Wednesday, April 19, 2006

লাগামচি

(রিকার্দো গুয়েরালদেজ এর গল্প, ক্রিস্টিন এ ডোলানের অনুবাদে "দ্য ব্রেইডার" অবলম্বনে৷ গুয়েরালদেজ বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভিক সেরা আর্জেন্টাইন লেখকদের একজন, এই গল্পটি তার ১৯১৫ সালে প্রকাশিত "কুয়েন্তোস দে মুয়ের্তে ঈ দে সাংরে" থেকে উত্কলিত৷)


বাখ যেভাবে সুর করেন, নুনিয়েজ সেভাবেই লাগাম বানায়, যেভাবে গোয়াইয়া ছবি আর দান্তে কবিতা৷ তার এই স্বাভাবিক ধী এক বাঁকহীন পথে নিয়ে গেছে তাকে, আর নুনিয়েজ বেঁচে আছে তার এই শিল্পের মধ্যে বুঁদ হয়ে থেকে৷

তবে সব বড় মাপের মানুষের যে দুর্দশা হয়ে থাকে, নুনিয়েজও ভুগতো তাতেই৷ ঈশ্বরের কানুন মেনেই নুনিয়েজ জন্ম দিয়েছে তার শিল্পকর্মের৷ শিষ্যদের জন্যে সে রেখে গেছে তাকে অনুসরণ করার অজস্র পন্থা, কিন্তু কোন একটি রহস্য গোপন রাখা হয়েছে, যা তার সবচেয়ে কীর্তিমান অনুচরটিও ভেদ করতে পারেনি৷

গোড়ায় নুনিয়েজ ছাতামাথা চামড়ার বোতাম বানাতো বুড়ো নিকাশিওর জন্যে, ফিতেগুলো ডলে যেতো যতক্ষণ তারা মোলায়েম না হতো৷ কিন্তু কালে সে শিখেছে অনেক কিছুই, সবচে' খাটনির কাজগুলো করে করে৷ নুনিয়েজ প্রশ্ন করতো না, নিশ্চুপ দেখতো নিকাশিওকে, বুড়োর কাজের বিভিন্ন ঢং হাভাতের মতো গিলে নিতো, আর ওদিকে বিদঘুটে লাগামের প্যাঁচগুলো পাক খেতো এমনভাবে, যা কাউকে কখনো শেখানো যায় না৷

কিছু কাজকর্ম শেখার পর নুনিয়েজ মন দিলো নিজের স্বপ্নগুলোকে ধরাছোঁয়ার জগতে আনতে৷ একটু অবসরে সময়গুলোতে গিয়ে দোর দিতো সে, যখন অন্যেরা একটু গড়িয়ে নিচ্ছে, নিজের ঘরে চুপটি করে নুনিয়েজ লাগাম আর বোতাম বানানো শুরু করলো, এ তো ওর জন্যে সামান্য কাজ৷

যে কেউ দেখলেই নুনিয়েজের লাগাম চিনতে পারবে, জটিল আর সূক্ষ বুনন, চলতি নকশার সাথে নুনিয়েজ নিজের মনের ছোঁয়াও মেশাতো তাতে, গাছপালা আর জানোয়ারের ছাঁচ দেখে তার মনে কতো নকশাই তো ভাসতো৷

কিন্তু নুনিয়েজকে ধীরে এগোতে হয়েছে৷ ঘোড়ার কেশরের মতো সরু চামড়ার ফিতা বোনা কি চটজলদি করার কাজ? আর অবসর পাওয়াও তো সহজ কথা নয়, আর সেই সাথে আছে ইয়ারদোস্তদের ফোড়ন কাটা, নুনিয়েজ এড়িয়ে চলতো ওদের মড়কের মতো, পাত্তা দিলে যে ওর নিজের শিল্পই নষ্ট হবে শুধু৷

নুনিয়েজ ব্যাটা কাজের শেষে ঘন্টার পর ঘন্টা নিজের ঘরে দোর দিয়ে করেটা কী? অন্য কারিগরদের কৌতূহল একদিন বড়কর্তাকেও ছুঁলো, খতিয়ে দেখতে নুনিয়েজের ঘরে ঢুকে সে চমকে উঠে দ্যাখে, এক রাশ চামড়ার ফিতা নিয়ে মগ্ন নুনিয়েজ, কর্তা আবার চুপিসারে বেরিয়ে যায়৷

দুপুরঘুমের পর কর্তা নুনিয়েজকে ডাক পাঠান, নুনিয়েজের ঘাড়ে কাজ চাপে, সেই আদ্যিকালের কোন এক লাগামচির ভীষণ জটিল চার-বোতাম ছকের কিছু লাগাম বোনার৷ কিন্তু পরদিনই কাজ ফুরোয় নুনিয়েজের, আদ্যিকালেল লাগামচির হাতের কাজই বরং ছেঁদো লাগে নুনিয়েজের লাগামের পাশে৷ সবাই বোঝে, নুনিয়েজ এসে গেলো, তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে জঙ্গুলে আগুনের মতো৷

ফরমাশ জমতে থাকে, নুনিয়েজ কাজ ছেড়ে দিয়ে সেগুলোর পেছনে লাগে৷ সেদিন থেকেই তার বাকিটা জীবন কাজ আর কাজ দিয়ে বোঝাই হয়ে যায়৷ আপসোস করার, বা এই পালটে যাওয়াকে উপভোগ করার সময়ও আর রইলো না নুনিয়েজের৷

কয়েক মাস পর গাহেকদের চাপ সামলাতে নুনিয়েজ চলে এলো শহরে, কাজের সুবিধে দেবে এমন দেখে একটা বাড়ি নিলো সে৷

নুনিয়েজের কাজের জেল্লা বাড়তে থাকে, কিন্তু অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার সুনামকে ছাপিয়ে ওঠে এক কালো ছায়া৷

অমন প্রশংসা বুঝি আর কেউই পায়নি৷ লোকে বলতো, নুনিয়েজ সবচে' দামী ভিকুনিয়ার মতো মোলায়েম, সূক্ষ আর আরামদায়ক পঞ্চো বুনতে পারে৷ কী সব বোতাম, কী সব অদৃশ্য সেলাই, নুনিয়েজ বোধহয় ঝাঁড়ফুঁকই জানে৷ সক্কলে মিলে তাকে চাবুকদার বানিয়ে দিলো৷

ঘষাপাথরটা বুঝি নুনিয়েজের হাতেরই একটা অংশ ছিলো, আর ছুরিটা বুঝি ছিলো তার চটপটে আরেকটা আঙুল৷ তার বুড়ো আঙুল আর ছুরির ফলার মাঝে কলকল করে বয়ে যেতো বাঁকা বাঁকা চামড়ার পাতলা চোকলাগুলো৷

কত কত বাহারী মোটা সুঁইয়ের হাতলগুলো নুনিয়েজের হাতের খাঁজে এমনভাবে লুকিয়ে পড়তো, যেন ওটাই ওদের ডেরা৷ মালিশ করতে করতে ফিতেগুলোকে মসৃণ করে তুলতো সে, তার ঠোঁটের ভাঁজে পিছলে যেতো সেগুলো৷ সবশেষে ছুরির উলটো পিঠে চালিয়ে ফিতেগুলোকে মজবুত করতো সে৷

লোকে এ-ও জানতো যে নুনিয়েজের পিন্টোটা একটু অদ্ভূত গোছের৷ প্রত্যেক বছর মাদী ঘোড়াটা একটা কালো এঁড়ে আর একটা ফর্সা বকনা বিইয়ে যেতো৷ তিন মাস বয়স হবার পর নুনিয়েজ বাচ্চা দুটোর মাথা কাটতো, ছাল ছাড়িয়ে শুকোনোর জন্য ঝুলিয়ে দিতো, পড়ে কালোর সাথে সাদা মেশাতো সে, দক্ষ, অননুকরণীয় ছকে৷

চলি্লশ বছর ধরে নুনিয়েজ তার মেধাকে কাজে লাগিয়েছে, খদ্দেরকে খুশি করার জন্যে৷ অনেক পয়সা রোজগার করেছে সে, অনেক, আর শহরের রইস লোকজনও বেশ খাতির করেই রেখেছে তাকে, কিন্তু তবুও সবসময় যেন নুনিয়েজের চোখে ভাসতো সন্দেহ৷

বুড়ো হয়ে পড়েছে, মাঝে মাঝে চোখে সমস্যা হয়, দিনে চার ঘন্টার বেশি আর খাটনি দিতে পারে না নুনিয়েজ৷ ক্লান্তির সীমায় পৌঁছে যাবার পর কাজ করতে গেলেই লাগাম ফেঁসে যেতো তার৷ এমন হবার পর নুনিয়েজ কাজ ছেড়ে দিলো৷ খরচ হয়ে যাওয়া বেচারা লোকটা শেষ পর্যন্ত জীবনের রাশ নিজের হাতে নিতে পারলো৷

চামড়ার ফিতা ছুঁয়ে দেখবারও রুচি হয় না নুনিয়েজের, এমনকি লাগাম নিয়ে কথাও বলতে মন চায় না তার, এমনই পরিস্থিতি, এর মধ্যে একদিন হঠাত্‍ করে যেন বুড়ো নুনিয়েজ আবার খোকা হয়ে গেলো৷ একদিন বাক্সপ্যাঁটরা ঘাঁটতে ঘাঁটতে সেই লাগামটা তার হাতে এসে পড়লো, যেটা বোনা শুরু করেছিলো সে , কবে সেই শৈশবে, আর সেই থেকেই নুনিয়েজের খোকারোগ শুরু৷ লাগামটা হাতে পেয়ে বুড়োর মাথা খারাপ হয়ে গেলো বুঝি৷ দলাপাকানো ফিতাগুলোকে জাপটে ধরে, আর কখনো লাগাম না বোনার প্রতিজ্ঞা ভুলে, পঞ্চাশ বছর আগে ফেলে রাখা কাজে আবার হাত দেয় সে, বিরতিহীন, নিজের ক্ষয়ে যাওয়া দৃষ্টি আর স্বাস্থ্যকে বেদম খাটিয়ে, কুঁজো হয়ে কাজ করার প্রচন্ড যন্ত্রণাকে মেনে নিয়ে৷ কাজের পেছনে এই মর্মান্তিক মনোযোগে দিনকে দিন ধ্বসে পড়তে পড়তে দন ক্রিসান্তো নুনিয়েজ একদিন মারাই পড়লো৷

লোকে যখন খুঁজে পেলো তাকে, শক্ত আর বেঁকে যাওয়া, তখন তার বুকে হাড্ডিসার হাতে শক্ত করে চেপে ধরা লাগামটা কিছুতেই ছাড়িয়ে নেয়া সম্ভব হলো না৷ ওটা সহই শেষশয্যায় শোয়ানো হলো তাকে৷

বন্ধু, স্বজন, ভক্তেরা সবাই শেষকৃত্যে যোগ দিলো, সবাই স্মরণ করলো, কিভাবে খ্যাপার মতো অসমাপ্ত কাজের পেছনে পড়েছিলো নুনিয়েজ৷ একজন আবার ঐ লাগামটাকে তার সেরা শিল্পকর্ম আখ্যা দিয়ে প্রস্তাব করলো, অমন সুন্দর একটা কাজ তার সাথে সমাধিস্থ না করে বরং বৃদ্ধের আঙুলগুলো কেটে ওটা ছাড়িয়ে নেয়া হোক৷ সবাই মহা চটে গিয়ে জ্বলন্ত চোখে তাকালো তার দিকে, "নুনিয়েজের আঙুল কাটা? নুনিয়েজের স্বর্গীয় আঙুলগুলো?"

সেই অদ্ভূত, ব্যাখ্যাতীত ছবি ভেসে রইলো অনেকক্ষণ, কেমন করে বৃদ্ধ তার প্রথম এবং শেষ কাজ বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে৷ এ কি অসম্পূর্ণ কোন কিছুকে পেছনে ফেলে না যাবার চেষ্টা? এ কি ভালোবাসা? নাকি এ নিছক শিল্পীর আর্তি, তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সৃষ্টির সাথে সমাহিত হবার?


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।