সম্ভবত গ্রামে কোন কুকুর নেই, অথবা তারা পেটভরে খেয়েদেয়ে ঘুম দিয়েছে, নইলে এতক্ষণে পাড়া মাথায় তুলে ফেলতো।

প্রাংশা ত্রিপুরাদের গ্রাম। আমরা ত্রিপুরা ভাষা জানি না, আমাদের চেহারাসুরত হাবভাব সন্দেহজনক, তাছাড়া রাত বাজে প্রায় দু'টো, এমন পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীদের মুখোমুখি হলে কোন সন্তোষজনক তথ্যের আদানপ্রদান সম্ভব নয়। তাই গ্রামের প্রবেশপথের মুখে, মোটামুটি পরিস্কার দেখে একটা জায়গায় বসে পড়রাম সবাই। সবাই আগে এক জায়গায় জড়ো হই, তারপর মংক্ষিয়াদা আমাদের হয়ে যোগাযোগ করতে পারবেন।

থেমে থেমে ঝটকা দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে আসছে হিম বাতাস, কিন্তু ক্লান্ত হয়ে রুকস্যাকটাকে বালিশ বানিয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, আমার পাশে শায়িত মিলন ভাই সম্ভবত ঘুমিয়েই পড়েছেন, হঠাৎ দেখি চঞ্চল তেড়েফুঁড়ে উঠে পড়েছে। সে আর দেরি করতে রাজি নয়, বাকিটা পথ সে কোন একটা টংঘরেই শুয়ে কাটিয়ে দিতে পারবে। টংঘরের সন্ধানে আবারও পথে বেরিয়ে পড়েছে ব্যাটা, এমন সময় দেখা গেলো, দলের বাকি চারজন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন।

স্বল্পভাষী মংক্ষিয়াদাকে পরিস্থিতিটা ব্যাখ্যা করার দরকার হলো না, আমাদের গ্রামের গোড়ায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে তিনি শুধু বললেন, 'ভালো করেছেন।' তাঁর পিছু পিছু আমরা এগিয়ে গেলাম। গ্রামের ঢোকার প্রবেশ পথ মজবুত বেড়া দিয়ে আটকানো, তবে সেই চিরাচরিত কাঠের গুঁড়ির সিঁড়ি বেড়ার গায়ে লাগানো আছে। সেটা বেয়ে বেড়া টপকে গ্রামে ঢুকে একটা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম সবাই। মংক্ষিয়াদা নিচু গলায় ডাকলেন, 'বেঈ, এ বেঈ, বেঈ? --- এএ বেঈ, বেঈ!'

খানিকক্ষণ ডাকাডাকির পর ভেতর থেকে সাড়া মিললো তীক্ষ্ণ গলায়। মারমা বা ত্রিপুরা ভাষা আমরা বুঝি না ঠিকই, কিন্তু সব ভাষার সুরেই কিছু সাধারণ গুণ থাকে, তাই মংক্ষিয়াদার গলায় ক্ষমাপ্রার্থনার টান, আর ভেতর থেকে আশ্বাসের সুর আমাদের বুঝতে কষ্ট হলো না, চাপা একটা স্বস্তির শ্বাস সবার বুক থেকেই বেরিয়ে এলো।



পাঁচ: এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো ---?

আমিই বলে দিচ্ছি কেমন হতো --- এই আর্টিকেলটা পড়ার দুর্ভাগ্য আপনার হতো না। যে পথ আমরা পাড়ি দিয়ে এসেছি, সে পথে যে সন্ধ্যের পর পাহাড়িরাও চলাফেরা করে না, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছি আমরা, কারণ সন্ধ্যের পর থেকে স্থানীয় কোন মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়নি। পরে জানতে পেরেছি, এ পথে রাতে পাহাড়ি চিতা আর ভালুক ঘোরাফেরা করে। যা-ই হোক, বাকিটুকু শুনুন।

প্রাংশাপাড়ায় এক কুটিরের ভেতর, বৈঠককক্ষে লাকড়ির আগুনের সামনে বসে আছি আমরা কয়েকজন। এখন রাত পৌনে তিনটা। আমাদের সবার জুতো বাইরে বারান্দায় রাখে, ঘরের এক কোণে বিশাল ব্যাগের স্তুপ, আর ভেতরে ও বাইরের ঘরে সারিসারি স্লিপিং ব্যাগ পাতা। কুটিরের কর্ত্রী এই নৈশ উপদ্রবে কিছু মনে করেছেন বলে মনে হলো না, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের ঘরেই আমাদের শুয়ে পড়তে বললেন। ভেতরের ঘরে তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য ঘুমিয়ে ছিলো, আমাদের উৎপাতে তাদের ঘুম ভেঙে গেছে, কিন্তু গৃহকর্ত্রী সংক্ষেপে সবকিছু বুঝিয়ে বললেন তাদের, আবার ঘুমোতে চলে গেলো তারা। তাদের পায়ের কাছেই আরেক সারি বেঁধে স্লিপিং ব্যাগ পাতা হলো। ভেতরের ঘরের এক কোণায় একটা মাটির পাত্রে ধিকিধিকি জ্বলছে কাঠের আগুন, ঘরের ভেতর আগুন না জ্বললে জমে হিম হয়ে যাবেন তারা। সেই আগুনকে ঘিরেই ঘনীভূত হয়ে শুয়ে পড়েছে দলের কয়েকজন। ভাবছিলাম, ঢাকায় রাত আড়াইটার সময় একদল অপরিচিত মানুষ আমার বাড়িতে ঘুমোবার বায়না ধরলে আমি কী করতাম?

আগুনের পাশে বসে, নিজের ক্ষতিগ্রস্থ পায়ের পেশীতে কিছুক্ষণ ব্যথাবিমোচক মালিশ করলাম, পায়ের গোড়ালি আর তালুতে বিশাল তিনটা ফোস্কা পড়েছে। শাহেদ ভাই আর বরুণদার কাছে খানিকটা চিঁড়া ছিলো, তারই এক মুঠো মুখে গুঁজে দিয়েছি। বরুণদা কয়েকজনকে প্রলোভন দেখালেন, আরো কিছুক্ষণ জেগে থাকলে মুরগির ইনস্ট্যান্ট স্যুপ জুটবে কপালে। কিন্তু মুরগি নিয়ে কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না, পটাপট স্লিপিং ব্যাগের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে সবাই, আমিও তাদেরই দলে।

ক্লান্তি এসে ঘুমের টুঁটি চেপে ধরেছে, তাই রাতের বাকিটা কাটলো একটি অসহনীয় তন্দ্রার ঘোরে। ঘরে আগুন জ্বলছে, স্লিপিং ব্যাগ আর জ্যাকেটের ভেতরে আমি, তবুও কুটিরের নিচে বয়ে যাওয়া হিম হাওয়ায় শরীর অবশ হয়ে এসেছে। এই তন্দ্রার ঘোরটাও ভেঙে গেলো বরুণদার ডাকে। 'মংক্ষিয়াদা! শাহেদ ভাই! হিমু! উচ্ছল!' সবার নড়াচড়ার আওয়াজ পেয়ে আমিও স্লিপিংব্যাগের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলাম। বরুণদা রাতে আর ঘুমাননি, জেগেই কাটিয়ে দিয়েছেন।

সবাই উঠে হাতমুখ ধুয়ে ফিরতে ফিরতেই মংক্ষিয়াদা সবাইকে থালা বার করার ডাক দিলেন, ভাত, ডাল আর লাউ রান্না করা হয়েছে। কারো মুখে কোন কথা নেই, চুপচাপ খাচ্ছে সকলে। একেজনের চোখমুখ বসে গেছে, একুশ ঘন্টা টানা হাঁটার পর তিন ঘন্টা শোবার অবসর পেয়েছে সবাই, কাজেই চেহারা খোলতাই হবার কোন সুযোগ নেই। তবুও খানিকটা বিশ্রাম আর খানিকটা খাবার কিছুটা নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পেরেছে আমাদের মাঝে, সময় নষ্ট না করে আবারও বেরিয়ে পড়লাম সকলে। আমাদের গৃহকত্রর্ীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তাঁর পাওনাগন্ডা বুঝিয়ে দিয়ে গাঁয়ের বুক চিরে চলে যাওয়া পথটা ধরে এগিয়ে গেলাম আমরা। আজ সাথে এক গ্রামবাসীকে পাওয়া গেলো, যে রুমাবাজারে যাবে, আমাদের দলকে সঙ্গ দিতে রাজি হলো সে।

কিছুদূর যেতে না যেতেই একটা ছড়ার মুখোমুখি হলাম আমরা। গ্রামবাসী অক্লেশে কাপড়ে কাছা মেরে এর জানুস্পর্শী কাদাপানি ঠেলে পার হয়ে যান, কিন্তু আমরা পড়লাম সমস্যায়, কোমর পর্যন্ত ভেজা প্যান্ট নিয়ে পথ চলা সম্ভব নয়, তবে সমাধান বের করতে খুব একটা দেরি হলো না, মিনিট দশেক খোঁজাখুঁজির পর লম্বা দেখে দুটো বাঁশ ফেলে একটা তাৎক্ষণিক সাঁকো তৈরি হয়ে গেলো। সেই টালমাটাল সাঁকো একে একে পেরিয়ে জোর পায়ে দূরের পাহাড়সারির দিকে চলতে শুরু করলাম আমরা। সাতটা বেজে গেছে, আমাদের দুপুরের মধ্যে রুমাবাজারে পৌঁছুতে হবে।

আজও পথ চলে গেছে ছড়ার মধ্য দিয়ে, কিন্তু গতরাতের মতো অত দীর্ঘ নয়, খানিকটা হাঁটতেই আবার পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম আমরা। ঝুরঝুরে কাঁকর আর বালিভর্তি পথে ধুপধাপ পা ফেলে ঘন্টাখানেক চলার এক অপূর্ব জায়গায় পৌঁছলাম আমরা। পাহাড়ের মাঝে একটা গভীর খাদ, পাহাড়ের ঢাল ঘাস আর হলদে-সোনালী ঝোপে ছাওয়া, মাঝে মাঝে কয়েকটা প্রকান্ড শিরীষ গাছ খাদের মধ্য থেকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আকাশ আজও পরিষ্কার, নীল আর সবুজ যেন ফেটে পড়ছে চারদিকে। প্রাংশাবাসী সেই ভদ্রলোক আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন, একটা পাঁচ বছরের ক্ষুদে বাচ্চাকে সাথে নিয়ে কোন অ্যাথলেটের যেমন হাঁটতে বেরোলে সমস্যা হয় --- এখানে পৌঁছে তিনি মংক্ষিয়াদাকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, এই গতিতে চললে রাত আটটার মধ্যেও রুমায় পৌঁছুনো যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত হলো, যাদের আগামীকাল অফিস করার খুব জরুরী তাড়া আছে, তারা দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে যাবে, বান্দরবানে পৌঁছে শেষ বাস, যেটা রাত আটটায় ছাড়ে, সেটা ধরার চেষ্টা করবে তারা, আর পেছনের দলের জন্যে অপেক্ষা করবে। আর যাদের তেমন একটা তাড়া নেই, তারা পুতুল আপাকে দেখেশুনে রাখবে, ওঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলবে। পুতুল আপার নিজেরও অফিসের তাড়া আছে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তিনি আহত পা নিয়ে একটু পিছিয়ে পড়েছেন। আগুয়ান দলে যোগ দিলেন বরুণদা, উচ্ছল ভাই, সৈকত আর মিলন ভাই, তাঁদের গাইড হয়ে চললেন সেই প্রাংশাবাসী। তাঁরা এগিয়ে যাবেন, আর কোন রাস্তা একাধিক দিকে ভাগ হয়ে গেলে সঠিক পথে চক দিয়ে টিক চিহ্ন দিয়ে যাবেন।

এ সিদ্ধান্ত হতে না হতেই সাঁই সাঁই করে পা চালিয়ে এগিয়ে গেলেন পাঁচজন, আমরা কিছুটা ধীরে পথ চলতে লাগলাম। বড়থলি ক্যাম্পে সেনারা জানিয়েছিলেন, প্রাংশা থেকে রুমাবাজার পর্যন্ত রাস্তা অতি চমৎকার, কেবল নেমে যেতে হবে, শুধু মাঝখানে এক জায়গায় ময়না পাহাড় বলে একটি বস্তু রয়েছে, যেটি সৈনিকদের মাথাও ঘুরিয়ে দেয়।
আমি আর সালেহীন চলতে চলতে একটু এগিয়ে গেলাম, বাকিরা একটু ধীরে পা চালিয়ে পুতুল আপার সঙ্গে রইলেন। কিন্তু পা মচকে গেলেও পুতুল আপা যথেষ্ঠ দ্রুত হাঁটছেন, তাই দলের গতি খুব একটা মন্থর হলো না। কিছুদূর এগিয়ে আমি আর সালেহীন অপেক্ষা করতে লাগলাম বাকিদের জন্যে, তাঁদের দেখা গেলেই আবার উঠে পড়ছি, আবার মিনিট বিশেক হেঁটে একটু বসছি। চলতে চলতে কয়েক জায়গায় পথ দু'তিনভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু অগ্রগামীদের চকচিহ্ন দেখে সঠিক পথে পা বাড়িয়েছি আমরা।

পথ চলে গেছে পাহাড়ের নিরাপদ এলাকা দিয়ে, পথের পাশে কোন খাদ নেই। যত পথ চলছি, ডানে আর বামে আরো নতুন সব পাহাড় চোখে পড়ছে। পাহাড়ের পাশে কয়েক জায়গায় বাঁশের ঝাড় কেটে সাফ করা হচ্ছে, কোথাও ঝোপে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে পাহাড়ের ঢাল --- জুম্ম চাষের প্রস্ততি। মাথার ওপর এই অভিযানে প্রথম মেঘের দেখা পেলাম, তার আড়ালে কিছুক্ষণ পর পর গিয়ে যেন পোশাক পাল্টে আসছেন সূয্যিমামা, প্রত্যেকবার তাঁর বেশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে, আর এদিকে গলদঘর্ম হচ্ছে তাঁর পথচলা ভাগ্নের দল। আজ পথে কোন ছায়া নেই, একেবারে ন্যাড়ামুন্ডি পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলছি আমরা।

খানিকটা এগিয়ে পথের পাশে একটা মুদি দোকান পড়লো, রুমাবাজার থেকে যাত্রার পর এই প্রথম। আমি আর সালেহীন সেখানে গুটগুটিয়ে ঢুকে পড়লাম, চা খাবো বলে। অবশ্য চায়ের সাথে টা-ও মিললো, গ্লুকোজ বিস্কুট। আমরা বসতে না বসতেই চঞ্চল এসে হাজির, তিনজন মিলে চা আর বিস্কুট দিয়ে নাস্তা সারলাম। দোকানিয়া বুড়োর সাথে আলাপ করে জানা গেলো, আমাদের দলের বাকিরা মিনিট পনেরো আগে দোকান থেকে বেরিয়েছেন। রুমাবাজার আর কতক্ষণের পথ, জানতে চাইলে বুড়ো হেসে জানালেন, কতো আর, ঘন্টা দেড়েক? একটু আশ্বস্ত হলাম, তাহলে চারঘন্টার মধ্যে রুমায় পৌঁছে যাবো!

পেটপূজা করে বেরোচ্ছি, এমন সময় দলের বাকিরা এসে উপস্থিত। তাঁদের বিদায় জানিয়ে এবার আমি, সালেহীন আর চঞ্চল পা বাড়ালাম। চঞ্চল আবার কয়েকটা বড়ই কিনে নিয়েছে দোকান থেকে, সেগুলো দাঁতে কাটতে কাটতে এগিয়ে গেলাম। পাহাড় থেকে নামার আনন্দ অন্যরকম, তাতে শারীরিক কষ্ট কিছুটা কম, আর যে পথ ধরে নামবো, সেটার অনেকখানি ওপর থেকে চোখে পড়ে।

ঘন্টাখানেক বৈচিত্র্যহীন পথে চলতে চলতে একসময় একটা পিচ্ছিল খাড়াই হাঁচড়ে পাঁচড়ে পার হয়ে আমার আর সালেহীনের চক্ষুস্থির হয়ে গেলো। সামনে একটা বাঁক ঘুরে পথ উঠে গেছে একটা পাহাড়ে। খুব একটা উঁচু সেটা নয়, কিন্তু এখান থেকেই পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, পথের ঠিক নিচেই গভীর, অনেক গভীর খাদ। খাদের দেয়ালে দুয়েকটা ঝোপঝাড় গজিয়েছে বটে, কিন্তু সেই পথে যদি কারো পা পিছলে যায়, সোজা গিয়ে সেই খাদে পড়তে হবে। এটাই তাহলে সেই ময়না পাহাড়!

বিবরণক্লান্ত পাঠককে সেই ময়না পাহাড়ে ওঠার দুঃসহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে পীড়ন করার ইচ্ছে আমার ছিলো না, তবু বলি, বড়জোর সাততলার সমান উঁচু সেই পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে ঝাড়া পনেরো মিনিট সময় লেগেছে আমার। পথটা পাক দিয়ে পাহাড়ের কিনারা ধরে উঠে গেছে, গোটা পথটা অসম্ভব খাড়া, প্রায় সত্তর ডিগ্রীর মতো হবে, আর অসম্ভব পিচ্ছিল, পা রাখতে না রাখতেই পায়ের নিচের মাটি আর বালি ঝুরঝুর করে খসে আসতে থাকে। হাতের কাছে একটা কিচ্ছু নেই আঁকড়ে ধরার, পথের ওপর গেঁথে থাকা পাথরে হাত রাখলে আলগা হয়ে আসে, গাছের শুকনো শিকড় আঁকড়ে ধরতে গেলে ভেঙে আসে। পথের ওপর স্থির হয়ে থেমে থাকার জো নেই, গোটা শরীর অতি ধীরে নিচে নেমে আসতে থাকা। একবার শুধু ভুল করে ঘাড় ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়েছি, দেখি বহু নিচে অন্ধকার মুখব্যাদান করে আছে।

সালেহীন সাবধানে পা ফেলে উঠে গেছে ওপরে, আমার জন্যে মিনিট পাঁচেক বসে ছিলো সে। অর্ধেক পথ পেরোনোর পর শুনলাম, সে ডাকছে, 'হিমু ভাই, ঠিক আছেন তো?' পান্ডব যুধিষ্ঠির পর্যন্ত মিথ্যে কথা বলে তার রথের চাকা ধূলোয় লুটিয়েছিলো, আর আমি তো এই পান্ডববর্জিত দেশের এক সামান্য মানুষ, শুনতে পেলাম জোর গলায় বলছি, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছি, আসছি এখুনি!' ওদিকে দূর থেকে আমাকে পাহাড়ের গায়ে ঝোঝুল্যমান অবস্থায় দেখে চঞ্চল দ্রুত এগিয়ে এসেছে, যদি কোন সাহায্যের দরকার হয়, আমি ওঠার মিনিট তিনেক পরই দেখি উঠে এসেছে সে।

পাহাড়ের ওপর একটা ঝোপের পাশে বসে হাঁপাচ্ছিলাম সবাই, আর ঢোঁক গিলছিলাম পুতুল আপার কথা ভেবে। একটা অচল পা নিয়ে এই ঈশ্বরপরিত্যক্ত পথে কিভাবে উঠবেন তিনি? ব্যাগগুলো খুলে রেখে পথের ওপর আবার গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। সাথে দড়ি আছে, প্রয়োজন হলে দড়ি বেয়ে উঠে আসতে পারবেন পুতুল আপা। পাহাড়ের ওপর থেকে পথটা দেখা যায় না, তাই আমরা খানিকটা নিচে নেমে গিয়ে দাঁড়ালাম। মিনিট পনেরো পর দলের বাকিদের কন্ঠস্বর কানে এলো। চঞ্চল হাত বাড়িয়ে ব্যাগগুলো তুলে নিয়েছে, আর পুতুল আপাকে নিয়ে ওপরে উঠছেন শাহেদ ভাই আর মংক্ষিয়াদা। শাহেদ ভাই পেছনে পেছনে আসছেন, যাতে পুতুল আপা পিছলে পড়ে যেতে না পারেন, আর তাঁর হাত ধরে টেনে তুলছেন মংক্ষিয়াদা। সবাই ওপরে উঠে যাবার পর শাহেদ ভাইয়ের খেয়াল হলো, তাঁর বিশেষ ট্রেকিং প্যান্টের একটা পায়া খুলে পড়ে গেছে, তিনি আবার নিচে নেমে সেটা উদ্ধার করে ফিরলেন।

ময়না পাহাড়ের ওপরে সবার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসার পর কয়েক ঢোঁক পানি খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম আমরা। সেনাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ময়না পাহাড়ের পর আর কোন ফাঁড়া নেই, পথ কেবল নেমে গেছে পাহাড়ের শিরদাঁড়া ধরে। আমি, সালেহীন আর চঞ্চল কিছুক্ষণ একসাথে এগোলাম, আধঘন্টা চলার পর চঞ্চল আর সালেহীন জোর পা চালিয়ে নিচে নেমে গেলো, আমি ধীরেসুস্থে পথ চলতে লাগলাম। পায়ের নিচের ফোস্কা দুটো একেবারে জ্বালিয়ে মারছে, মাটিকে পায়ের গোড়ালি ঠুকে ঠুকে এগোতে হচ্ছে।

সূর্য মাথার ওপর থেকে একটু ঢলে গেছে, আমার সামনে দূরে সাঙ্গু উপত্যকা, পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সারির বুক চিরে বয়ে যাওয়া রূপালি ফিতের মতো নদীটাকে। সাঙ্গুর কিনারায় গড়ে ওঠা বিরাট জনপদটাকেও পুরোটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে।

দুপুর তিনটার দিকে, ময়না পাহাড় পেরিয়ে আসার পর ঘন্টা দুয়েক হেঁটে একসময় নিউ ইডেন পাড়ার ভেতর দিয়ে রুমাবাজারে এসে পৌঁছেছি। মাঝে একটা টংঘরে মিনিট পাঁচেক বসেছিলাম, কিন্তু মশার ভনভন শুনে চটপট উঠে পড়েছি। রুমাবাজার যতো এগিয়ে আসছে, পথের পাশে কলাগাছের সংখ্যা ততই বাড়ছে। কলাগাছের গোড়ার মাটি খুব ঝুরঝুরে হয়, তাই পথের শেষ অংশ খুব সাবধানে পার হতে হয়েছে। পথে দেখা হলো আমাদের সেই প্রাংশাবি সঙ্গীপথিকের সাথে, রুমায় বাজারসদাই করে ফিরছেন তিনি, আমাদের প্রথম দলের সঙ্গীরা রুমায় পৌঁছে গেছে, জানালেন। আর নিউ ইডেন পাড়ার গোড়ায় পাহাড় থেকে সমতলে নামার জন্যে একটা ধাপকাটা কুন্ডলীর মতো পথ আছে, সেটার কথাও আমি কখনো ভুলবো না। এক পা এদিক ওদিক হলে শ'খানেক ফিট নিচের ছড়ায় পড়ে মরার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিলো ওখানে।

নিউ ইডেন পাড়ায় পৌঁছে একটা জায়গায় পথের পাশে বাঁশের অ্যাকুয়াডাক্ট পাওয়া গেলো। আমার বোতলটা সেই ঠান্ডা পানিতে ভরে নিয়ে ভালো করে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। তারপর সময় নিয়ে পুরো এক বোতল পানি খেলাম, ভয়ানক তৃষ্ণা পেয়ে গিয়েছিলো। ঠান্ডা মাথা আর ঠান্ডা পেট নিয়ে পাড়ার ভেতর দিয়ে কৌতূহলী মানুষের দৃষ্টি ঠেলে চললাম। পথের দু'পাশে কুটির, কুটিরের সামনে শিশুরা খেলা করছে, বারান্দায় তাঁতে চাদর বুনছেন মহিলারা। কুটিরের আশেপাশে অবাধে চরছে কয়েকটা কুকুর আর অগণিত শূকর। এক জায়গায় দেখলাম, পথের ওপর একটা বাচ্চা মেয়ে খুব যত্ন করে একটা শুকরকে খৈল খাওয়াচ্ছে, আর তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আরো খানিকটা সামনে গিয়ে দেখি একটা বিশাল মাদী শূকর রাস্তায় চিৎপাত হয়ে শুয়ে, আর ঝাঁপিয়ে পড়ে দুধ খাচ্ছে তার পাঁচটা বাচ্চা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দে পাড়া মাথায় উঠে যাবার যোগাড়।

সালেহীন আর চঞ্চলকে এখন কোথায় পাই? সাতপাঁচ ভেবে উল্টোদিক থেকে এগিয়ে আসা এক মহিলাকে বিনীতভাবে নমস্কার করে জানতে চাইলাম, আমার মতো পিঠে ব্যাগ নিয়ে কাউকে দেখেছেন কি না। তিনি প্রতিনমস্কার করে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন। চলতে চলতে তাঁর সাথে বেশ আলাপ জমে উঠলো। ঢাকায় দুয়েকবার গিয়েছেন তিনি, ভালো লেগেছে তাঁর কাছে, জানালেন। আমাদের সম্পর্কে পাহাড়িদের বেশ কৌতূহল, বিশেষ করে নিউ ইডেন পাড়া দিয়ে কোন অভিযাত্রীকে চলতে দেখেননি তাঁরা, অন্য যারা আসে তারা লাইরুনপিপাড়া হয়ে কেওকারাডঙের দিকে চলে যায়। আমরা প্রাংশাপাড়া থেকে আসছি শুনে বেশ উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন তিনি, সেখানে তাঁর দিদি থাকেন, ত্রিপুরাদের অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী তিনি।

মিনিট পাঁচেক পথ চলার পর একটা দোকানে চঞ্চল আর সালেহীনকে পাওয়া গেলো, আয়েশ করে কোমল পানীয়ে কঠোর চুমুক দিচ্ছে তারা। আমার পথপ্রদর্শিকা দিদিকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে দোকানের ভেতরে গিয়ে বসলাম, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমার বরাদ্দ বিস্কুটটুকুর ওপর। সালেহীন জানালো আরেক দুঃসংবাদ, আগামীকাল নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামে সড়ক অবরোধ, তার পরদিন আবার হরতাল! আজ যে করেই হোক, ঢাকার বাস ধরতে হবে আমাদের।

দোকানিয়া প্রৌঢ়া দিদির নাম ফুলের মালা চাকমা, তাঁর সাথে বেশ আলাপ জমে উঠলো। তিনি রাঙামাটির শুভলঙের বাসিন্দা ছিলেন, কাপ্তাই হ্রদের নিচে সব ডুবে যাবার পর এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছেন তিনি। ফুলের মালা দিদির সাথে আলাপের এক পর্যায়ে মঞ্চে প্রবেশ ঘটলো আরেক উপদ্রবের, এক পাঁড় মাতাল বম, দিনে দুপুরে মদ খেয়ে হল্লা করছে সে। আশেপাশের লোকেরা চেয়ে চেয়ে তার কান্ড কারখানা দেখছে শুধু। কয়েকবার খেদিয়ে দেবার পরও গায়ে পড়ে এসে উৎপাত শুরু করলো সে, স্থানীয়দের অনুরোধ করলাম, একে সরে যেতে বলার জন্যে, কিন্তু কেউ গা করলো না। অগত্যা আধঘন্টা তার হৈচৈ-চিৎকার-গালাগালি সহ্য করার পর তাকে পাকড়াও করে রাস্তায় বার করে নিয়ে এলাম, বাসায় চলে যেতে বললাম। তখন শুরু হলো আরেক জ্বালা, সে তার বাসায় আমাদের মদের দাওয়াত দিতে চায়।

লোকটা একটু তফাতে হঠার পর স্থানীয় চ্যাপেলের পাস্তর এসে দেখা করে গেলেন আমাদের সাথে। এমন সময় দেখি শাহেদ ভাই এসে হাজির, আরো দশ মিনিট পর পুতুল আপা আর মংক্ষিয়াদাও পৌঁছে গেলেন। ফুলের মালা দিদি মিষ্টি হেসে করমর্দন করে বিদায় জানালেন আমাদের, আমরা দ্রুত পায়ে এগিয়ে চললাম ঘাটের দিকে। চারটা বাজেনি এখনও, পাঁচটার মধ্যে ক্ষক্ষ্যংঝিরি পৌঁছুতে হবে, রুমা-বান্দরবান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে এরপর। এরই মধ্যে কোত্থেকে আবার এসে উদয় হয়েছে সেই মাতাল ব্যাটা, পুতুল আপাকে জ্বালাতন করার উদ্যোগ নিয়েছে সে। এবার আর কথা বাড়ালাম না, একটা মাপা ধাক্কা দিতেই সে টলতে টলতে রাস্তার পাশে ধপাস করে পড়লো, আশেপাশের লোকজন বিরাট এক হর্ষধ্বনি তুললো, বুঝলাম, এমনটা প্রায়ই হয়।

ঘাটে গিয়ে বরুণদার প্রাক্তন গাইড জুয়ামের সাথে দেখা। নৌকো নিয়ে দর কষাকষি হলো খানিকটা, চাটগাঁ থেকে এসে বসত গেড়ে বসা চ্যাংড়া মাঝি কিছুতেই চলতি মাথাপিছু ভাড়ায় নৌকো ভাসাবে না, তার নৌকো এখন রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে হবে। শাহেদ ভাই আর মংক্ষিয়াদা যথাক্রমে নরম ও গরম সুরে কিছুক্ষণ দর কষাকষি করার পর নৌকো পানিতে ভাসলো। কিন্তু এই ছোকরা মাঝি একা লগি বাইলে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে, সব কাজের কাজি মংক্ষিয়াদা তাই আরেক প্রান্তে বসে লগি হাতে তুলে নিলেন। মাঝে মাঝে লগি নামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি, আর এক ঢোঁক পানীয় খেয়ে নিচ্ছেন।

নৌকো ছুটে চলেছে অগভীর সাঙ্গুর ওপর দিয়ে। বাংলায় এর নাম শঙ্খ, বর্মী ভাষায় রিগ্রিক্ষ্যং। নদীর দুপাশে ঘন অরণ্যে ঢাকা খাটো খাটো পাহাড়, আর বালিতে ঢাকা পাড়ে কমলার ক্ষেত, প্রতি বছর রুমা থেকে লাখ লাখ কেজি কমলার চালান যায়। সূর্য আকাশ থেকে হারিয়ে গেছে, সন্ধ্যের ছাতা একটু একটু করে খুলছে চারপাশে, সেই ফুরিয়ে আসা আলোয় হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে নদীর ওপর ঝুঁকে আসা গাছের ডালে অপূর্ব রঙিন সব পাখি।

ক্ষক্ষ্যংঝিরিতে পৌঁছে দেখি ঝিরঝির করে বৃষ্টি নেমেছে। সবাই হুড়মুড়িয়ে ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেলাম গাড়ি ভাড়া করার জন্যে। খানিক বাকবিতন্ডার পর একটা গাড়ি পাওয়া গেলো, সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তৈরি, তার স্টিয়ারিং আবার বাম দিকে, চালক জানালেন, এটা রুশ রাষ্ট্রের গাড়ি। গাড়িতে আমাদের সঙ্গী হলেন রুক্ষ চেহারার দুই ব্যক্তি, তাঁদের হাতে ওয়্যারলেস, হাবভাব দেখে গুন্ডা বদমাশ মনে হলেও আসলে তারা পুলিশ। এ পথে তাঁরা কারো না কারো চাঁদের গাড়িতে লিফট নিয়ে থাকেন, এটাই নিয়ম।

গাড়িচালক খালেক সাহেব অভিজ্ঞ ড্রাইভার, বিপজ্জনক রুমা-বান্দরবান সড়কে সোঁ সোঁ করে গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন তিনি, গাড়ির ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ শুনলে মনে হয়, এই বুঝি ইঞ্জিনটা খুলে পড়ে যাবে পথের ওপর, তাঁর চালনকৌশলের জোরে আটটার আগেই এসে বান্দরবানে নিরাপদে পৌঁছুলাম আমরা। তবে আরেকটি শিহরণজাগানিয়া ঘটনা মাঝপথে ঘটেছে, বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে শুধু বলছি, এ সড়কে বিকেল গড়িয়ে গেলে কখনোই যাতায়াত করবেন না, কখনোই না, বিপদ ঘটতে পারে।
বান্দরবানে পৌঁছে বাস স্ট্যান্ডে গাড়ি থামিয়ে টিকেট করতে ছুটে গেলেন শাহেদ ভাই, আমাদের সেই অবিবৃতঘটনাজনিত উত্তেজনা তখনও কাটেনি, নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে চলেছি। পরদিন সড়ক অবরোধ, পর পর দুটো বাস ছাড়ছে বান্দরবান থেকে, আমাদের জন্যে আসনের বন্দোবস্ত হলো না, তবে ইঞ্জিনের ওপর বসে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা হলো।

খাওয়াদাওয়ার জন্যে বাজারের দিকে গাড়ি ঘোরাতেই পথের ওপর দলের প্রথম চারজনকে দেখা গেলো, নিজেদের মধ্যে আলাপ করতে করতে এগিয়ে আসছেন তাঁরা। দুই টুকরো আবার জোড়া লেগে গেলো, চাঁদের গাড়িতে উচ্ছ্বসিত হাউকাউ শুরু হয়ে গেলো। বরুণদার সাথে জুয়ামের দেখা হয়েছে, তিনি সন্তুষ্টচিত্তে জানালেন, তাঁর গাইড জুয়াম মদ ছেড়ে দিয়েছে, বরুণদার সেই অসমাপ্ত অভিযানে দুর্ঘটনার পর থেকে।

স্থানীয় খাবার দোকানে ঢুকে ঠেসে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেলাম সবাই, পুকুরপাড়া ছেড়ে আসার পর পেট ভরে এক বেলাও খাবার জোটেনি। মিনিট বিশেক পর বেরিয়ে মংক্ষিয়াদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগোলাম সবাই। চট্টগ্রাম পর্যন্ত একসাথে যাবো আমরা, চট্টগ্রামে নেমে এক ঘন্টা পর আরেক বাসে ঢাকায় পৌঁছুবো আমি, সালেহীন, চঞ্চল আর শাহেদ ভাই।

এবারের অভিযানে আমরা বান্দরবানে প্রবেশ করেছি শেষ রাতের আঁধারে, সন্ধ্যে রাতে এই অপূর্ব পাহাড়গুলোর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে চললাম ব্যস্তসমস্ত ঢাকার দিকে। অভিযানের ক্লান্তি কেটে যাবে একবেলা ভালো ঘুম দিলে, কিন্তু এর স্মৃতির দাগ মন থেকে মুছবে না।



ছয়: শেষ কথা

বোদল্যেরকে দিয়েই শেষ করি।

অদ্ভুত যাত্রীর দল! তলহীন, সমুদ্রের মতো,
বিলোল নয়ন ভ'রে নিয়ে এলে প্রোজ্জ্বল কাহিনী;
স্মৃতির তোরঙ্গ খুলে দেখাও, সেখানে আছে কত
নীলিমার, নক্ষত্রের মণিহার, মুকুট, কিঙ্কিণী।
আমরাও যাবো দূরে, বিনা পালে, বায়ুব্যতিরেকে ---;
আমরা, আজন্ম বন্দী, বক্ষে চাপা নির্বেদের ভার,
অকস্মাৎ উন্মোচিত আত্মার বনাতে দাও এঁকে
দিগন্তের চালচিত্রে পুলকিত স্মৃতির সম্ভার।
বলো, বলো, কী দেখেছো, বলো!




পরিশিষ্ট:

দু'টো আলাদা বাসে একই সাথে ঢাকায় পৌঁছেছে পুকুরপাড়া অভিযাত্রীরা, সাত তারিখ ভোরবেলা। পুতুল আপার পায়ে সূক্ষ্ম একটা ফ্র্যাকচার হয়ে গিয়েছিলো, সেটাকে উপযুক্ত চিকিৎসা প্রয়োগে ঠিক করা হয়েছে, পুতুল আপা এখন আবার আগের মতো সাঁই সাঁই করে হাঁটতে পারেন, তিনিই এবারের সেরা অভিযাত্রী। মিলন ভাইয়ের পায়ের পেশীও কয়েকদিন বিশ্রামে ঠিক হয়ে গেছে, তিনিও গটগটিয়ে হেঁটে বেড়ান। আঠারো তারিখে ম্যালেরিয়ার আক্রমণে কাবু হয়ে পড়েছে এ গল্পের লেখক, কয়েকমাস ভোগার পর এখন সে খাড়া হয়েছে, কিন্তু এখনও ল্যাগব্যাগ করে হাঁটে, তার বদখদ চেহারাখানা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে, দূর থেকে অনেকটা চঞ্চলের মতো লাগে দেখতে।


2 comments:

  1. দুই পর্যন্ত পরলাম, বাকিটা ও পরে ফেলব কিন্তু লেখক এর মালেরিয়া হয়েছিল শুনে খারাপ লাগল

    ReplyDelete
  2. ভবিষ্যতে যারা এই পথে ট্রেকিং করতে যাবে তাদের বেশ কাজে লাগবে।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।