Monday, May 22, 2006

সামহোয়্যার ইনে শতক বক্তৃতা



আমার শতক : সিন্ধুতে বিন্দুযোগ


জেনেসিস

আমাকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেন এক শুক্কুরবার৷ সপ্তাহের শেষ দিন, এরপর টানা দুটি দিন উইক এন্ড, সে আনন্দে ঈশ্বর বেচারার কাজে মন বসে না৷ বিকেলবেলা আমার ছাঁচটাকে কারখানার চুলি্লতে ভরে সেটা চালু রেখেই শিস দিতে দিতে ঈশ্বর কারখানায় তালা লাগিয়ে বাড়ি ফিরে যান৷ আহ, দুই দিন ছুটি৷ ভিসিআর ছেড়ে শ্রীদেবীর সিনেমা দেখা হবে৷

সোমবার কারখানা খুলে ঈশ্বর দাঁতে জিভ কাটেন৷ ওহহোহো, বড় ভুল হয়ে গেছে৷ তাড়াতাড়ি চুলা থেকে একটা চিমটে দিয়ে ধরে আমার কয়লাকালো শরীরটা বার করেন তিনি৷ ফুঁ দিয়ে একটু জীবনবায়ু ঢুকিয়ে দিতেই আমি ধড়মড়িয়ে উঠে বসি৷ ঈশ্বর আমার সামনে একটা আয়না ধরেন৷

"এটা কী?" আমি ঘাবড়ে যাই৷

ঈশ্বর সস্নেহে বলেন, "তুমি বাছা৷ এটাই তুমি৷"

আমি তেড়ে যাই ঈশ্বরের দিকে৷ "বললেই হলো? এই চিমসা কালা বান্দরের মতো দেখতে ... এইটা আমি?"

ঈশ্বর হাসেন৷ "আরে বান্দরের মতো দেখতে তো কী হয়েছে? কোন সমস্যা নাই, ডারউইন সব বুঝিয়ে বলবে৷ যাও, এবার দুনিয়াতে গিয়ে চরে খাও৷"

আমি এই বেইনসাফিতে রাজি হই না, ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকি৷ দুইদিন ফূর্তি করে ঈশ্বরের মুড ভালো, তিনি বলেন, "ওকে ওকে, তোমার জন্য ক্ষতিপূরণ দিচ্ছি৷ পাঁজরের একটা হাড্ডি খুলে দাও তো, তোমার জন্য একটা সঙ্গিনী বানাই৷"

আমি আবারও তেড়ে যাই৷ ব্যাটা চান্দাবাজির জায়গা পায় না৷

ঈশ্বর মুখ গোমড়া করে নতুন মশলা দিয়ে দিনভর খেটেখুটে আমার জন্য এক অপূর্ব রূপবতী বালিকা নির্মাণ করেন (বুঝতেই পারছেন, এ হচ্ছে টারজানা খান, চ্যানেল টু-তে সংবাদ পাঠ করেন)৷

"এই নাও৷" ঈশ্বর বলেন৷ "এখন যাও, আর গোল করে না৷"

সোমবারই জন্মেছিলাম৷ দুনিয়াতে এসে টারজানাকে খুঁজে পেতে একটু সময় লেগে গেলো, এখনও যোগাযোগ করে উঠতে পারলাম না৷ তবে হবে৷ হবেই৷


বাংলা ব্লগে আমি

আরিলড ক্লকারহগ একদিন আমার ইংরেজি ব্লগে একটা কমেন্ট ঝাড়লেন৷ তখন বুঝিনি, দুয়েকদিন পর সেই লিঙ্কে ক্লিক করে দেখি উরেব্বাস, একেবারে রমরমা অবস্থা৷ ইংরেজি ব্লগ গুটিয়ে এখানেই চলে এলাম, টুকটাক করে লিখতে লিখতে আজ শ'খানেক লিখে ফেললাম সাড়ে তিন মাসে৷ এই ব্লগবান্ডিলের প্রায় একশো ভাগের এক ভাগ আমার যোগানো, ভাবতেও ভালো লাগে৷ হিট কাউন্টার দেখে মনে হচ্ছে অনেকেই আমার পোস্টগুলি পড়েন, তবে কমেন্টের রুগ্নাবস্থা দেখে বুঝি, পড়ে তাঁদের খুব একটা মনে ধরে না৷ না ধরুক৷ আমার বয়েই গেলো৷

পুরনো কিছু কবিতা এখানে পোস্ট করা শুরু করেছিলাম, আর দুয়েকটা গল্পসল্প, অনুবাদ ... প্রভৃতি ... তারপর একদিন মন খারাপের সময় দেখি এখানে বসেই কবিতা লেখা শুরু করে দিয়েছি৷ মাঝে মাঝে একে ওকে খোঁচাই, নেহায়েত খোঁচানোর খাতিরেই৷

পরিচিত অপরিচিত চিনিচিনিসন্দেহজনক সবাইকেই পাকড়ে এই বাংলাব্লগের ঠিকানা গছিয়েছি৷ কয়েকজন লেখা শুরু করেছেন, কয়েকজন নিঃশব্দ পাঠকমহলেই থেকে গেছেন, আবার কেউ কেউ পাত্তা দেননি৷ না দিন৷ আমার বয়েই গেলো৷

এখানে অনেকের লেখাই পড়ি, অনেকের লেখাই পড়ি না, উপাদান ও শৈলীগত বিচারে পছন্দ করি কয়েকজনের লেখা৷ পছন্দের মাত্রানুসারে নয়, এলোমেলোভাবেই উল্লেখ করি তাঁদের৷

শোহেইল মতাহির চৌধুরীর নামটা সবচেয়ে দীর্ঘ, তাই তাঁকে দিয়েই শুরু করি৷ অনেক কিছু নিয়ে লেখেন, ওনার প্রয়াত গুরু হীরক লস্করের মতোই৷ এঁরা দুইজন ব্লগের মন্দা সময়ে এসে রিলিফ পোস্ট দেন প্রায়ই, যদিও লস্কর বাং মেরেছেন দীর্ঘদিন হলো, তবে মশাল ধরিয়ে দিয়ে গেছেন চৌধুরীর হাতে৷ জটিল প্রশ্ন আর কূটিল উত্তর নিয়েও তাঁর কারবার প্রশংসার্হ৷

আমার চৌধুরীপ্রীতি নেই, তবে আরেক চৌধুরীর লেখা ভালো লাগে, আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও জার্মান শিক্ষায় সতীর্থ সুমন চৌধুরী৷ ওঁর কবিতাগুলি আমার মাথায় টক্কর মেরে যায় প্রায়ই, তবে গদ্যের সাথেও সুমনের দুশমনি নেই৷

রাসেলের লেখা ভালো লাগে, আমাদের ব্লগের অ্যাংরি ইয়ংম্যান, অনেক কিছুর ওপরই ওঁর রাগ৷ তাঁর সব অনুভূতিতে হয়তো সমর্থন দিতে পারি না, তবে লেখা পড়ে আনন্দ পাই৷ একই প্রতিক্রিয়া জানাই অপ বাক, দীক্ষক দ্রাবিড় এবং মহুয়ামঞ্জুরীর ক্ষেত্রে৷ শ্রেয়সী বসুকে মিস করি অনেক (দীর্ঘশ্বাস), মহিলা যে কই গেলেন ... আমাদের একা ফেলে ... হায় ...!

বন্ধুবর অরূপ আর মুখফোড়ের লেখা পছন্দ করি ভীষণ৷ অশ্বারোহী ল্যানসার এঁরা দুজন৷ লেখার গতি আর ধার অনেক৷ আমি হাসতে ভালোবাসি, এঁরা আমাকে নিয়মিত হাসান৷

হাসানোর প্রসঙ্গ এলো, রুনাম্যান হাসানের কথাই না বলে পারি কিভাবে? হাসানের লেখা ভীষণ ঝরঝরে, সৈকতে দমকা বাতাসে ওড়া বালির মতো৷ একেবারে বিঁধে যায়৷

সাদিকের সুফিবাদ ও তদজনিত বাদানুবাদের সাথে সবসময় একমত পোষণ করে উঠতে পারি না, কিন্তু গরম আবহাওয়ায় সাদিকের নরমপন্থা ভালো লাগে৷ সাদিকের পরিমিতিবোধ চমত্‍কার, এই গুণেই তাঁর লেখার বুনোট উপভোগ্য হয়ে ওঠে৷ এই চমত্‍কার বুনোট আছে তীরন্দাজের লেখাতেও৷ শুধু ফলার ধারই নয়, তাঁর তীরের পালকের ভারসাম্যও চোখে পড়ার মতো৷

মাশীদ অল্প লেখে, তবে ভালো লাগে পড়ে৷ উত্‍সের লেখা অনেক ভালো লাগে, শুধু জেনেটিক্স আর বিবর্তন নিয়ে আমারও আগ্রহের কারণে নয়, উত্‍সের লেখার ভঙ্গিটিই চমত্‍কার৷ ইশতিয়াক জিকো খুব গোছানো লেখেন, কিন্তু ইদানীং তাঁর লেখা চোখে পড়ে না৷ অমি রহমান পিয়ালের লেখাও মসৃণ, নিয়মিত পড়ি, যদিও তাঁর সাথে আমার ভীষণ শত্রুতা৷

ধূসর গোধূলির পোস্টের চেয়ে মন্তব্য বেশি স্বাদু, একই কথা খাটে কালপুরুষ ও শুভর ক্ষেত্রেও৷ লুনা রুশদীর লেখা ভালো লাগে, কিন্তু তিনি লেখেন কম৷ লবিয়াল ব্রাত্য রাইসুর পোস্টের চেয়ে ঝগড়াবাচক কমেন্টগুলি বেশি আগ্রহ উদ্দীপক (উনি কিন্তু দলবাজি আর খুনসুটি একদম পছন্দ করেন না!)৷ সম্প্রতি লজেনস পেয়েছি সূচিত্রার (নাকি সুচিত্রা?) কাছ থেকে, এ-ও ভালো লেগেছে৷ শমিতের ছবি আর লেখার মধ্যে মাঝে মাঝে পার্থক্য করতে পারি না, চোখরোচক ভীষণ, চোখে আরাম দেয় দুটোই৷ কৌশিক মাঝে মাঝে দমকা পোস্ট করেন, ইনিও ক্রুদ্ধ যুবাদের দলে, পড়ি এবং উপভোগ করি৷ এস এম মাহবুব মুর্শেদের লেখায় ধার আর ভার দুটোই থাকে, পড়ে ভালো লাগে৷ বদরূল আহমেদও আমার প্রিয় ব্লগারদের একজন, তাঁকে ও বাভিকে সালাম, চঞ্চুতে চঞ্চু ঠেকিয়ে তাঁরা যেন চিরকাল আলাপন চালিয়ে যেতে পারেন সে কামনাই করি৷

অনেকের কথা বোধ হয় বলা হলো না, শুদ্ধিপত্রে অবশ্যই প্রকাশ করবো৷

আমার সব লেখাই আমার পছন্দ নয়, দুয়েকটা ভালো লেগেছে অনেকের লেখার ভিড়ে৷ তবে আমার লেখা পড়ে কারো ভালো লাগলে আমার নিজেরও অনেক ভালো লাগে, সামান্য মুগ্ধতা কাউকে উপহার দিতে পারলাম সে আনন্দে৷


পরিশিষ্ট

আমি বোধহয় লিখে লিখে নিজের চেহারাই আঁকি৷ যারা আমার পোস্ট পড়ে আমাকে অলস, পলায়নপরায়ণ, মদখোর, ঝগড়াবাজ ও বালিকালোলুপ হিসেবে চিনেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, আপনারা ঠিক ধরেছেন৷

ধন্যবাদ সেসব ভিজিটরদের যাঁরা আমার পোস্টগুলো পড়েছেন৷ ধন্যবাদ এই ব্লগস্থানের স্রষ্টাদের৷ তোমাদের এই হাসি খেলায়, মনে রেখো, আমি যে গান গেয়েছিলেম, জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় ... মনে রেখো ...৷


শেষ হইয়াও হইলো না শেষ

ছবিটি শিরোনামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বোধহয়৷ জনৈক কেলে আদম লাইফ জ্যাকেট পরে টাঙ্গুয়ার হাওরের মিঠাপানিতে লবণ যোগের প্রচেষ্টায় রত৷ ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় শ্রদ্ধেয় বরুণ বকশীর কাছে৷ না, এটা আমার ছবি হতেই পারে না ...!


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।